মীর মোশাররেফ হোসেন পাকবীর : আরবি শাবান মাস একটি মোবারক মাস। হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন। রমজানের প্রস্তুতির মাস হিসেবে তিনি এ মাসকে পালন করতেন। এ মাসের একটি রাতকে মুসলমানরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, মধ্য শাবানের এই রাত আমাদের এই জনপদে ‘শবেবরাত’ হিসেবে পরিচিত। আজ সেই মহিমান্বিত রাত। যে রাতটি মুসলমানদের কাছে ইবাদত-বন্দেগি ও তওবার রাত হিসেবে পরিচিত।
ফারসি ‘শব’ শব্দের অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ সৌভাগ্য। এ দু’টি শব্দ নিয়ে ‘শবেবরাত’, অর্থাৎ সৌভাগ্যের রজনী। আরবিতে একে বলে ‘লাইলাতুল বরাত’। আজ ১৪ শাবান রবিবার দিবাগত রাতটিই পবিত্র শবেবরাত। আল্লাহতায়ালা এ রাতে বান্দাদের জন্য তার
অশেষ রহমতের দরজা খুলে দেন। মহিমান্বিত এ রাতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বিগত জীবনের সব ভুল-ভ্রান্তি ও পাপ-তাপের জন্য গভীর অনুশোচনায় আল্লাহর দরবারে সকাতরে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ভারতীয় উপমহাদেশ বিশেষ করে বাংলাদেশে শবেবরাতকে ‘ভাগ্যরজনী’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়।
মুসলমানরা শবেবরাতে নফল নামাজ, জিকির-আজকার, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে বিনিদ্র রাত কাটায় ও আল্লাহতায়ালার কাছে বিনম্র প্রার্থনা করেন ভবিষ্যৎ জীবনে পাপ-পঙ্কিলতা পরিহার করে পরিশুদ্ধ জীবনযাপনের জন্য। একই সঙ্গে মৃত আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত করে তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন। পাড়া-মহল্লার মসজিদগুলোতে সন্ধ্যার পর থেকেই ওয়াজ-নসিহত, মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়। অনেকে গভীর রাত অবধি ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থেকে শেষ রাতে সেহির খেয়ে পরদিন নফল রোজা রাখেন।
শবেবরাতের বরকত, ফজিলত ও মর্যাদা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহতায়ালা মধ্য শাবানের রাতে তার সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরেক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’
আটজন সাহাবির সূত্রে বিভিন্ন সনদে এই হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, শবেবরাত ফজিলতময় এবং এ রাতে আল্লাহ তার বান্দাদেরকে ক্ষমা করে থাকেন। তবে ক্ষমা পাওয়ার শর্ত হলো- শিরক ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকা। এ দু’টি বিষয় থেকে যারা মুক্ত থাকবেন তারা কোনো অতিরিক্ত আমল ছাড়াই এ রাতের বরকত ও ক্ষমা লাভ করবেন। কিন্তু শিরক ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হতে না পারলে অন্য আমল দিয়ে ওই রাতের বরকত ও ক্ষমা লাভ করা যাবে না। দুঃখের বিষয় হলো, শবেবরাতে আমরা অনেক নফল আমল করলেও ওই দু’টি শর্ত পূরণের চেষ্টা খুব কম মানুষই করে থাকি।
আল্লাহতায়ালা যেকোনো সময় তার বান্দার দোয়া-প্রার্থনা কবুল করতে পারেন। তার পরও বছরের এমন কিছু বিশেষ সময়-ক্ষণ রয়েছে, যে সময়গুলোর মর্যাদা ও ফজিলত অন্য সময়ের তুলনায় বেশি। সেসব দিন-ক্ষণে কৃত ইবাদত, দোয়া-মোনাজাতের মর্যাদা বেশি ও সওয়াবের মাত্রা অপরিসীম। এ বিষয়গুলো মুসলমানদের মনে শবেবরাতে ইবাদত-বন্দেগি ও বেশি বেশি নেক কাজ করার স্পৃহাকে জাগিয়ে তোলে। ফলে দেশব্যাপী শবেবরাত উপলক্ষে সৃষ্টি হয় এক ধর্মীয় আবহ। যা মানুষের ধর্মীয় বিষয়াদি পালনের আগ্রহ সৃষ্টিতে বিরাট সহায়ক হয়।
শবেবরাতে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে মোমিন-মুসলমানরা বিভিন্ন আমল করে থাকেন। আলেমরা শবেবরাতে যে সব আমলের কথা বিশেষভাবে বলেছেন, সেগুলো হলো—
নফল নামাজ : শবেবরাতের অন্যতম আমল হলো নফল নামাজ আদায় করা। তবে শবেবরাতের নফল নামাজের কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। অন্য সময়ের মতোই নফল নামাজ দুই রাকাত দুই রাকাত করে যত রাকাত ইচ্ছা এবং যে কোনো সূরা দ্বারা আদায় করতে পারবেন।
কোরআন তেলাওয়াত : শবেবরাতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা। হাদিসে বলা হয়েছে কোরআন তেলাওয়াত হচ্ছে সর্বোত্তম জিকির। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, লোহায় পানি লাগলে যেমন মরিচা পড়ে, তেমনি গুনাহ করতে করতে মানুষের অন্তরে কালো কাল দাগ পড়ে যায়। নবী (সা.)-এর এ উক্তি শ্রবণ করে সাহাবাদের মধ্য থেকে একজন আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল। কীভাবে অন্তরের সে দাগগুলো বিদূরিত করা হবে? উত্তরে তিনি (সা.) বললেন, মৃত্যুকে খুব বেশি করে স্মরণ করা আর কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করা। এছাড়া কোরআন শরিফ তেলাওয়াতের সওয়াবও অসীম।
