বর্তমান মন্ত্রিসভা বহাল রাখার ইঙ্গিত দিলেন প্রধানমন্ত্রী
Posted by: News Desk
October 22, 2018
এমএনএ রিপোর্ট : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে বর্তমান মন্ত্রিসভা বহাল রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। তবে তিনি জানিয়েছেন, বিরোধী দল দাবি করলে মন্ত্রিসভার আকার ছোট করা হবে, নয়তো যেভাবে আছে সেভাবেই থাকবে।
আজ সোমবার বিকেলে গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। তার সাম্প্রতিক সৌদি আরব সফর নিয়েই এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
গতকাল রবিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, কয়েকদিনের মধ্যেই মন্ত্রিসভার আকার ছোট হয়ে যাবে।
নির্বাচন আয়োজনে মন্ত্রিসভার আকার ছোট হবে কি-না, সাংবাদিক নাইমুল ইসলাম খানের এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কী যে ছোট করবো সেটাতো খুঁজে পাচ্ছি না।
বড় থাকলে অসুবিধা আছে? প্রধানমন্ত্রী এমন পাল্টা প্রশ্ন করলে নাইমুল ইসলাম খান বলেন, ‘আইনে তো নেই আপা।’
এরপর প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনেও নাই, কোথাও নাই। তবে আমি বলেছিলাম, আপনারা জানেন যে, ২০০৪ সালের নির্বাচনের আগে, (বিএনপি প্রধান) খালেদা জিয়া তখন বিরোধী দলীয় নেত্রী ছিলেন, সবাইকে নিয়ে একটা নির্বাচনকালীন সরকার গড়তে চেয়েছিলাম। সেখানে (বিএনপিকে বলা হয়েছিল) আপনারা আপনাদের পছন্দমতো মন্ত্রণালয় নেবেন। তারা এলো না। অন্য বিরোধী দল যারা ছিল, তাদের নিয়েই মন্ত্রিসভা গঠন করি।
বর্তমান মন্ত্রিসভা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন, আমাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দলকে নিয়েই মন্ত্রিসভা গঠন করেছি। এই মন্ত্রিসভা নিয়ে চলছি। আগে এটা ছিল না, আগে কেবল আমাদের আওয়ামী লীগেরই ছিল। এখন জনগণের প্রতিনিধি যারা, তাদের নিয়েই মন্ত্রিসভা রয়ে গেছে। তারপরও আমি বিরোধী দলীয় নেতা (জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ) কথা বলেছি এ ব্যাপারে। আমি বলেছি, আপনারা যেভাবে চান, সেভাবে হবে। যেহেতু সব দলের প্রতিনিধি আছে।’
এখন জানি না এটা প্রয়োজন আছে কি-না। মন্ত্রিসভা ছোট করা হলে একজনকে কয়েকটা মন্ত্রণালয় চালাতে হবে। তবে সত্যি কথা বলতে কী- আমাদের মন্ত্রিসভার হাতে এখন এতোগুলো প্রকল্প আছে, কয়েকটা মন্ত্রণালয় যদি একজনের হাতে দিই, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিঘ্ন হবে কি-না। সেক্ষেত্রে কোনো কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ দুই তিন মাসের জন্য থমকে যেতে পারে। কাজগুলো করতে গেলে মন্ত্রণালয় থেকে কাউকে সরালে কাজ ব্যাহত হবে কি-না, এ সমস্যা রয়ে গেছে। এই কাজগুলো দ্রুত শেষ করতে চাই। দেশের উন্নয়ন কাজে কোনো বাধা হবে কি-না, সেই চিন্তাটা রয়ে গেছে।
বিরোধী দল দাবি না করলে বর্তমান মন্ত্রিসভাই বহাল রাখার ইঙ্গিত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনাও করেছি। অন্য যেখানে সংসদীয় গণতন্ত্র আছে, সেখানেও আলাপ করে দেখেছি, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড-ব্রিটেন-ভারতে আছে, সবার কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করেছি। এরকম কোনো প্রয়োজন আছে মনে করি না। তারপরও দেখা যাক, যদি বিরোধী দল দাবি করে, তখন করবো, না করলে আর কী করার।’
সম্প্রতি গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি-জেএসডি-নাগরিক ঐক্যসহ বেশ কিছু দলকে নিয়ে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ গঠিত হয়। এই ফ্রন্ট নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করেছে সরকারের কাছে।
এছাড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা ও ১১ কর্মসূচি নিয়েও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবি ও লক্ষ্য নিয়ে বসতে সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়া হবে বলে জানা গেছে, এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কি বা আলোচনায় বসবেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এখনও কারও কাছ থেকে কোনো চিঠি পায়নি, আগে পাই তারপর দেখা যাবে।
এ সময় তিনি বলেন, ড. কামাল কাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন সেটা আগে দেখতে হবে। যারা মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে জড়িত, যারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত, যারা এতিমের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত, যারা দণ্ডপ্রাপ্ত এবং সাজাপ্রাপ্ত আসামি তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ড. কামাল।
যারা যুদ্ধাপরাধী তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, যারা আগুন দিয়ে নিরীহ সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে তারাই এই গ্রুপে রয়েছে। এরা সবাই এক হয়েছে তাদের রাজনীতিটা কোথায়? প্রশ্ন করেন প্রধানমন্ত্রী।
ড. কামাল প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির দায়ে যারা অভিযুক্ত হয়েছেন তাদের সঙ্গে নিয়ে এক হয়েছেন ড. কামাল। তিনি তো সংবিধান প্রণেতা, সংবিধান তৈরি করেছেন। তিনিই তো ৭২ এর সংবিধান মানেন না।
