বিতর্কিত ‘পদ্মাবতী’র আদ্যোপান্ত ইতিহাস
Posted by: News Desk
November 27, 2017
এমএনএ বিনোদন ডেস্ক : এই মহুর্তে বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমার নাম হচ্ছে পদ্মাবতী। বিতর্কিত এই ‘পদ্মাবতী’র আদ্যোপান্ত ইতিহাস সম্পর্কে এ প্রতিবেদনে বিষদ তুলে ধরা হলো। যেদিন থেকে ঘোষণা এসেছে, চিতোরের রানি পদ্মিনীর ইতিহাস বন্দি হতে যাচ্ছে রুপালি পর্দায়, সেদিন থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত। বলিউড সিনেমার ইতিহাসে এতো বেশি বিতর্ক কোন সিনেমা নিয়ে মনে হয় তৈরি হয়নি, যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে সঞ্জয় লীলা বানসালি পরিচালিত ‘পদ্মাবতী’ সিনেমার ক্ষেত্রে। শুধু শুটিং সেট ভাঙচুর, আগুন লাগানো, পরিচালককে মারধোর, কিংবা ভক্তের নির্মিত রাঙ্গোলি নষ্ট করাই নয়, আত্মহত্যা করেও এই সিনেমার মুক্তি বন্ধ করার চেষ্টা চলছে ভারত উপমহাদেশে।
কথা ছিল, আগামী ১ ডিসেম্বর ছবিটি বিশ্বব্যাপী মুক্তি পাবে, যাতে রানি পদ্মিনী চরিত্রে দেখা যাবে দীপিকা পাড়ুকোনকে, সেই সঙ্গে রাজা রাওয়াল রতন সিংয়ের ভূমিকায় শহীদ কাপুর ও আলাউদ্দিন খিলজি চরিত্রে দেখা যাবে রণবীর সিংকে। কিন্তু প্রতিবাদী কয়েকটি সংগঠনের চাপে পড়ে পিছিয়ে দেয়া হয়েছে ইতিহাসভিত্তিক ছবিটির মুক্তি। চলতি বছর যে ছবিটি মুক্তি পাচ্ছে না, তা নিশ্চিত। তবে আগামী বছরেও ছবিটি আলোর মুখ দেখবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। কিন্তু কেন এই আপত্তি? তা জানার আগে জেনে নিতে হবে চিতোরের সুন্দরী রানি ‘পদ্মাবতী’র ইতিহাস।
অনিন্দ্য সুন্দরী পদ্মাবতী ছিলেন সিংহল অর্থাৎ বর্তমান শ্রীলঙ্কার রাজকন্যা। আবার কারও মতে সিংহল নয়, উত্তর ভারতের হারিয়ানার ‘সিঙ্ঘাল’ নামক জায়গাটিই ছিল পদ্মাবতীর বাসস্থান। রূপে গুণে অনন্যা এই সুন্দরীর জন্য যোগ্য পাত্র খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। তাই পদ্মিনী স্বয়ম্বরের মাধ্যমে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তাকে বিয়ে করতে অন্যান্য দেশের রাজাদের ভিড় জমে যায়। তবে পদ্মিনী পছন্দ করেন চিতোরের রাজা রাওয়াল রতন সিংকে। রাজার দ্বিতীয় স্ত্রী হয়ে মেবারের রাজধানী চিতোরে আসেন তিনি।
সিসোড়িয়া বংশীয় রতন সিংয়ের সভায় রাঘব চেতন নামে এক সঙ্গীতকার ছিলেন, যে আবার গোপনে জাদুবিদ্যা চর্চা করতেন। সেসময় রাজ্যে জাদুবিদ্যা চর্চা নিষিদ্ধ ছিল। একদিন জাদুচর্চার সময় হাতে নাতে ধরা পড়লে রাজা তাকে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেন। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে রাঘব চেতন। কিন্তু কীভাবে প্রতিশোধ নেয়া যায়, তা ভাবতে ভাবতে দিল্লির জঙ্গলে পৌঁছে যায় রাঘব। ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে শিকারে আসেন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজী।
এখানে আলাউদ্দিন খিলজির পরিচয় জেনে নেয়া যাক। খিলজি বংশের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে ক্ষমতাধর শাসকের পাশাপাশি একজন সম্পদ ও ক্ষমতালোভী ব্যক্তি ছিলেন আলাউদ্দিন। তার ক্ষমতার কথা অজানা ছিল না রাঘবের। তাই তৎক্ষণাৎ তার মাথায় দুষ্ট বুদ্ধির উদয় হয়।
