এমএনএ জাতীয় ডেস্ক : ঢাকা-ওয়াশিংটন দুপক্ষের সম্পর্কের টানাপড়েন শেষ করে একসঙ্গে উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলতে প্রস্তুতিপর্ব চলছে। ঢাকা-ওয়াশিংটন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সর্বোচ্চ ফোরাম অংশীদারিত্ব সংলাপ আগামী ২০ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। দুপক্ষের ওই বৈঠকের আলোচনায় গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাণিজ্যিক সুবিধা (ওয়াশিংটনের বাজারে নতুন করে জিএসপি সুবিধা চাইতে পারে ঢাকা), সামরিক যোগাযোগ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল গুরুত্ব পাবে। তার আগে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, প্রত্যক্ষভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে ওয়াশিংটনকে সমর্থন না করা এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করাসহ একাধিক কারণে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষ রয়েছে। যার পরিণতি ঘটে দেশের এলিটফোর্স র্যাবের বর্তমান ও সাত সদস্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মধ্য দিয়ে। আবার হুট করেই যুক্তরাষ্ট্র এমন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, বিষয়টি এমন নয়, এ ইস্যুতে ওয়াশিংটন একাধিকবার ঢাকাকে সতর্ক করেছে; কিন্তু ঢাকার তরফে নেওয়া পদক্ষেপে সন্তুষ্ট হতে না পারায় শেষ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার ঘটনা ঘটে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন সরাসরি বলেছে- গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সুশাসন বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে নারাজ দেশটি।
অন্যদিকে দুপক্ষই চায় নিজেদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকুক এবং একে অন্যের উন্নতিতে অবদান রাখুক। উভয়ে চাচ্ছে এখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে এবং শক্তিশালী টেকসই সম্পর্ক গড়তে। এ বিষয়ে ঢাকা-ওয়াশিংটন দুপক্ষের কূটনীতিকরা কাজ করছেন। যার ধারাবাহিকতায় আগামী ২০ মার্চ ঢাকায় অংশীদারিত্ব সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর আগামী এপ্রিলে দুদেশের মধ্যে অষ্টম নিরাপত্তা সংলাপ ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তার আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেনের আমন্ত্রণে আগামী এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ওয়াশিংটন সফর করবেন। আগামী এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ইস্যুতে দুপক্ষের মধ্যে আরও দুটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।এ ছাড়া আগামী এপ্রিল-মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএইড) অ্যাডমিনিস্ট্রেটর রাষ্ট্রদূত সামান্থা পাওয়ারের ঢাকা সফরে আসার কথা রয়েছে।
আগামী ২০ মার্চ ঢাকা-ওয়াশিংটন অংশীদারিত্ব সংলাপের আগে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও শক্তিশালী সম্পর্ক গড়তেই সরকার লবিস্ট নিয়োগ করতে যাচ্ছে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রভাবশালী তিনটি লবিস্ট ফার্মের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এ কাজের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা নিচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘আমরা তিনটি আইনি পরামর্শক সংস্থার সঙ্গে কথা বলেছি। সেখান থেকে সবচেয়ে ভালো পরামর্শটি নিয়ে এ সপ্তাহে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
রীতি অনুযায়ী এবারের অংশীদারিত্ব সংলাপ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। সর্বশেষ সংলাপ অনুষ্ঠানটি ২০১৯ সালের ১২ জুন ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হয়। শেষবারের সংলাপে একটি অবাধ, উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়তে উভয়পক্ষ একমত হয়। এবারের সংলাপে ঢাকার পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড। এবারের অংশীদারিত্ব সংলাপে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাণিজ্যি-বিনিয়োগ, সামরিক যোগাযোগ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে। আসন্ন বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশ গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার বিষয়ে ব্রিফ করবে এবং এই ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান ও আরও শক্তিশালী গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা জানাবে। পাশাপাশি র্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা কী কারণে অযৌক্তিক তা তথ্য-উপাত্তসহ তুলে ধরবেন ঢাকার কূটনীতিকরা।
ঢাকা-ওয়াশিংটন সামরিক যোগাযোগ বাড়ানোর প্রতি আসন্ন বৈঠকে গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র কেনার জন্য দেশটির সঙ্গে দুটি চুক্তি করার (জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট-জিএসওএমআইএ এবং অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্টের-এসিএসএ) যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ। গত সপ্তাহে এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, রানাপ্লাজা ঘটনার পর ২০১৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ জিএসপি (বাণিজ্য সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিশেষ সুবিধা) সুবিধা পাচ্ছে না। ঢাকার শ্রম পরিবেশের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করে ২০১৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা স্থগিত রেখেছে। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ডিএফসি (উন্নয়নশীল দেশগুলোর বেসরকারি খাতের জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ডেভেলপমেন্ট অব ফাইন্যান্স করপোরেশনের ৬ হাজার কোটি ডলারের ঋণ সুবিধার তহবিল) তহবিল থেকে ঋণসুবিধা পাচ্ছে না বাংলাদেশ। আসন্ন বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জিএসপি সুবিধা পুনরায় চালুর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি জোরালো আবেদন জানানো হবে।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব এবং রাষ্ট্রদূত মো. মাহফুজুর রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘রাজনৈতিক ও দূরদর্শিতার অভাব উভয় কারণেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের এই সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। বৈরী পরিস্থিতিতেও সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। তাই দুপক্ষের মধ্যে যত দ্রুত আলাপ-আলোচনা হবে, তত দ্রুত সম্পর্কের জট খুলবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি গত কয়েক সপ্তাহে যেভাবে গুরুত্ব পেয়েছে তার পেছনের কারণ হচ্ছে বড় দুটি রাজনৈতিক দলের (আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি) মধ্যে ব্লেইম অ্যান্ড পাল্টা ব্লেইম করা। এ কারণেই ঘটনাটি বেশি আলোচিত হয়েছে। দুদলের মধ্যে যদি এক ধরনের সহনশীলতা থাকত দেশের ব্যাপারে, যেটা আমরা অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে দেখতে পাই, (যেমন কাশ্মির ইস্যুতে বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলার সময় কিন্তু সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে ব্লেইম অ্যান্ড পাল্টা ব্লেইম করে না) তবে এটা এত গুরুত্ব পেত না। তবে বিষয় হচ্ছে, সমস্যা যা আছে তার সমাধান করা প্রয়োজন। সে হিসেবে সেই কাজটা করতেই হবে, আমেরিকা বলুক আর না বলুক। সরকারের নিজের তাগিদেই বিচারবহির্ভূত হত্যা বা এমন ঘটনা যাতে না ঘটে তার সমাধান করা প্রয়োজন। গুমের ক্ষেত্রেও একই বিষয়, যদি এমন ঘটনা ঘটে তা হলে তা যেন বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয় এবং সবাইকে সেই তথ্য জানাতে হবে। এ জায়গাতে ঘাটতি আছে বলেই আমেরিকা এ সুযোগ পেয়েছে এবং সে সুযোগে বিষয়টা রাজনীতিকরণ হয়েছে। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক, আমি মনে করি এ ঘটনায় সম্পর্কে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সম্পর্ক। ব্যবসা-বাণিজ্য, সামরিক বাহিনী, শিক্ষাসহ দুদেশের সম্পর্ক অনেক বিস্তৃত। নিষেধাজ্ঞার ঘটনা দুদেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না।’পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘সামনের দিনগুলোতে দুদেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের সফর এবং আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে ওয়াশিংটন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেখানেও আলাপ হবে। সামনের দিনে আমাদের দুপক্ষের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।’
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

