বিশেষ প্রতিবেদন
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়ও। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে অফিস-আদালত ও ব্যাংকের সময়সূচিতে পরিবর্তন, ব্যয় সংকোচনসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব প্রচেষ্টার মাঝেও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মাধ্যমে ব্যাপক বিদ্যুৎ অপচয় ও চুরি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে শুধুমাত্র ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে। এটি দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাত থেকে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, যার বড় অংশই অবৈধ সংযোগের কারণে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ২০ লাখ। প্রতিটি অটোরিকশা প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৮ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, ফলে শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ এই খাতে খরচ হচ্ছে।
সরকারি অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন থাকলেও বাস্তবে অবৈধ চার্জিং নেটওয়ার্কই প্রাধান্য পাচ্ছে। রাজধানীতে বৈধ স্টেশনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় অন্তত ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ও প্রায় এক হাজার গ্যারেজ সক্রিয় রয়েছে।
এসব গ্যারেজে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১৫০টি অটোরিকশা চার্জ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে সরাসরি হুকিং করে বিদ্যুৎ নেওয়া হচ্ছে, যা জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে এবং সিস্টেম লস বাড়াচ্ছে।
শুধু শহর নয়, গ্রামীণ এলাকাতেও বাসাবাড়ির সংযোগ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এতে আবাসিক লাইনের ওপর অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে যে বিল পরিশোধ করা হয়, তা বাণিজ্যিক হারের তুলনায় অনেক কম। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যেখানে সিস্টেম লস ১.২৫ শতাংশ দেখায়, বাস্তবে তা ২ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে—যার বড় অংশই এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সংকটকে আরও তীব্র করবে। গরমের মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে লোডশেডিং বৃদ্ধি পাওয়া প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
এছাড়া বিদ্যুৎ চুরি ও অপচয়ের প্রভাব কৃষি খাতেও পড়তে পারে। সেচ ব্যাহত হলে খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব পড়বে এবং এর ফলে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা হঠাৎ বন্ধ করা সম্ভব নয়, কারণ এটি ইতোমধ্যে একটি বড় অনানুষ্ঠানিক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই এটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা জরুরি। প্রস্তাবিত কিছু সমাধান হলো- অবৈধ চার্জিং স্টেশন বন্ধে কঠোর অভিযান; বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় চার্জিং ব্যবস্থা আনা; সৌরশক্তিভিত্তিক চার্জিং স্টেশন চালু করা; নতুন অটোরিকশা উৎপাদন ও আমদানি নিয়ন্ত্রণ; চালক ও যানবাহন নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা; এবং গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপগুলোকে লাইসেন্সের আওতায় আনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক নীতিমালা ও কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা গেলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের প্রতিটি ইউনিট বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মাধ্যমে অব্যবস্থাপনা ও অপচয় অব্যাহত থাকলে তা শুধু বিদ্যুৎ খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই এখনই কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

