এমএনএ শিল্প ও বাণিজ্য ডেস্ক : প্রায় তিন বছরের বেশি সময় মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রম বাজার বন্ধ থাকার পর তা রোববার খুলেছে। দুই দেশের মধ্যে এ নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক চুক্তিও (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে।তবে প্রবাসী মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এবারের প্রত্যাবাসন ব্যয় কত হবে এবং কতজন এজেন্সি কর্মী পাঠাতে পারবে তা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে বিষয় দুটি ধোঁয়াশা তৈরি করেছে।
দীর্ঘদিন পর শ্রমবাজার খোলার খবরে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে, দেশটিতে কর্মী পাঠাতে আগের ১০ এজেন্সিই কি এবারও এই তালিকায় থাকবে নাকি নতুনরা সুযোগ পাবে। এবার কি সিন্ডিকেট ভেঙে বাজার সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে। পাশাপাশি এ প্রশ্নও উঠেছে, বাংলাদেশ সরকার কি আগের সিন্ডিকেট ভেঙে বাজার উন্মুক্ত করতে পারবে?
অন্যদিকে জনশক্তি প্রেরণকারী সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মালয়েশিয়া কর্মী নিতে ২০১৬ সালে অনলাইন পদ্ধতি চালু করে। যদিও ১৪টি দেশের মধ্যে শুধু বাংলাদেশ ছাড়া বাকি ১৩ দেশ এই পদ্ধতি প্রত্যাখ্যান করেছে। গতবার ৯৪৩টি এজেন্সি তালিকায় ছিল। সেবার প্রত্যাবাসন ব্যয় ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। যদিও পরে তারও বেশি নেওয়া হয়েছে। এবার গতবারের সিন্ডিকেট ভাঙতে ১ হাজার ৪০ এজেন্সির নাম পাঠানো হয়েছে দেশটিতে। তার মধ্য থেকে এজেন্সি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হলে আবারও সিন্ডিকেট হবে বলে মনে করছেন তারা।তারা আশঙ্কা করছেন, এবার দেশটিতে কর্মী পাঠাতে বাংলাদেশের ২৫ থেকে ৩০টি এজেন্সি কাজ পেতে পারে। যদিও কারা কারা কর্মী পাঠাবে সে বিষয়টি এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে তাদের উদ্বেগের বিষয় হলো সিন্ডিকেট।
তারা বলছেন, এবারের চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা হয়নি সব এজেন্সি কর্মী পাঠাতে পারবে কি পারবে না। এ ছাড়া যেসব শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে তার ফলে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে দেশটির কোম্পানিগুলো অনীহা প্রকাশ করতে পারে।
আবার অনেকে বলছেন, এবার সিন্ডিকেট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ আগের ১০ এজেন্সির মধ্যে ছয়টিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আর চারটি নতুন নামে কাজ করার চেষ্টা করবে।
প্রবাসী মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রোববার সকালে দেশটির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক চুক্তিতে সই করতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদ সেখানে পৌঁছান। এ সময় দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি এম সারাভানান ও তার মধ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. গোলাম সারোয়ার, শ্রম কাউন্সিলর মো. জহিরুল ইসলাম, শ্রম কাউন্সিলর (দ্বিতীয়) মো. হেদায়েতুল ইসলাম মণ্ডলসহ দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।চুক্তির পর সেই অনুষ্ঠানে প্রবাসী মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেছেন, এবার সিন্ডিকেট যাতে না হয়, আমরা সেদিকে সতর্ক থাকব। আমাদের সরকারি তথ্য ভান্ডারের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মীরা কাজ করতে যাবেন।
অন্যদিকে দেশটির মানব সম্পদ মন্ত্রী বলেছেন, এই চুক্তি পাঁচ বছরের জন্য। এটি এখন থেকে জিটুজি নয়, মালয়েশিয়ার এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে লোক আনা হবে।প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, এবার দেশটির সঙ্গে পাঁচ বছর মেয়াদে চুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ১২ লাখ কর্মী নেবেন তারা। গত বছরে ১০ লাখ লোক নেওয়ার কথা ছিল। শেষ অবধি ৭ লাখ ২১ হাজার কর্মী নিয়েছিল।এর আগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে কর্মী পাঠাতে ৪ লাখ টাকার অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও এজেন্সি নিয়োগে অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া সরকার। দীর্ঘ তিন বছর বন্ধ থাকার পর গত ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে অনুমোদন দেয় মালয়েশিয়া। সব সেক্টরে কর্মী নেওয়ার অনুমোদন দেয় দেশটির মন্ত্রিপরিষদ।
