এমএনএ রিপোর্ট : প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ধসের ঘটনায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের পাঁচ জেলা চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৬-এ পৌঁছেছে। অনেকে এখনো নিখোঁজ। তাদের সন্ধানে সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও স্থানীয় লোকজন কাজ করছেন।
রাঙামাটি থেকে ১০৯ জন, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ২১ জন ও চন্দনাইশে সাতজন, বান্দরবানে ছয়জন, খাগড়াছড়িতে একজন এবং কক্সবাজারের টেকনাফে দুইজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রবল বর্ষণে গত সোমবার মধ্যরাত ও গতকাল মঙ্গলবার ভোরে পাহাড়ধসে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে রাঙামাটিতে। গতকাল ভোর পাঁচটা থেকে রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধস শুরু হয়। বেলা ১১টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় শহরের ভেদভেদি, রাঙ্গাপানি, যুব উন্নয়ন, টিভি স্টেশন, রেডিও স্টেশন, রিজার্ভ বাজার, মোনঘর, শিমুলতলি ও তবলছড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। সেখানে এখনো অনেকে লোক মাটিচাপা পড়ে আছে।

গতকাল পর্যন্ত রাঙামাটির বিভিন্ন স্থান থেকে ১০১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সেনাবাহিনীর দুই কর্মকর্তাসহ ছয় সেনা সদস্যও রয়েছেস। পাহাড়ধসে বন্ধ হয়ে যাওয়া রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক চালু করতে গিয়ে প্রাণ হারান তাঁরা। আজ সেখান থেকে আরও আটজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক প্রকাশ কান্তি চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, আজ বুধবার রাঙামাটি থেকে আরও আটজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ভেদভেদি থেকে মা-মেয়েসহ পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মায়ের নাম পন্তি সোনা চাকমা (৩৫) ও মেয়ের নাম সান্ত্বনা চাকমা (৯)। যুব উন্নয়ন এলাকা থেকে একই পরিবারের তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন রুপালি চাকমা (৩৫) ও তাঁর দুই মেয়ে জুঁই চাকমা (১২) ও ঝুমঝুমি চাকমা (৭)। তিনি জানান, রাঙামাটিতে মৃতের সংখ্যা ৯৮ থেকে বেড়ে ১০৬-এ পৌঁছেছে। এ সংখ্যা বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ২১ জন ও চন্দনাইশ উপজেলায় সাতজন এবং বান্দরবানে পাহাড়ধসে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আজ বেলা দুইটার দিকে বান্দরবানের লেমুঝিরি আগাপাড়া এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে আজিজুর রহমানের নিখোঁজ স্ত্রী কামরুন্নাহার (৪৫) ও মেয়ে সুখিয়া আক্তারকে (১৪) উদ্ধার করা হয়। তাঁদের উদ্ধারে সকাল থেকে অভিযান চলে সেখানে।

কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড় ধসে সেখানে মোহাম্মদ সেলিম (৪০) ও তার মেয়ে টিস্যু মনির (৩) মৃত্যু হয়েছে। আজ বুধবার ভোরে উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পশ্চিম সাতঘরিয়াপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানান, গতকাল মঙ্গলবার রাতে ভারি বর্ষণে পাহাড়ের অংশ বিশেষ তাদের ঘরে ধসে পড়ে। এতে ঘুমিয়ে থাকা বাবা ও মেয়ে মাটিচাপা পড়ে মারা যায়।
খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসে একজন নিহত হয়েছেন। খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়নের পরিমল চাকমা গতকাল সকাল সাতটায় গরু আনতে গিয়ে পাহাড়ধসে মারা গেছেন। তাঁর তিনটি গরুও মরেছে।
লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সুপার জ্যোতি চাকমা পরিমল চাকমার মৃত্যুর খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পাহাড়ধসে আহত সাতজনকে লক্ষ্মীছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নেওয়া হয়েছে।

রাঙামাটির মানিকছড়িতে পাহাড় ধসে সেনা ক্যাম্প ধসে পড়েছে। গাছপালা ভেঙে পড়ায় ও মহাসড়কে পানি উঠে যাওয়ায় চট্টগ্রামের সঙ্গে রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। দুর্গত এলাকা পানিবন্দি থাকায় অনেক স্থানে বন্ধ রয়েছে বিদ্যুৎও।
পানিবন্দি হয়ে তিন জেলায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে অন্তত দুই কোটি মানুষকে। ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ায় অনেকে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থা উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে। পাহাড় ধসের ঘটনায় আহতরা আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিস সোমবার বেলা ১২টা থেকে মঙ্গলবার বেলা ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৩১ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটিতে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ পরিমাণ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে; সোমবার সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ৩৪২ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

