বিশেষ প্রতিনিধি
দেশব্যাপি পালন হচ্ছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে দেওয়া সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
এই ভাষণে বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রাম ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয় এবং দেশবাসীর করণীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন। ৭ মার্চের ভাষণের পর স্বাধীনতাকামী মানুষ ঘরে ঘরে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। সেই প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মার্চ মাসজুড়ে নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়।
ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও ২০২০ সালের আগে ৭ মার্চকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। ২০১৭ সালে এই ভাষণকে ইউনেসকো “ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ ৭ মার্চকে জাতীয় দিবস ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দেয়। একই বছর অক্টোবরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পরিপত্র জারি করে দিনটিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপন সংক্রান্ত তালিকায় ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ২০২১ সাল থেকে দিনটি সরকারিভাবে ব্যাপক আয়োজনে পালন করা হয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করে ভারতে অবস্থান করছেন বলে জানা যায়। দলের অনেক শীর্ষ নেতা পলাতক বা কারাগারে রয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকার ৭ মার্চসহ আটটি জাতীয় দিবস উদযাপন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে এবার দিনটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সামনে এসেছে।
নওগাঁয় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভাষণ প্রচার
এদিকে নওগাঁয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রায় পরিত্যক্ত জেলা কার্যালয় থেকে হঠাৎ করেই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার করা হয়। শনিবার সকালে শহরের সরিষাহাটির মোড়ে অবস্থিত দলীয় কার্যালয় থেকে একটি মাইকের মাধ্যমে ভাষণটি বাজানো হলে এলাকায় কৌতূহল ও আলোচনার সৃষ্টি হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ভাঙাচোরা ও প্রায় পরিত্যক্ত কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় একটি ছোট মাইকের মাধ্যমে ভাষণটি বাজানো হচ্ছে। তবে মাইকটি কারা, কখন এবং কীভাবে সেখানে স্থাপন করেছে—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীকেও দেখা যায়নি।
পরে দলটির কয়েকজন নেতাকর্মী নিজেদের ফেসবুক আইডিতে ভাষণ প্রচারের ভিডিওটি শেয়ার করেন। এ বিষয়ে নওগাঁ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিয়ামুল হক বলেন, এ ধরনের একটি ঘটনার কথা তাঁরা শুনেছেন। পরে স্থানীয় লোকজন মাইকটি খুলে নিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
মাগুরায় পতাকা উত্তোলন নিয়ে মামলা
অন্যদিকে মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি মামলা হয়েছে। মামলায় জেলা আওয়ামী লীগের এক সহসভাপতিসহ ২১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২৫–৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার দায়ের করা এই মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক হীরক (৫২), জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোছা. সোনিয়া সুলতানা (৪০), স্থানীয় ব্যায়ামাগারের পরিচালক হাসান মাসুদ এবং পারনান্দুয়ালী গ্রামের বাসিন্দা ওসমান আলী মোল্লা।
পুলিশ জানিয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড, অপপ্রচার, জমায়েত ও মিছিল এবং বোমা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে নাশকতার চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে গ্রেপ্তার হওয়া এনামুল হক হীরকের স্ত্রী লাতিফা পারভিন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সেখানে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়েছে, বক্তব্য দেওয়া হয়েছে এবং শেষে মোনাজাত করা হয়েছে—ভিডিওতে এসবই দেখা যায়। তাঁর দাবি, সেখানে কোনো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড হয়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে শহরের জামরুলতলা এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে এনামুল হক হীরকের নেতৃত্বে কয়েকজন নেতা–কর্মী সড়কের পাশে পতাকা উত্তোলন করেন এবং মোনাজাত করেন। পরে তাঁরা সেখান থেকে চলে যান।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মীরা সেখানে গিয়ে পতাকা স্ট্যান্ড ভাঙচুর করেন। পরে ভবনের তৃতীয় তলায় থাকা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে ভাঙচুর চালানো হয় এবং ভাঙা আসবাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব আবদুর রহিম বলেন, খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করেছে। তবে আগুন কারা দিয়েছে তা তিনি জানেন না।
মাগুরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশিকুর রহমান বলেন, নাশকতার পরিকল্পনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