মোহনীয় বাঁশির সুরে সুলতানকে বিমোহিত করে রাঘব। তার গানের সুর সুলতানের কানে যেতেই ডাক পড়ে তাকে খুঁজে নিয়ে আসার। সুলতানের কাছে এসে গান ও চটুল কথায় সুলতানকে বিভোর করে ফেলে রাঘব। সেই সঙ্গে চিতোরের রানি পদ্মাবতীর রুপের প্রশংসাও করে প্রলোভন দেখায় সুলতানকে। সেই প্রলোভনের জালে জড়িয়ে আলাউদ্দিন খিলজি প্রাসাদে ফিরে তৎক্ষণাৎ চিতোরের দিকে সৈন্য পরিচালনার আদেশ দেন।
কিন্তু চিতোর পৌঁছে হতাশ হন খিলজি। রতন সিংয়ের দুর্গটি ছিল অনেক বেশি সুরক্ষিত। বাধ্য হয়ে তিনি রতন সিংকে খবর পাঠান যে তিনি রানী পদ্মাবতীকে শুধু এক ঝলক দেখতে ইচ্ছুক। তাকে দেখেই তিনি দিল্লি ফিরে যাবেন। তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে, পদ্মাবতীকে তিনি বোনের মতো দেখেন, যদিও খিলজির চরিত্র সম্পর্কে সবাই কমবেশি জানতেন। জানতেন রানি পদ্মাবতীও।
তবে সুলতান তাকে বোনের মতো দেখবেন বলা হলেও একজন রাজপুত নারী হিসেবে আত্মসম্মানে আঘাত লাগে রানি পদ্মিনীর। কারণ তার জন্য এই প্রস্তাব ছিল অসম্মানজনক। তাদের প্রথা অনুযায়ী অচেনা ব্যক্তির সাথে দেখা করা নারীদের জন্য বারণ ছিল। কিন্তু নিশ্চিত যুদ্ধ এড়াতে রতন সিং পদ্মাবতীকে রাজি করান। তবে এখানে রানি শর্ত জুড়ে দেন। আলাউদ্দিনকে আয়নায় রানির প্রতিচ্ছবি দেখতে হবে। মহলের একটি কক্ষে এমনভাবে কিছু আয়না স্থাপন করা হয় যাতে সরাসরি সাক্ষাৎ না করে দূর থেকেই রানি নিজের প্রতিবিম্ব দেখাতে পারেন।
কিন্তু এই উপায়ে রানিকে চাক্ষুস দেখার পর আলাউদ্দিনের অভিপ্রায় আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। যে করেই হোক পদ্মাবতীকে তার পেতেই হবে! কিন্তু মনের কথা মনে লুকিয়ে শিবিরে ফিরে যাচ্ছেন এমন ভাব করে দুর্গ থেকে বের হন সুলতান। ফেরার সময় কিছুদূর পর্যন্ত পথ রতন সিং আলাউদ্দিনকে এগিয়ে দিতে যান। এখানেই ছিল রাজার ভুল। এই সুযোগ নিয়ে আলাউদ্দিন রতন সিংকে তৎক্ষণাৎ অপহরণ করেন। রাজার মুক্তিপণ হিসেবে তিনি দাবি করেন রানি পদ্মাবতীকে।
এদিকে চিতোরের দুই বীর রাজপুত সেনাপতি তখন আলাউদ্দিন খিলজিকে তার নিজের খেলাতেই হারাবার ফন্দি আঁটেন। তারা খবর পাঠান, পরদিন সকালে রানি পদ্মাবতী তার দাসী-বাদিসহ পালকিতে খিলজির শিবিরের দিকে রওনা দেবেন। পরদিন অসংখ্য পালকি খিলজির শিবিরের দিকে রওনা হয়। কিন্তু প্রত্যেকটি পালকিতে ছদ্মবেশে চারজন করে দুর্ধর্ষ রাজপুত যোদ্ধাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল আর প্রত্যেক পালকিতে দাসীর বদলে লুকিয়ে ছিল আরও চারজন করে যোদ্ধা।
এই প্রতিহিংসাপরায়ণ ভয়ানক সৈন্যদলটি খিলজির শিবিরে পৌঁছেই অতর্কিত হামলা করে বসে। আলাউদ্দিন খিলজির শিবিরে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে রাজা রতন সিংকে মুক্ত করা হয়। এই ঘটনায় দ্বিগুণ আক্রোশে আরও বেশি সৈন্য নিয়ে আলাউদ্দিন চিতোরের দুর্গ অবরোধ করেন। অতি সুরক্ষিত সেই দুর্গে প্রবেশ করতে না পারায় অবরোধই ছিল একমাত্র পথ।
