Don't Miss
Home / অর্থনীতি / বান্দরবানে হচ্ছে বিশ্বমানের আধুনিক টিস্যুকালচার ল্যাব, তিন পাহাড়ের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

বান্দরবানে হচ্ছে বিশ্বমানের আধুনিক টিস্যুকালচার ল্যাব, তিন পাহাড়ের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

এমএনএ প্রতিবেদক

সাঙ্গু নদীর স্বচ্ছ জলধারা, নদীর ওপারে সারি সারি সবুজ পাহাড়, কোথাও মেঘের ছায়া, কোথাও রোদের ঝিলিক—এই মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝেই বান্দরবানের সদর উপজেলার বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারে গড়ে উঠছে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক প্ল্যান্ট টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরি। নান্দনিক স্থাপত্যে নির্মিত গোলাকার এই ভবনটি ইতোমধ্যে স্থানীয়দের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দূর থেকে দেখতে অনেকটা সবুজ পাহাড়ের বুকে বসে থাকা কোনো আন্তর্জাতিক মানের স্থাপনার মতো মনে হলেও এটি আসলে পাহাড়ি কৃষির প্রযুক্তিনির্ভর নতুন যুগের সূচনার প্রতীক।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের “টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প”-এর আওতায় নির্মিত এই ভবনটি দেশের অন্যতম আধুনিক গবেষণাগার হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি ল্যাব নয়; বরং পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি জ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম।

ভবনটির সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য এর নির্মাণশৈলী। জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘নিউক্লিয়াস’ বা কোষকেন্দ্রের আদলে পুরো ভবনের নকশা করা হয়েছে। আধুনিকতা ও পরিবেশবান্ধব ভাবনার সমন্বয়ে নির্মিত এই স্থাপনায় সিরামিক ব্রিক ও আয়রন চিপস ব্যবহার করা হয়েছে। এমনভাবে ভবনের চারপাশ ও উপরের অংশ নির্মাণ করা হয়েছে যাতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করতে পারে। এতে ভেতরে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমবে এবং গবেষণা ও ল্যাব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

নির্মাণাধীন এই টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরিতে থাকছে আধুনিক মিডিয়া প্রস্তুতি রুম, ইনোকুলেশন বা ট্রান্সফার রুম, কালচার বা গ্রোথ রুম, অ্যাক্লাইমেটাইজেশন ও হার্ডেনিং জোন, গ্লাস হাউস এলাকা, পাশাপাশি গবেষণা ও প্রশিক্ষণের বিশেষায়িত সুবিধা। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব অবকাঠামোই এখানে রাখা হচ্ছে।

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, টিস্যুকালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ রোগমুক্ত, মানসম্মত ও জেনেটিকভাবে অভিন্ন চারা উৎপাদন করা সম্ভব। এতে কৃষকের উৎপাদন বাড়বে, রোগের ঝুঁকি কমবে এবং ব্যয়ও কমে আসবে।

বান্দরবান সদর উপজেলার রাজবিলা এলাকার কৃষক নিংসাথুই মারমা বলেন, “আমরা অনেক সময় বাইরে থেকে চারা কিনে আনি। কিন্তু অনেক চারাই ঠিকমতো হয় না, রোগ হয়, গাছ মারা যায়। যদি এই ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির চারা পাওয়া যায় তাহলে পাহাড়ের কৃষকরা অনেক উপকার পাবে।”

তিনি আরও বলেন, পাহাড়ি বাংলা কলা, সবরি কলা, আনারস, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, অর্কিডসহ উচ্চমূল্যের ফসলের উন্নত চারা উৎপাদন হলে পাহাড়ের তরুণদের কৃষির প্রতি আগ্রহ আরও বাড়বে।

পাহাড়ি অঞ্চলে কৃষিতে নারীদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিনের হলেও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে তাদের সম্পৃক্ততা এখনও সীমিত। এই ল্যাবকে ঘিরে আশাবাদী নারীরাও।

বান্দরবান সদর ইউপির ২ নম্বর ওয়ার্ডের নারী কৃষক নাগছবি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “আমরা পাহাড়ে অনেক সম্ভাবনাময় ফসল চাষ করতে চাই। কিন্তু উন্নত চারা সহজে পাওয়া যায় না। এই ল্যাব হলে মেয়েরাও নতুনভাবে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে পারবে।”

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কেন্দ্র কেবল টিস্যুকালচার চারা উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এখানে পাহাড়ি উপযোগী ফসল নিয়ে গবেষণা, নতুন জাত সংরক্ষণ, মাতৃগাছ উন্নয়ন এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজও করা হবে।

বিশেষ করে অর্কিড, বিদেশি ফুল, উচ্চমূল্যের ফল, পাহাড়ি মসলা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা।

প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, “এটাকে সাধারণ একটা ভবন হিসেবে ভাবলে ভুল হবে। আমরা আসলে ভবিষ্যতের কৃষির জন্য একটি জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছি। পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষকদের জন্য রোগমুক্ত ও মানসম্মত চারা নিশ্চিত করা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা এবং গবেষণাকে মাঠমুখী করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”

বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক লিটন দেবনাথ জানান, ভবনের কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি বলেন, “অত্যন্ত আধুনিক এই ভবনের কাজ হচ্ছে খুব মানসম্মতভাবে। যেহেতু এটি ল্যাবের ভবন, তাই প্রতিটি উপকরণ ব্যবহারের আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও নিয়মিত কাজ পরিদর্শন করছেন।”

তিনি আরও বলেন, “গবেষণাগারের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনায় তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিষয়গুলো মাথায় রেখে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে ভবনের নির্মাণকাজ করা হচ্ছে।”

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষিবিজ্ঞানী ড. এম এ রহিম বলেন,

“টিস্যু কালচারের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য, রোগমুক্ত এবং মানসম্পন্ন চারা উৎপাদন করা যায়। বান্দরবানের এই ল্যাব ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ মানসম্পন্ন চারা উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ বলেন, “বাংলাদেশের কৃষি এখন নতুন এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, মানসম্পন্ন ও রোগমুক্ত উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। টিস্যুকালচার প্রযুক্তি সেই সুযোগ তৈরি করছে। পাহাড়ি অঞ্চলে উচ্চমূল্যের ফল, ফুল, মসলা ও রপ্তানিযোগ্য ফসলের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। উন্নত চারা ও প্রযুক্তি সহায়তা পেলে এখানকার কৃষকরা জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবেন।”

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, বান্দরবানের এই টিস্যুকালচার ল্যাব শুধু পাহাড়ি কৃষকদের জন্য রোগমুক্ত ও উন্নত চারা নিশ্চিত করবে না, বরং পার্বত্য অঞ্চলে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, গবেষণা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং রপ্তানিযোগ্য উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

প্রকৃতি ও প্রযুক্তির অনন্য সমন্বয়ে নির্মিত এই আধুনিক গবেষণাগার শেষ পর্যন্ত তিন পাহাড়ের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে—এমনটাই আশা কৃষিবিদ, কৃষক এবং সংশ্লিষ্ট সবার।

x

Check Also

আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম–এর ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ ...