এমএনএ রিপোর্ট : প্রবল বর্ষণে পাহাড়ধসে তিন জেলায় সেনাবাহিনীর ছয়জন সদস্যসহ নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩৫ জন দাড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও তিন শতাধিক মানুষ। গতকাল সোমবার রাত ও আজ মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলাসহ রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকা, বান্দরবান ও চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় পাহাড়ধসের এসব ঘটনা ঘটে।
পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও বিএনপি চেয়ারম্যান বেগম খালেদা জিয়া । আর পাহাড়ধসে হতাহতদের সমবেদনা জানাতে ও ক্ষয়ক্ষতি দেখতে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল আগামীকাল বুধবার রাঙামাটি যাচ্ছে।
রাঙামাটির মানিকছড়িতে পাহাড় ধসে সেনা ক্যাম্প ধসে পড়ে। গাছপালা ভেঙে পড়ায় ও মহাসড়কে পানি উঠে যাওয়ায় চট্টগ্রামের সঙ্গে রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। দুর্গত এলাকা পানিবন্দি থাকায় অনেক স্থানে বিচ্ছিন্ন রয়েছে বিদ্যুৎও।
পানিবন্দি হয়ে তিন জেলায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে অনন্ত দুই কোটি মানুষকে। ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ায় অনেকে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থা উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে। পাহাড় ধসের ঘটনায় আহতরা আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিস গতকাল সোমবার বেলা ১২টা থেকে আজ মঙ্গলবার বেলা ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৩১ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, পাহাড়ধসে সেনা কর্মকর্তাসহ ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
পাহাড়ধসের ঘটনায় রাঙামাটি সদরসহ কাপ্তাই, লংগদু ও কাউখালীতে এলাকায় ৯৫ জন, সদর উপজেলার সাতছড়ি ইউনিয়নের মানিকছড়ি এলাকায় ছয় সেনাসদস্য, বান্দরবানে ৬ জন ও চট্টগ্রামের চন্দনাইশে ৭ জন ও রাঙ্গুনিয়ায় ২১ জন মারা গেছেন। অন্যদের ব্যাপারে এখনও জানা যায়নি। সেনা ক্যাম্পধসে চট্টগ্রামের সঙ্গে রাঙামাটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় দুই পরিবারের আটজন ও বান্দরবানের লেমুঝিরি জেলেপাড়ায় এক পরিবারের দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। মৃত ব্যক্তির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাহাড়ধসে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব জি এম আবদুল কাদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সেনাবাহিনীর ৬ সদস্যসহ রাঙামাটিতে নিহত ১০১
রাঙামাটিতে সকাল থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে ১০১ জন মারা গেছেন। হাসপাতাল ও স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে প্রবল বর্ষণে বাড়িঘরে পাহাড়ের মাটিচাপায় রাঙ্গামাটি শহরে ৫৮ জন, কাউখালীতে ২৩ জন, বিলাইছড়িতে দুজন, জুরাছড়ি উপজেলায় দুজন ও কাপ্তাইয়ে রয়েছে ১৬ জন। তাদের মধ্যে রাঙামাটি সদর উপজেলায় চার সেনা সদস্য ৫৮ জন নিহত হয়েছে।

তাদের মধ্যে মানিকছড়িতে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে পাহাড় থেকে ধসে পড়া মাটি অপসারণের সময় ছয় সেনা সদস্যের মৃত্যু হয়। তারা হলেন, মেজর মাহফুজ, ক্যাপ্টেন তানভীর আহমেদ, সিপাহী আজিজ, শাহীন, ল্যান্স কর্পোরেল আজিজ, সিপাহী মামুন। তারা রাঙ্গমাটি সেনা রিজিয়নে কর্মরত ছিলেন।
এছাড়া আরও বেশ কয়েক সেনা সদস্যকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে রাঙ্গামাটি এবং ঢাকায় ভর্তি করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে রুমা আক্তার (২৫), নুর আক্তার (৩), হাজেরা (৪০), সোনালি চাকমা (৩০), এক বছর বয়সী শিশু অমিয় কান্তি চাকমা, আইয়ুশ মল্লিক (২), চুমকি মল্লিক (২), লিটন মল্লিক (২৮), অজ্ঞাত (২২), মিন্টু ত্রিপুরা (৪৫), আবদুল আজিজ (৫৫), অজ্ঞাত (৩২), মিলি চাকমা (৫৫), ফেন্সি চাকমা (৪) এবং কাউখালীর যাদের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন-ফাতেমা বেগম (৬০), মনির হোসেন (২৫), মো. ইসহাক (৩০), দবির হোসেন (৮৪), খোদেজা বেগম (৬৫), অজিদা খাতুন (৬৫), মংকাচিং মারমা (৫২), আশেমা মারমা (৩৭), শ্যামা মারমা (১২), ক্যাচাচিং মারমা (৭), কুলসুমা বেগম (৬০), বৈশাখী চাকমা (১০), লায়লা বেগমের (২৮) লাশ উদ্ধার করে রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এদিকে কাপ্তাই রাইখালীর কারিগর পাড়ায় নিহত ৪ জনের নাম তাৎক্ষণিক পাওয়া যায়নি। গতকাল সোমবার রাঙ্গামাটি শহরের পুলিশ লাইন এলাকায় এক শিশু এবং কাপ্তাইয়ের নতুন বাজারে এক শিশু পাহাড়ের মাটি চাপায় মারা যায়। এছাড়া কর্ণফুলী নদীতে পড়ে ইকবাল নামের এক ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন।
এদিকে গতকাল সোমবার রাত থেকে রাঙ্গামাটি শহরের অধিকাংশ এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া রাঙ্গামাটির সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
জেলা শহরের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার কাজ চালাচ্ছেন। এতে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশংকা করছেন স্থানীয়রা।
আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক রাশেদুল হাসান গণমাধ্যমকে জানান, পাহাড়ধসে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।

বান্দরবানে তিন ভাইবোনসহ ৬ জন নিহত
আজ ভোররাত চারটার দিকে লেমুঝিরি আগাপাড়ায় পাহাড়ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় তিন শিশু ভাইবোন মারা গেছে। জেলা শহরের কালাঘাটায় একটি বাসায় পাহাড়ধসের ঘটনায় ঘুমন্ত অবস্থায় এক কলেজছাত্র মারা গেছেন। লেমুঝিরি জেলেপাড়ায় পাহাড় ধসে নিখোঁজ রয়েছেন মা-মেয়ে। এ ছাড়া গুরুতর আহত অবস্থায় দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বান্দরবান সদর ইউপির চেয়ারম্যান সাবুখয় মারমা জানান, ভোররাত চারটার দিকে লেমুঝিরি আগাপাড়ায় পাহাড়ধসে একই পরিবারের ঘুমন্ত তিন শিশু মাটি চাপা পড়ে মারা গেছে। তারা হলো মিতু বড়ুয়া (৫), শুভ বড়ুয়া (৪) ও লতা বড়ুয়া (২) ও কালাঘাটা কবরস্থান এলাকার রেবি ত্রিপুরা (১৮)।
মৃত তিন শিশুর বাবা লাল মোহন বড়ুয়া জানান, ভারী বৃষ্টিতে বেশি পানি জমে যাওয়ায় বাড়ির পাশের নালা পরিষ্কার করার জন্য তাঁরা স্বামী-স্ত্রী বের হয়েছিলেন। সন্তানেরা সবাই ঘুমিয়ে ছিল। এ সময় পাহাড়ধসে চোখের সামনে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এখন পরিবারে তাঁরা স্বামী-স্ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই।

ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন জানান, প্রবল বৃষ্টিতে প্রথমে গতকাল দিবাগত রাত একটার দিকে জেলা শহরের কালাঘাটায় একটি বাসায় পাহাড় ধসে পড়ে। এ সময় ঘুমন্ত অবস্থায় কলেজছাত্র রেভা ত্রিপুরা (২২) মাটি চাপা পড়ে মারা যান।
মাটিচাপায় আহত ব্যাবিলন চাকমা বলেছেন, এলাকাবাসী তাৎক্ষণিকভাবে এসে তাঁকেসহ বীর বাহাদুর ত্রিপুরা (১৮) ও প্রসেন ত্রিপুরাকে (২৪) মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করেন। গুরুতর আহত বীর বাহাদুর ও প্রসেন ত্রিপুরাকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর (ব্যাবিলন চাকমা) দুই পা মাটিতে আটকে পড়ে যাওয়ায় তিনিও আহত হয়েছেন।
কালাঘাটার ঘটনার এক ঘণ্টা পর লেমুঝিরি জেলেপাড়ায় পাহাড়ধসে মোহাম্মদ আজিজের বাড়ি মাটি চাপা পড়ে যায়। আজিজ কোনো রকমে বাড়ি থেকে বের হতে পারলেও তাঁর স্ত্রী কামরুন্নাহার (৪০) ও মেয়ে সুফিয়া আক্তারকে (১৪) এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

