ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় জটিল হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা সংকট
Posted by: News Desk
November 24, 2017
এমএনএ ডেস্ক রিপোর্ট : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর নিধনযজ্ঞ শুরুর পর বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বড় শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এ সংকটকে আরো জটিল করে তুলেছে। মিয়ানমারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব আছে চীনের। জাতিসংঘসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানোর অভিযোগ এনেছে। ফ্রান্স সরাসরি একে গণহত্যা বলেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও গত তিন মাসে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগস্ট নতুন করে নিধনযজ্ঞ শুরুর পর বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের তিন মাস পূর্ণ হলো আজ। ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের গতকাল বৃহস্পতিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে রাখাইন থেকে প্রায় ছয় লাখ ২৩ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
এর আগে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা যোগ করলে তা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নৃগোষ্ঠীর বড় অংশই বাংলাদেশে চলে এসেছে। মাত্র তিন মাসে সোয়া ছয় লাখ রোহিঙ্গার দেশত্যাগকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতির ঘটনা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে এ সংকট শুধু তিন মাসের নয়, কয়েক শ বছরের পুরনো।
তারা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেয়নি। এমনকি রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন, অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে দেশছাড়া করার দায়ে পশ্চিমা দেশগুলো যখন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক কাটছাঁট বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে তখন চীন মিয়ানমারের সেনাপ্রধানকে বেইজিংয়ে ডেকে নিয়ে সম্পর্ক আরো জোরালো করার কথা বলেছে। দৃশ্যত যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো যখন মিয়ানমারের বেসামরিক সরকারের ওপর সেনাবাহিনীর প্রভাব কমিয়ে গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করছে তখন চীন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক আরো পাকাপোক্ত করছে।
সবাই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চাইলেও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও বিদেশিদের সম্পৃক্ততা প্রশ্নে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে অবস্থানগত বেশ পার্থক্য লক্ষ করা গেছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগগুলো তদন্তে মিয়ানমারে ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন’ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেও ওই দলকে দেশে ঢুকতে দিতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির সরকার।
চীন ও রাশিয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেয়নি। আবার সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চীন ও রাশিয়া ভোট দিয়েছে। এর পরও তা ১৩৫-১০ ভোটে গৃহীত হয়েছে। আগামী মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্লেনারিতে ওই প্রস্তাব উপস্থাপিত হবে। ওই প্রস্তাবে মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের একজন বিশেষ দূত নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রস্তাবটিতে রাখাইনে অনতিবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, সবার মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা ও বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করার জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এতে গত আগস্ট থেকে রাখাইনে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা ও বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়। সাধারণ পরিষদের প্লেনারিতে প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার পর জাতিসংঘ মহাসচিব একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকে এই পদে নিয়োগ দেবেন।
চীন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধা দিলেও ওই দেশটিসহ সবার সমর্থনেই গত ৭ নভেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার পরিস্থিতিতে প্রেসিডেনশিয়াল বিবৃতি গৃহীত হয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে এখন জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যতটা সোচ্চার অতীতে কখনো এমনটি ছিল না। এবারের সংকটের ভয়াবহতা তাদের এ অবস্থান নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ে সরব আছেন এবং নিরাপত্তা পরিষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নজিরবিহীন চিঠি লিখেছেন।
বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জোর দিয়ে বলে আসছে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও সমাধান দুটিই মিয়ানমারে। বাংলাদেশ মূলত কাজ করছে রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রত্যাবাসনেই এ সংকট সমাধান হবে না। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সমাজের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করাসহ তাদের সুরক্ষা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব ওই দেশটির। মিয়ানমার তা না পারলে আবারও সংকট দেখা দিতে পারে। ফলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।
ঢাকায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক গণমাধ্যমকে বলেন, চীন, ভারতসহ পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলো এ সংকট নিরসনের রূপরেখা হিসেবে কাজ করতে পারে। অতীতে কখনোই এমন কোনো রূপরেখা ছিল না।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমের বা আন্তর্জাতিক চাপে পড়েই হোক অং সান সু চি নিজেই রাখাইনে পরিস্থিতির উন্নয়নে আনান কমিশন গঠন করেছিলেন। সেই কমিশন চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের বিষয়েও সু চির সরকার প্রকাশ্যে অঙ্গীকার করেছেন।
ওই কূটনীতিক বলেন, কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরদিনই জঙ্গি হামলা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নজিরবিহীন অভিযান নিয়েই নানা প্রশ্ন আছে। নিশ্চয়ই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও জনগণের একটি অংশ রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের রাখতে চায় না। সেনাপ্রধানের বক্তব্য থেকেও তা স্পষ্ট।
ওই কূটনীতিক আরো বলেন, রাখাইন রাজ্য চীনের ‘এক বলয় এক পথ’ এবং ‘বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর’ (বিসিআইএম ইসি) পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাখাইন রাজ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনের বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা আছে। এখন চীনও বুঝতে পারছে যে অস্থিতিশীলতা থাকলে তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে। ভারতও চাচ্ছে রাখাইন রাজ্যের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে। আবার পশ্চিমা দেশগুলোও মিয়ানমারে চীনের প্রভাব কমিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়াতে চায়।
ওই কূটনীতিকের মতে, রাখাইন ঘিরে বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতা এ সংকটে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। বড় শক্তিগুলো যদি রাখাইনে রোহিঙ্গাসহ অন্য নৃগোষ্ঠীগুলোর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, নাগরিকত্ব ও সমঅধিকার নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে তবেই পুরো অঞ্চলের জন্য মঙ্গল।
হয়ে রোহিঙ্গা প্রতিযোগিতায় উঠছে ভূরাজনৈতিক জটিল সংকট 2017-11-24