দিনের পর দিন অবরুদ্ধ থাকার পর দুর্গের ভেতরে রসদ ফুরিয়ে এলে রাজা রতন সিং সিদ্ধান্ত নেন দুর্গের ফটক খুলে মুখোমুখি হবার। দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ থাকার পর রাজপুতদের জন্য এ যুদ্ধ ছিল অসম যুদ্ধ। পদ্মাবতী ও দুর্গের অন্যান্য নারীরা জানতেন এ যুদ্ধে তাদের পুরুষদের জয়ের সম্ভাবনা কতোটা ক্ষীণ।
এরকম পরিস্থিতিতে সম্মান রক্ষায় রাজপুত নারীদ এর মধ্যে ‘জওহর’ নামক আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহননের এক রকম প্রথার প্রচলন ছিল। বিজয়ী সৈন্যদের হাতে লাঞ্ছিত হবার চেয়ে মৃত্যুকেই তারা বেশি সুখকর মনে করলেন। রাতে দুর্গের ভেতরে এক বিশালাকার অগ্নিকুণ্ড জ্বালানো হয়। নিজেদের সবচেয়ে সুন্দর পোষাকে সজ্জিত হয়ে ধর্মীয় সঙ্গীত গেয়ে আত্মসম্মান রক্ষায় আগুনের আলিঙ্গনে অগ্রসর হলেন নারীরা। সবার আগে আগুনে ঝাঁপ দিলেন রানি পদ্মাবতী, অন্য নারীরা তাকে অনুসরণ করলেন। চিতোরের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম জওহরের ঘটনা।
এদিকে স্বজনহারা সৈনিকদের বেঁচে থাকার আর কোনো উপলক্ষ্য থাকলো না। পরদিন সকালে যুদ্ধের সাজে সেজে খিলজি বাহিনীর সাথে লড়তে বেরিয়ে গেলো রাজপুতদের দল। ফলাফল যা হবার তাই হলো। খিলজির সেনাদল যখন দুর্গে প্রবেশ করল তখন তারা শুধু নারীদের দেহাবশেষের ভস্মই পেলো।
যার মোহে আলাউদ্দিন খিলজি এতো জনবল ক্ষয় করলেন, তাকে তার পাওয়া হলো না সুলতানের। এতো বছর পরেও বিতর্ক ও ধর্মভিত্তিক মেরুকরণে এতোটুকু ভাটা পড়েনি রানি পদ্মাবতীর সাহসিকতার। আত্মসম্মান রক্ষায় বিস্ময়কর আত্মাহুতি দিয়ে মানুষের মনে চিরকালের জন্য জায়গা করে নিয়েছেন রানি পদ্মাবতী।
এই ইতিহাস নিয়েই সিনেমা নির্মাণ করেছেন সঞ্জয় লীলা বানসালি। অভিযোগ উঠেছে তিনি ইতিহাস বিকৃত করে আলাউদ্দিন খিলজির চরিত্রটি নমনীয় করার চেষ্টা করেছেন। এমনকি এও বলা হচ্ছে, সিনেমায় কাল্পনিক দৃশ্যের মাধ্যমে আলাউদ্দিন খিলজি ও পদ্মাবতীর প্রেম দেখানো হয়েছে। সঞ্জয় লীলা বারবার এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। তাও এসব মানতে নারাজ রাজস্থানের রাজপুত কর্ণি সেনা কর্মীরা। পরপর কয়েকবার সেই সিনেমার সেট ক্ষতিগ্রস্ত করেও ছাড় দেয় নি তারা। সিনেমার মুক্তি পর্যন্ত আটকে আছে তাদের হুমকির কারণে।
এবার জানা যাক হুমকিগুলো সম্পর্কে। রাজস্থানে শুটিংয়ের সময় কর্ণি সেনারা সেট ভাঙচুর করে। তাদের হাতে মারও খেয়েছিলেন পরিচালক। পরে চাপের মুখে সেখান থেকে পুরো ইউনিট নিয়ে সরে পড়েন বানসালি। কথা দেন রাজস্থানে আর কোনো শুটিং করবেন না। কিছুদিন বিরতির পর ছবির শুটিং শুরু করেন মহারাষ্ট্রের ঐতিহাসিক নগর কোলাপুরে। সেখানেও ঘটে বিপত্তি। আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয় লক্ষাধিক রুপির সেটে। পুড়ে যায় হাজার হাজার টাকার পোশাক। বাকি শুটিং বানসালি শেষ করেন কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে।
ছবির শুটিং লোকেশন ও সময় সম্পর্কে কোনো কাকপক্ষীকেও টের পেতে দেননি তিনি। অবশেষে ছবির শুটিং শেষ হয়। সময়মত ছবির পোস্টার, ট্রেলার ও গানও মুক্তি পায়। কিন্তু থেকে থাকেনি দুর্বৃত্তদের কর্মকাণ্ড। প্রায় ২০০ কোটি রুপি খরচ করে তৈরি এই সিনেমার ভাগ্য এখন দেশের প্রধান শাসক দলের হাতে।
মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের হুমকির পর বিজেপিশাসিত সব রাজ্যেই ‘পদ্মাবতী’কে নিষিদ্ধ করা হয়। শিবরাজ সিং চৌহান ঘোষণা করেন, তার রাজ্যে সিনেমাটা দেখানোর প্রশ্নই ওঠে না। এর আগে রাজস্থানের জয়পুরের রাজ মন্দিরের সামনে রাজপুতের কর্ণি সেনা সদস্যরা ছবির পোস্টার পোড়ায়। কর্ণি সেনারা পরিচালক
ও অভিনেত্রীর শিরোচ্ছেদের ঘোষণাও দেন। এরই মধ্যে সিনেমার নায়িকা দীপিকা পাড়ুকোনকে জীবন্ত দগ্ধ করতে পারলে ১ কোটি রুপি দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেয় অখিল ভারতীয় ক্ষত্রিয় মহাসভা।
এই সংগঠনের পক্ষ থেকে এর আগেও দীপিকা ও পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালিকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সেবার বলা হয়েছিল, দুজনের শিরশ্ছেদ করতে পারলে ৫ কোটি রুপি পুরস্কার দেওয়া হবে। এ বিষয়ে অখিল ভারতীয় ক্ষত্রিয় মহাসভার অধ্যক্ষ ভুবনেশ্বর সিং বলেছেন, নিজের মান মর্যাদা রক্ষা করতে চিতোরগড়ের জহরে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন রানি পদ্মাবতী। দীপিকাকে তা উপলব্ধি করানো দরকার। তবেই সে প্রকৃত পদ্মাবতীকে জানতে পারবে।
এসব ছাড়াও দীপিকা ও পরিচালক সঞ্জয় লীলার কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে একাধিক সংগঠন। ‘পদ্মাবতী’ মুক্তি পেলে রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে, কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রককে জানিয়েছে উত্তর প্রদেশ সরকার।
এরমধ্যেই আবার নতুন দাবি সামনে আনে রাজপুত কর্ণি সেনা। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ছবিটি আগে মেবার রাজপরিবারকে দেখানো হোক। তারা ছবি দেখে আপত্তির কিছু না পেলে, বিক্ষোভ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। শুধু দীপিকা বা বানসালির উদ্দেশ্যে হুমকি দিয়েই থেমে থাকেননি হারিয়ানার এক বিজেপি নেতা।
একইসঙ্গে ছবিতে আলাউদ্দিন খিলজির ভূমিকায় অভিনয় করা রণবীর সিংয়ের পা ভেঙে দেওয়ারও হুমকি দেন তিনি। পাশাপাশি সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ‘পদ্মাবতী’র মুক্তি আটকানোর জন্য হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদীকেও।
ছবি মুক্তি আটকাতে দরকারে দল ছেড়ে দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন সূরজ পাল আমু। তবে কর্ণাটকের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার দীপিকা পাড়ুকোনের নিরাপত্তা দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। দীপিকা নিজেও নিজের নিরাপত্তা নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। সিনেমা মুক্তির আগমুহূর্ত পর্যন্ত তাকে বিশেষ নিরাপত্তায় রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে নির্মাতা পক্ষ থেকে।
শুধু বিতর্ক ও হুমকি নিয়ে অনেক সংবাদ প্রকাশিত হলেও জানিয়ে রাখা ভালো, ছবিটির শুটিংয়েরও মজার কিছু গল্প রয়েছে। শোনা যায়, সিনেমার শুটিং শেষ করেই নাকি এ ছবির অন্যতম অভিনেতা রণবীর সিং মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে ছুটেছেন। কেন জানেন?