বান্দরবানের ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা স্বপন কুমার ঘোষ জানান, কালাঘাটা থেকে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লেমুঝিরি জেলেপাড়ায় নিখোঁজ মা-মেয়ের সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা চলছে। ১০ ফুট মাটি সরিয়েও এখনো চাপা পড়া বাড়ি থেকে কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
চন্দনাইশে দাদি-নাতিসহ ৭ জনের মৃত্যু
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় (বান্দরবানসংলগ্ন) দুর্গম এলাকা দোপাছড়ি ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের শামুকছড়িতে পাহাড় ধসে ১ শিশু এবং ছনবনিয়ায় ৩ জন নিহত হয়েছেন।
নিহতরা হলেন- শামুকছড়ির শিশু মাহিয়া(৩), ছনবনিয়ার ২নং ওয়ার্ডের উপজাতি এলাকার সিনসাও কেয়াংয়ের স্ত্রী মোকা ইয়ং কিয়াং (৫০), কেলাও অং কেয়াংয়ের কিশোরী কন্যা মেমো কেয়াং (১৩) ও ফেলাও কেয়াংয়ের শিশু কন্যা কেওচা কেয়াং (১০)। এক দিন আগে ওই বাড়িতে বেড়াতে আসা ১৩ বছরের কিশোরী মেমো কেয়াং দাদি-নাতির সঙ্গে ঘুমন্ত অবস্থায় পাহাড়ধসে মারা গেছে।

নিহত মোকা ইয়ংয়ের ছেলে সাইহ্লাউ (৪০) ও মেয়ে সানুকিয়াংকে (১৮) সংজ্ঞাহীন অবস্থায় বান্দরবান সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। সানুকিয়াং বান্দরবান সরকারি মহিলা কলেজে পড়েন।
কুহালং ইউপির সদস্য উসানং খিয়াং তিনজনের মৃত্যুর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
রাঙ্গুনিয়ায় নিহত ২১, নিখোঁজ অর্ধশতাধিক
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের বগাবিলী গ্রামে পাহাড়ধসে ২১ জন নিহত, দুই পরিবারের আটজন নিখোঁজ রয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান, জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাজানগর ও ইসলামপুর ইউনিয়নে আজ পাহাড়ধসের ঘটনায় চার পরিবারের ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আটজন। উপজেলার রাজানগর ও ইসলামপুর ইউনিয়নের চার স্থানে প্রবল বর্ষণে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে।

এতে রাজানগর ইউনিয়নের বগাবিলী টাইক্যা ঘোনা এলাকায় বসতঘর চাপা পড়ে নজরুল ইসলাম (৪০), তাঁর স্ত্রী আসমা আকতার বাচু (৩৫), ছেলে ননাইয়া (১৫) ও মেয়ে সাথী আকতার (৯) মারা যায়। একই ইউনিয়নের বালুখালী এলাকার মো. ইসমাইল (৪২), তাঁর স্ত্রী মনিরা খাতুন (৩৭), মেয়ে ইশামনি (৮) ও ইভামনি (৪) পাহাড় ধসে মারা যায়। এ ছাড়া ইসলামপুর ইউনিয়নে মইন্যার টেক এলাকার মো. সুজন (৪২), তাঁর স্ত্রী মুন্নী আকতার (২৪), সুজনের তিন বোন জোৎসনা আকতার (১৮), শাহনুর আকতার (১৬) ও পালুমা আকতার (১৪) মাটিচাপা পড়ে নিহত হন। একই ইউনিয়নের পাহাড়তলী ঘোনা এলাকার হেঞ্জু মিয়ার স্ত্রী শেফালী বেগম (৪৯), মো. হানিফের ছেলে মো. হোসেন (২২), বাচ্চু মিয়ার ছেলে মো. পারভেজ (১৮), মো. সিদ্দিকের স্ত্রী রিজিয়া বেগম (৪৫), মফিজুর রহমানের মেয়ে মুনমুন আকতার (১৯) ও ছেলে হিরু মিয়া (১৬) পাহাড় ধসে প্রাণ হারান।
রাজানগর ইউপির চেয়ারম্যান শামসুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, প্রবল বর্ষণের কারণে নজরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ হোসেনের মাটির ঘরের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। সেখানে এখনো চাপা পড়ে আছেন নজরুল, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান এবং মোহাম্মদ হোসেন, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা কর্মকর্তা (ইউএনও) কামাল হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, উদ্ধার অভিযান তদারকিতে তিনি ঘটনাস্থলে রয়েছেন।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