এই ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে তো রাজনৈতিক স্বাধীনতা রয়েছে, কথা বলার স্বাধীনতা আছে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা আছে, সব কিছু মুক্ত। আমাদের বিচার বিভাগ স্বাধীন, সবই স্বাধীন। মানুষ স্বাধীনতা ভোগ করছে। সেই সুযোগ নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, সেটাকে স্বাগত জানাই। কারণ এটা প্রয়োজন আছে। তারা যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তারা যদি রাজনৈতিকভাবে সাফল্য পায়, তাহলে তো অসুবিধা নাই। তবে একটু কথা বলার দরকার। কারা কারা এক হলো, সেটা আপনারা একটু খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, যারা সেখানে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তারা কোথা থেকে এসেছে, কার কী ধরনের ভূমিকা, কী ধরনের বাচনভঙ্গি, এমনকি মেয়েদের প্রতি যে কী ধরনের কটূক্তি করতে পারে, সে প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়েছে। এই যে এ গাছের ছাল, ওই গাছের বাকল সবমিলে একটা তৈরি হয়েছে, তো, যাক তারা ভালো কাজ করুক, সেটা চাই। আওয়ামী লীগ এটা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা করে না। বরং একটা হয়েছে, এটাই ভালো। এখানে স্বাধীনতাবিরোধী আছে, এখানে জাতির পিতার হত্যাকারীদের মদতদাতা, ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স দিয়ে তাদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা, এমনকি যারা জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছে, বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছে, তারা মিলেই কিন্তু এক জায়গায় হয়েছে। এটাকে বাংলাদেশের মানুষ কিভাবে দেখে, সেটাই বড় কথা।
জোটের এক সদস্য একজন নারী সাংবাদিককে যে নোংরা কথা বলতে পারে, তারা সবাই এক। এমন একটা জোট হয়, আমরা খারাপ কিছু দেখছি না। তারা যদি কিছু অর্জন করতে চায় করুক। কারণ, এদের কেউ কেউ আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে, কেউ কেউ আওয়ামী লীগেও ছিলেন। তারা জোট করেছেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। রাজনীতিতে এ স্বাধীনতা সবার আছে, কারণ এখানে একটি গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠিত। সেই সুফল নিয়ে যারা জোটবদ্ধ হয়েছেন, তারা কী করতে পারেন দেখা যাক।
তিনি বলেন, আমি ক্ষমতায় থাকাকালে মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করেছি, কাজ করছি, সারাজীবন কাজ করে যাব। বাংলাদেশের জনগণ যদি চাই তাহলে আবারও ক্ষমতায় আসব এবং জনগণ না চাইলে ক্ষমতায় আসব না। জনগণ যা চাইবে তাই হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার সৌদি সফরে দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক, বাদশাহ সালমান ও ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠকের কথা তুলে ধরেন। উল্লেখ করেন অন্যান্য কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের কথাও। তিনি বলেন, এ সফর দু’দেশের সম্পর্কোন্নয়নে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সৌদি বাদশাহকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তিনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন এবং অদূর ভবিষ্যতে তিনি বাংলাদেশে আসবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন সৌদি বাদশাহ। এছাড়া তিনি আমাকে হাফ সৌদি বলে আখ্যায়িত করেন।
তিনি বলেন, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বাংলাদেশে বিনিয়োগের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। এ সময় বাংলাদেশের সঙ্গে মোট পাঁচটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এছাড়া সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।
এই সফর বাংলাদেশের স্বার্থে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের আমন্ত্রণে চার দিনের সফরে গত মঙ্গলবার সৌদি আরবে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এই সফরে সৌদি বাদশাহ সালমান এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা।
সফরের দ্বিতীয় দিন গত বুধবার রিয়াদে সৌদি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। ওই দিন দুপুরে তিনি সৌদি বাদশাহ সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং রাজপ্রাসাদে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।
বাদশাহর সঙ্গে বৈঠকের পর রিয়াদে নিজস্ব জমিতে বাংলাদেশ দূতাবাস ভবনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা।
গত বুধবার মদিনায় গিয়ে তিনি মসজিদে নববীতে এশার নামাজ পড়েন এবং মহানবী হজরত মোহাম্মদের (স.) রওজা জিয়ারত করেন।
মদিনা থেকে গত বৃহস্পতিবার জেদ্দায় পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের চ্যান্সেরি ভবনের ভিত্তিফলক উন্মোচন করেন।
সেদিনই তিনি মক্কায় যান এবং ওমরাহ পালন করেন। সফর শেষে গত শুক্রবার রাতে দেশে ফেরেন শেখ হাসিনা।
মন্ত্রিসভা বহাল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিত 2018-10-22