সবাই জানে, রণবীর সিং যখন কোন চরিত্রে অভিনয় করেন, তখন ওই চরিত্রের মধ্যে আপাদমস্তক ঢুকে যান। আলাউদ্দিন খিলজি চরিত্রের বেলাও তাই করেছেন রণবীর। ট্রেলারে দেখা গেছে তার কয়েক ঝলক। একে তো আলাউদ্দিন খিলজি লোকটি মোটেই ভালো মানুষ ছিলেন না। সেই মানুষটিকে পারফেক্ট করে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা বেশ কঠিন কাজ।
রণবীর সেটা করেছেন ঠিকই, এমনভাবেই করেছেন যে শুটিং সেটে তাকে দেখলে সবাই ভয়ই নাকি পেতেন। ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে চরিত্রের মধ্যে ঢুকে গিয়ে সেই চরিত্র থেকে বের হতে বেগ পেতে হয়েছে রণবীরকে। সেই চরিত্রের ‘ডার্ক সাইড’ থেকে বেরোনোর জন্যই মনোরোগ বিশেষজ্ঞেরই শরণাপন্ন হন অভিনেতা।
শুধু তাই নয়, নিখুঁতভাবে পর্দায় চরিত্রটি দেখানোর জন্য নাকি পদ্মাবতীর সেটে তিনি ২৪ টা চড়ও খেয়েছেন! জানা যায়, রাজা মুরাদ যিনি জালালুদ্দিন খিলজি চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তার সাথেই আলাউদ্দিন রূপী রণবীরের একটা দৃশ্য ছিল। তা সেটাই পারফেক্ট মনে হচ্ছিল না। আর তাই সেটা যতক্ষণ না পারফেক্ট হয়, ততক্ষণ ধরেই রণবীর রাজা মুরাদের হাতে চড় খেতে লাগলেন! টানা চব্বিশটা চড় খাওয়ার পর ‘ওকে’ হলো দৃশ্যটি!
এছাড়া শোনা গিয়েছে, সিনেমার শুটিংয়ের সময় অভিনেতারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেননি। এতে অভিনয়ের ব্যাঘাত ঘটে। সঞ্জয় লীলার কড়া হুকুম ছিল সেটে যেন কেউই মোবাইল নিয়ে না ঢোকেন। কারণ সিনেমার শুটিং সেটের ছবি নাকি আগে-ভাগেই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। অন্য সবার মতো শহীদ কাপুরও সেটে ফোন ব্যবহার করেননি।
এই ছবির শুটিংয়ের সময় তিনি নাকি নিজের ম্যানেজারকেও ফোন দেননি। ফোন জমা রাখতেন সিকিউরিটি গার্ডের কাছে। সেটে যেহেতু ফোন নিয়ে ঢোকা তো বারণ, তাই অবসর সময়ে সঞ্জয় লীলা, শহীদ কাপুর, রণবীর সিং, দীপিকা পাড়ুকোন মিলে বসে নাকি জমিয়ে আড্ডা দিতেন। আর সেই আড্ডার বিষয়বস্তু এখনকার দিনের কোনো খোশ গল্প নয়, বরং গল্প হতো সেই সময়কার, মানে পদ্মাবতীর সময়কার সংস্কৃতি, রাজনীতি সেইসব নিয়ে।
এতো ঘটনা নিয়ে যে সিনেমা নির্মাণ, যাকে নিয়ে এতো বিতর্ক- অথচ ত্রয়োদশ শতকের ইতিহাসে পদ্মিনী বা পদ্মাবতীর কোনো উল্লেখই নাকি নেই। ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইতিহাস আলাউদ্দিন খিলজির অস্তিত্ব স্বীকার করে, চিতোরের রাজা রতন সিংয়েরও অস্তিত্ব রয়েছে। দুজনের মধ্যে যুদ্ধে রতন সিংয়ের পরাজয় ঘটেছিল, সেটাও ইতিহাস। কিন্তু রানি পদ্মিনীর কোনো অস্তিত্ব কোনো ইতিহাসে নেই।
তার কথায়, আলাউদ্দিন খিলজির রাজসভার কবি ছিলেন আমির খসরু। চিতোর আক্রমণের সাক্ষীও তিনি। অথচ তার কোনো লেখাতেও পদ্মিনীর কোনো উল্লেখ নেই! তাহলে এতো এতো বিতর্ক ঘটিয়ে কী লাভ হলো? আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালিও কেন ছবিটি নির্মাণ করলেন, তা রহস্যই থেকে যাবে, যতদিন পর্যন্ত না ছবিটি মুক্তি পায়। ইতিহাস বলুন কিংবা সাধারণ সিনেমার কাহিনি- তা জানার জন্য বিতর্কের অবসানের অপেক্ষা করতেই হবে দর্শকদের।
আদ্যোপান্ত ইতিহাস বিতর্কিত ‘পদ্মাবতী’র 2017-11-27