তওবা-ইস্তেগফার : শবেবরাতে জীবনের কৃত গোনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, নফসের প্রলোভনে ও শয়তানের ধোঁকায় পড়ে কোনো বান্দাহ গোনাহের কাজ করে ফেলার পর যদি আল্লাহর দরবারে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাহলে মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। ফলে সে এরূপ হয়ে যায়, যেন সে আদৌ কোনো পাপ করেনি। পবিত্র এ রাতে তাই আমাদের বেশি বেশি তওবা-ইস্তেগফার পড়তে হবে।
কবর জিয়ারত : কবরস্থানে গিয়ে মৃত আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত করা এবং তাদের পরকালীন কল্যাণ কামনা করে দোয়া করা। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং এ আমল করেছেন। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হাদিসে আমরা পাই যে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) শবেবরাতে জান্নাতুল বাকি নামক কবরস্থানে তাশরিফ নিয়ে মৃতদের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করেছেন।
বাঙালি মুসলিম সমাজে শবেবরাতের একটি আনন্দঘন সামাজিক দিকও রয়েছে। এদিন মুসলমানদের বাড়িতে সাধ্যানুযায়ী হালুয়া, পায়েস, রুটিসহ নানা উপাদেয় খাবার রান্না করা হয়। এসব খাবার আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে পাঠানো এবং গরিব-
দুঃখীর মধ্যে বিতরণ করা হয়। অনেকে মুক্ত হস্তে দান-খয়রাতও করে থাকেন। বরাবরের মতোই শবেবরাতের পরদিন অর্থাৎ কাল সোমবার সরকারি ছুটি থাকবে।
হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) ও হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তারা উভয় বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যদি এমন কোনো ব্যক্তি মৃতের কবরের পাশে উপস্থিত হয় (যার সঙ্গে মৃতের জীবিত থাকা অবস্থায় পরিচয় ছিল) এবং তাকে সালাম জানায় তাহলে মৃত ব্যক্তি তখনও তাকে চিনতে পারে এবং তার সালামের উত্তর দিয়ে থাকে। এমনকি দুনিয়ায় তার সঙ্গে পরিচয় না থেকে থাকলেও তার এ জিয়ারতে মৃত সন্তুষ্ট হয়।
হাদিসের ভাষ্যমতে এটা স্পষ্ট যে, আজকের রাত হচ্ছে আল্লাহর কাছে পাওয়ার রাত, চাওয়ার রাত। এ রাত হচ্ছে আল্লাহর দরবারে কাঁদার রাত। এ রাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন গোনাহ মাফ করার জন্য প্রস্তুত থাকেন।
আমাদের দেশ মুসলিম প্রধান একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিককালে অপরাধপ্রবণতা এত অধিক প্রবৃদ্ধিমান যে, প্রতিদিন ভোরবেলা পত্র-পত্রিকা ও অন্য প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত খবরাদির প্রতি লক্ষ্য করলে লজ্জায় মাথা নত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় চলমান সমাজের অপরাধ প্রবণতা রোধে বেশি বেশি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন আবশ্যক। শবেবরাত তেমনই একটি অনুষঙ্গ।
বস্তুত অপরাধের মূল উৎসসমূহ বন্ধ করতে দরকার সমাজের লোকদের পরিশুদ্ধি। ধর্মীয় এই চেতনা ও দৃঢ় মানসিকতা সমাজ মানসে সৃষ্টিতে শবেবরাতসহ যেসব ধর্মীয় কার্যকলাপ অধিক সহায়ক, সেসব কাজই আজ আমাদের সামনে উপস্থিত। আল্লাহ আমাদেরকে আন্তরিক পরিশুদ্ধতা লাভের সুযোগ হিসেবে দোয়া কবুল ও সংশোধনের দ্বারা জীবনকে শুদ্ধ ও পবিত্র করার যে সুযোগ দিয়েছেন আমাদের দিয়েছেন; এখন ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের সবার কর্তব্য হলো, তার সদ্ব্যবহার করা। নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা।
আমরা জানি, মানুষ জীবনের চলার পথে বিভিন্ন লোভ-প্রলোভন ও ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হয়ে যেসব অপরাধে লিপ্ত হয়, ভবিষ্যতে একই অন্যায়-অপরাধে লিপ্ত হবে না- এরূপ দৃঢ় সংকল্প সহকারে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি বান্দার সব অপরাধ মার্জনা করেন। আজ যেহেতু তেমন একটি মহাসুযোগের রাত, তাই এ রাতে কাতর ফরিয়াদ মিশ্রিত দোয়া-মোনাজাতসহ বিভিন্ন নফল ইবাদত-বন্দেগিতে কাটানো দরকার।
লেখক : বিশিষ্ট সমাজসেবক, শিশু সংগঠক ও সাংবাদিক।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

