এমএনএ জাতীয় ডেস্ক : পদ না থাকার পরও একের পর এক পদোন্নতি দিয়ে বিধি লঙ্ঘন করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে পদোন্নতির অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে মন্ত্রণালয়। সঙ্গত কারণে পদ না থাকায় ভাঙা হচ্ছে পদোন্নতির বিধি। ফলে পদোন্নতি পেয়েও তাকে কাজ করতে হচ্ছে নিচের কোনো পদমর্যাদার। অবশ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, যারা দীর্ঘদিন বিভিন্ন কারণে পদোন্নতি পাননি বা পদোন্নতির সময় হয়েছে, তাদেরকেই দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনের বাইরে কোনো পদোন্নতি দেওয়া হয়নি; বরং আমাদের যে চাহিদা আছে, সেটি পূরণ করতে পারছি না।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, রাজনৈতিক তদবিরসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ইচ্ছায় পদ না থাকলেও পদোন্নতি দেওয়া হয়। এতে করে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তার সংখ্যা পদের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। কোনো কোনো পদবির বেলায় তা বেড়ে ৬ গুণও হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ইচ্ছামতো না দিয়ে বিধিমালা অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়া প্রয়োজন। এমনকি এজন্য একটি সুস্পষ্ট আইন থাকাও প্রয়োজন। ফলে পদ না থাকার পরও পদোন্নতিতে প্রশাসনে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন পদে পদোন্নতি দেওয়া হলেও সেখানে পদমর্যাদার নিচে কাজ করতে হচ্ছে। স্থায়ী সচিব পদমর্যাদার পদ রয়েছে ৪৩ জনের। অথচ সেখানে কাজ করছেন ৭৬ জন। অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার পদ রয়েছে ১৪৮ জনের, তার বিপরীতে কাজ করছেন ৪৩৯ জন। এ পদে ওএসডি রয়েছেন ৫ জন। যুগ্ম সচিবের পদ রয়েছে ১৬৩ জনের, সেখানে কাজ করছেন ৭৭৪ জন। আর এই পদে ওএসডি রয়েছেন ২২ জন। উপসচিব পদ রয়েছে ৪৭০ জনের। তার বিপরীতে কাজ করছেন ১ হাজার ৭৩৯ জন। আর ওএসডি রয়েছেন ৬৫ জন। সিনিয়র সহকারী সচিবের পদ রয়েছে ২৬৮ জনের, সেখানে কাজ করছেন ১ হাজার ৫৯৯ জন। এই পদে ওএসডি রয়েছেন ১১০ জন।
‘সরকারের উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতি বিধিমালা-২০০২’ অনুযায়ী উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির জন্য প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ১৫ বছরের মোট চাকরিসহ ফিডার পদে পাঁচ বছর এবং অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য ২০ বছরের মোট চাকরিসহ ফিডার পদে তিন বছর চাকরি প্রয়োজন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, পদের চেয়ে বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই নিম্নপদের কর্মকর্তার জায়গায় উচ্চপদের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন সংস্থায় উপসচিব পদমর্যাদার পরিচালক পদে যুগ্ম সচিবরা দায়িত্ব পালন করছেন। এতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে। এতে কমছে নিচের পদের কর্মকর্তার সংখ্যা। অনেককে নিচু পদে বাধ্য হয়ে কাজ করতে হয়। এ ছাড়া অনেকে থাকেন ওএসডি হিসেবে। ফলে প্রশাসনে বিশৃঙ্খলাও দেখা দেয় অনেক সময়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রশাসন ছাড়াও মোট ক্যাডারের সংখ্যা ২৬টি। প্রশাসন ক্যাডার ছাড়া অন্যগুলোতে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের পরও বছরের পর বছর একই পদে কাজ করতে হয়। একই ব্যাচের হয়েও প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব হয়ে গেলেও অন্য কর্মকর্তারা পদোন্নতি পান না। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে। উপসচিব থেকে ওপরের পদগুলো কোনো নির্দিষ্ট ক্যাডারের নয়, সরকারের পদ। ইচ্ছা অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়া হয়। সরকারের উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতি বিধিমালা, ২০০২ অনুযায়ী এসব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
পদোন্নতি বিধিমালায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ও ৩০ শতাংশ অন্যান্য ক্যাডারের যুগ্ম সচিব পদে কর্মরতদের বিবেচনায় নিতে হবে। বিধিমালা অনুযায়ী, মূল্যায়ন নম্বরের অন্তত ৮৫ নম্বর পেতে হবে। যুগ্ম সচিব পদে কমপক্ষে ৩ বছর চাকরিসহ ২০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা বা যুগ্ম সচিব পদে কমপক্ষে ২ বছরের চাকরিসহ ২২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হন।
বিধিমালা অনুযায়ী, উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এবং ২৫ শতাংশ অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিবেচনায় নিতে হবে। উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পাঁচ বছর চাকরিসহ সংশ্লিষ্ট ক্যাডারের সদস্য হিসেবে কমপক্ষে ১০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। মূল্যায়ন নম্বরের অন্তত ৮৩ নম্বর পেতে হবে বলে বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কেএম আলী আজম সময়ের আলোকে বলেন, পদোন্নতি নিয়মিত একটি প্রক্রিয়া। যারা পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেন, তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়। এটা না হলে তারা উদ্যম হারিয়ে ফেলবেন। তাই পদোন্নতির যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়। আমাদের যে অর্গানোগ্রাম দেখছেন, এটি পুরনো। তাই মনে হচ্ছে, পদের চেয়ে পদোন্নতি বেশি। বরং আমাদের যেসব উপসচিব, যুগ্ম সচিবের চাহিদা রয়েছে, সেগুলো দিতে পারছি না। আমরা অলরেডি এ সমস্যা সমাধানে দু-তিনটি সভা করেছি। এটি রি-অর্গানাইজড হবে। আমাদের কাজের ভ্যালু বেড়েছে। প্রজেক্ট বেড়েছে। প্রতিষ্ঠান বেড়েছে। তিনি বলেন, কর্মকর্তারা এখন তো বেশি ওএসডি নেই। যা আছে, সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। অচিরেই এর সমাধান হবে। আমাদের সব কিছু আপডেট হচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। এতে আশা করি আমাদের এ সমস্যাগুলো কমে আসবে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