আগের চেয়ে এবারের সমঝোতা স্মারকে বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। তার মধ্যে জিটুজি প্লাস পদ্ধতি উল্লেখ থাকছে না, যুক্ত হচ্ছে মালয়েশিয়ার রিক্রুটিং এজেন্সি, থাকছে কর্মীদের বাধ্যতামূলক বীমা ব্যবস্থা, কর্মীদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা ও খরচ বহন করবে নিয়োগদাতা, চুক্তির মেয়াদ পর্যন্ত কর্মীর দায়িত্ব নিতে হবে মালয়েশিয়ার রিক্রুটিং এজেন্সিকেও, বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ থেকে ৪৫ বছর পর্যন্ত। এসব শর্ত মেনে কর্মী পাঠানোর চুক্তি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, মালয়েশিয়ান কোম্পানিকে বাংলাদেশ থেকে কর্মী দেবেন কারা? আর যারা কর্মী পাঠানোর কাজ করবেন তারা কি আগের ১০ সিন্ডিকেটের কেউ হবে নাকি নতুন কেউ যুক্ত হবে এ তালিকায়। আরও জানা গেছে, এবার বিশেষ করে গৃহকর্মী, বাগান, কৃষি, উৎপাদন, পরিষেবা, খনি ও খনন এবং নির্মাণ খাতে বাংলাদেশি কর্মী নেবে দেশটি। এখন চুক্তি সই সম্পন্ন হওয়ায় এসব খাতে বাংলাদেশি কর্মীরা দেশটিতে যেতে পারবে।
বায়রার সাবেক নেতা আলী চৌধুরী নোমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমরা এখনও পূর্ণাঙ্গ চুক্তি স্মারকটি দেখতে পাইনি। তবে আমরা চাইব, বাজার সবার জন্য উন্মুক্ত হোক। সবাই যাতে কর্মী পাঠাতে পারেন। আর এ বিষয়টি পুরোপুরি সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। আবারও সিন্ডিকেট হলে বাজার বন্ধ হয়ে যাবে। তখন সেটির প্রভাব অর্থনীতির ওপর পড়বে। দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন তিনি। তাই বাংলাদেশ সরকারকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে কী প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানো হবে।বায়রার সাবেক আরেক নেতা টিপু সুলতান সময়ের আলোকে বলেন, চুক্তি হয়েছে এটা ইতিবাচক বিষয়। এখনও আমরা চুক্তিতে কী আছে তা জানতে পারিনি।
বিভিন্ন এজেন্সির মালিকরা আরও বলছেন, মালয়েশিয়া সরকার যদি তাদের মনঃপুত এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয় তবে সেটা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। এবারও সেই সিন্ডিকেট হবে কি না তা এখনও বলা যাচ্ছে না। আর সিন্ডিকেট হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির মুখ আবারও থুবড়ে পড়বে। এজেন্সিগুলো পিঠ বাঁচাতে চার লাখের বেশি টাকা আদায় করবে। এই সিন্ডিকেট হলে এবার দেশটির বড় বড় কোম্পানি যখন লোক নেবে না, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদিও বাধ্য হয়ে এজেন্সিগুলো পুরনো কর্মী পাঠাবে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসান সময়ের আলোকে বলেন, তিন বছর পর আমাদের জন্য শ্রমবাজার খুলেছে, এটি অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। সব দিক থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের জন্য পছন্দের বাজার। তবে অতীতে যেসব অনিয়ম হয়েছে সেগুলোর যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকটি খেয়াল রাখতে হবে। বিগত বছরগুলোর মতো যাতে এবারের চুক্তিও প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।
তিনি আরও বলেন, এবার সিন্ডিকেট হবে না, এমনটাই প্রত্যাশা করছি। আর সিন্ডিকেট অবশ্যই ভাঙা সম্ভব, যদি দুই দেশের সরকার চায়। দুই দেশের স্বার্থেই সেটি করতে হবে। আর এই সিন্ডিকেট প্রতিহত করতে প্রথমে মালয়েশিয়াকেই বেশি উদ্যোগী হতে হবে। সিন্ডিকেট হলে কর্মী পাঠাতে খরচ বাড়ে। তাই এ বাজার সবার জন্য উন্মুক্ত হবে এবং যারা যোগ্য তাদের কাজ দিতে হবে। তবে এখন প্রশ্ন আছে, তারা কর্মী কীভাবে নেবেন এবং অনলাইন প্রক্রিয়াটি কেমন হবে। মোট কথা, দিনশেষে আমাদের কর্মীদের মুখে যাতে হাসি থাকে।
বিএমইটি সূত্র বলছে, ১৯৭৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ২০টি দেশে প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ ৩ হাজার কর্মী পাঠানো হয়েছে। তার মধ্যে শুধুমাত্র মালয়েশিয়ায় গেছে সাড়ে ১০ লাখেরও ওপরে। দেশটিতে ২০০৭, ২০০৮, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে বেশি সংখ্যক কর্মী প্রেরণ করা হয়েছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

