এমএনএ রিপোর্ট : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভারতে সফরের মধ্য দিয়ে সেদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুসংহত হয়েছে। বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তাৎপর্য বহন করে। বর্তমানে তা এক বিশেষ উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুন গতির সঞ্চার করেছে।
ভারত সফর শেষ করে একদিন পরে আজ মঙ্গলবার বিকালে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সম্মেলনে তিনি ভারত সফরের অর্জন ও সফলতা তুলে ধরেন।
প্রতিরক্ষা সমঝোতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত মিত্রবাহিনী হিসেবে আমাদের সহযোগিতা করেছে। ভারতের সেনাবাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। বন্ধুপ্রতিম এদেশের সঙ্গে এমওইউ করতে এসে প্রশ্ন কেন?
শেখ হাসিনা বলেন, যাদের সঙ্গে আমরা যুদ্ধ করলাম, যারা আমাদের বিরোধিতা করল- তাদের সঙ্গে সামরিক চুক্তি নিয়ে কথা নেই। কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করল তাদের সঙ্গে এমওইউ (সমঝোতা স্মারক) করা নিয়ে প্রশ্ন উঠে।
তিনি বলেন, আমি ব্যক্তি স্বার্থ নিয়ে রাজনীতি করি না। দেশের মর্যাদা আমার কাছে অনেক বড়। যেখানে আমি আছি, তাতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কিছু আমি বেঁচে থাকতে হবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিফেন্স চুক্তির ব্যাপারে আম এটুকু বলব, এটা আমরা আর একটা এমওইউ স্বাক্ষর করেছি।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামো সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছি। এখানে বিভ্ন্নি ক্ষেত্রে আমরা সহযোগিতা করব।
এর মধ্যে যেসব বিষয় রয়েছে তাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তা হলো- বিভিন্ন কাঠামোগত সহযোগিতা, দুই দেশের সামরিক সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও আলোচনা সভা, মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি সম্বলিত অনুষ্ঠান উদযাপন, দুই দেশের সামরিক প্রশিক্ষক ও পর্যবেক্ষক বিনিময়, সামরিক সরঞ্জমাদি সংরক্ষণে পারস্পরিক সহযোগিতা, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বিষয়ক পর্যবেক্ষণ, ক্রীড়া ও দুঃসাহসিক অভিযান কার্যক্রম পরিচালনা, দুর্যোগ ও ত্রাণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা সহযোগিতা, স্টাফ পর্যায়ে বার্ষিক আলোচনা, দুদেশের নৌবাহিনীর জাহাজ ও বিমান বাহিনী উড়োজাহাজের সফর বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা সম্বলিত টহল ও অনুশীলন।
এসময় প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে বেলারুশ, চীন, ফ্রান্স,কুয়েত, রাশিয়া এবং তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত চুক্তি রয়েছে।
গঙ্গা ব্যারেজ নিয়ে এক প্রশ্নে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় গঙ্গা ব্যারেজ নামে যে ব্যারেজের সমীক্ষা ও যে ডিজাইনইনটা তৈরি করেছে সেটা সম্পূর্ণ ভুল। এটা আমি নাকচ করে দিয়েছি। কারণ এটা আমাদর জন্য আরও আত্মঘাতী হবে, ওই তিস্তা ব্যারেজের মত আত্মঘাতী হবে।
তিনি বলেন, পাংশায় আমার মূল নদীর স্রোতের মধ্যে একখানা ব্যারেজ দিয়ে তারপর পানি পানি করে কানতে হবে আমাদের। এটা আমরা করতে রাজি না।
পদ্মায় বাঁধ দিয়ে গঙ্গা অববাহিকার পানি সংরক্ষণ করে তা কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবহারের লক্ষ্যে ১৯৬২-৬৩ সালে প্রথমবারের মত গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের বিষয়ে জরিপ হয়।
এরপর দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলেও ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সময়ে গঙ্গার পানিবণ্টনে ভারতের সঙ্গে চুক্তির পর ব্যারেজ নির্মাণের আলোচনা আবার জোর পায়।
ওই ব্যারেজের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ২০০৫ সালে কাজ শুরুর পর ২০১৩ সালে সমীক্ষার কাজ শেষ হয়। পরের বছর ভারতকে ওই প্রকল্পের সারসংক্ষেপও হস্তান্তর করা হয়।
তখনকার পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন বলেছিলেন, ওই ব্যারেজ হলে বর্ষা মৌসুমে আসা পদ্মার পানি সংরক্ষণ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯ জেলায় সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ১৬০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সে সময় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ২০২৬ সালে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তার আগেই ব্যারেজ নির্মাণের কাজ শেষ না হলে নতুন চুক্তির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
এবারও প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে অববাহিকাভিত্তিক যৌথ পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি জোর পায় এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমত বন্দ্যোপাধ্যয়ের বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয় বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধামন্ত্রী বলেন, ভারতের সঙ্গে যখন গঙ্গার পানি চুক্তি করি, তখনই আমি বলেছিলাম, আমরা একটা ব্যারেজ করব, গঙ্গা ব্যারেজ, সেই ব্যারেজটা হবে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে এবং যৌথভাবে। এমনভাবে এটা তৈরি করা হবে যেন দুটি দেশের মানুষ এটা ব্যবহার করতে পারে।
আর আমাদের পানিসম্পদ যেটা পাংশায় করেছে, সেটা সম্পূর্ণ ভুল একটা পরিকল্পনা। ওটা কখনো বাস্তবায়ন করা ঠিক হবে না আমাদের জন্য।
এবার মমতার সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে বলেছি, আপনি জায়গা দেখেন, আমরাও জায়গা দেখি, আমাদের শাখা নদী এবং দুই দেশ মিলে, অর্থাৎ.. ব্যারেজ মানে ওয়াটার রিজার্ভার তৈরি করা। যেন বর্ষাকালে পানিটা আমরা ধারণ করে রাখতে পারি এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিটা যেন আমরা ব্যবহার করতে পারি। সেইভাবে একটা জায়গা খুঁজে সেইখানে করাটাই সব থেকে যুক্তিযুক্ত।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যারা ওই পাংশায় ব্যারেজের নকশা করেছেন, তাদের সমালোচনা করে সরকারপ্রধান বলেন, কিছু মানুষের চিন্তা থাকে, একটা বানানো গেলেই টাকা আসবে পয়সা আসবে, কমিশন আসবে…।
গঙ্গা ব্যারেজের ফাইলে নোট লিখে ফেরত দিয়ে দিয়েছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই নকশা তার ‘পছন্দ হয়নি’।
ব্যারেজ বা রিজার্ভার যাই হোক, তা ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে করতে হবে এবং খরচও যৌথভাবে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে ১৩টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সমঝোতা ও চুক্তি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান তিনি। এসব দেশ হলো- বাহরাইন, চেক প্রজাতন্ত্র, ইতালি, কাতার, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ফিলিস্তিন, ফিলিপাইন, সার্বিয়া, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা স্মারক প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটা কথা মনে রাখতে হবে- আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে ভারতের সামরিক বাহিনীর অবদান রয়েছে। তাদের অনেকে জীবন দিয়েছে।’
তিনি বলেন, আমরা এখন স্বাধীন দেশ। আমাদের দেশের তুলনায় আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী যথেষ্ট শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলছি। তারপরও কিন্তু জ্ঞানের শেষ নেই, শিক্ষার শেষ নেই, প্রশিক্ষণের শেষ নেই। সেদিক লক্ষ্য রেখে আমরা বিভিন্ন কাঠামোগত সহযোগিতার জন্য এমওইউ করেছি।
ভারতের কাছ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের লাইন অব ক্রেডিট দিয়ে সামরিক সরঞ্জাম কেনার ব্যাপারে বাংলাদেশের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সার্বিক স্বার্থ বজায় রেখেই সব করা হবে। কোন দেশ থেকে কী কিনব তা নিয়ে কোনো বাইন্ডিংস (ধরাবাধা নিয়ম) নেই।
প্রতিরক্ষা এমওইউর সমালোচনার ব্যাপারে শেখ হাসিনা বলেন, যারা সন্দেহ করছেন, নানা কথা বলছেন তারা বলবেনই। তাদের চরিত্র আমার জানা আছে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে- যেখানে আমি আছি, তাতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কিছু আমি বেঁচে থাকতে হবে না।
ভারত সফরে ৩৫টি চুক্তি ও এমওইউ সই হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এরমধ্যে ১১টি চুক্তি ও ২৪টি সমঝোতা স্মারক। দুদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত ৯ বিলিয়ন (নয়শ’ কোটি) ডলারের ১৩টি চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারকও এগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
এর আগে গত সাত এপ্রিল শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চারদিনের ভারত সফরে যান। গতকাল সোমবার তিনি দেশে ফিরে আসেন। ভারত সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। এ সময় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে হায়দরাবাদ হাউসের বলরুমে বৈঠক শেষে ঢাকা ও নয়াদিল্লীর মধ্যে ৩৪টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

