এমএনএ খেলাধুলা ডেস্কঃ সবার চোখ মেসির দিকে। মেসি খেলবে, মেসি সেরা খেলা দেখাবে, মেসি গোল দেবে। আর ধারাবাহিকভাবে সেরা খেলা উপহার দিলেই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন হবে পূরণ; হবেন সেরা খেলোয়াড়, জিতবেন গোল্ডেন বুট। অন্যদিকে, লুকা মদ্রিচও কম যায় না। নিজের সেরাটা দিয়েই যাচ্ছেন, এবার সর্বোচ্চটা দিতে প্রস্তুত। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে আবারও যেন ফাইনাল খেলতে হবে সেটাই টার্গেট।
আজ প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে বর্তমান রানারআপ ক্রোয়েশিয়া বনাম ২০১৪ সালের ফাইনালিস্ট আর্জেন্টিনা। ম্যাচটি লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় শুরু হবে। কাতার বিশ্বকাপে কাছে সৌদি-আরবের কাছে অঘটনের শিকার হওয়ার পর নিজেদের চেনা রূপে ফিরেছে মেসির আর্জেন্টিনা। দুটি দলই দারুণ চাপ সামলে কোয়ার্টার ফাইনালে গণ্ডি পার করেছে। জ্বাটকো ডালিচের ক্রোয়েশিয়া স্পট কিকে ব্রাজিলকে ও লা আলবিসেলেস্তারা ১২ গজ থেকে অর্থাৎ পেনাল্টি শুটে নেদারল্যান্ডসকে পরাস্ত করে সেমিফাইনালের টিকিট পায়।
প্রায় শেষের দিকে এসে পড়েছে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত ফুটবল বিশ্বকাপ। ৬৪ ম্যাচের আর মাত্র চারটা বাকি। ৩২ থেকে নেমে ছোট হয়ে এসেছে চারে। বাকি আছে শুধু দুইটি সেমিফাইনাল, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ও ফাইনাল। এবারের কাতার বিশ্বকাপে গ্রæপ পর্বে শক্তি-সামর্থ্যে পিছিয়ে থাকা দলগুলো অভাবনীয় কিছু চমক দেখিয়েছে। এছাড়া পুরো আসর ধরেই চমকের পর চমক দিয়ে সেমিফাইনালে উঠে এসেছে মরক্কো। এছাড়া বিশ্বকাপের হট ফেভারিট ব্রাজিল বিদায় নিয়েছে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে। এরপর আর্জেন্টিনা নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে টাইব্রেকারে শেষ হাসি হেসেছে।
কোয়ার্টার ফাইনালের শেষ লড়াইয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্সকে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখেই ফেলেছে ইংল্যান্ড, তবে হ্যারি কেইনের পেনাল্টি মিসের খেসারত দিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে জয়টা আর পাওয়া হয়নি গ্যারেথ সাউথগেটের দলের। এতে শেষ চারে টিকে রইল ইউরোপের দুইটি দেশ ফ্রান্স এবং ক্রোয়েশিয়া। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আছে কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইতিহাস গড়ে আফ্রিকার প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছে মরক্কো। আজ রাত ১টায় প্রথম সেমিফাইনালে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা-ক্রোয়েশিয়া এবং আগামীকাল দ্বিতীয় সেমিফাইনালে রাত ১টায় মুখোমুখি হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স-মরক্কো।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে বিশৃঙ্খল মেজাজের ম্যাচ হিসেবে যদি একটি ম্যাচকে বেছে নিতে বলা হয় তবে তা নিঃসন্দেহে আর্জেন্টিনার বনাম নেদারল্যান্ডসের মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটিই হবে। নাহুয়েল মোলিনা ও সাতবারের ব্যালন ডি’অর লিওনেল মেসির গোলে আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে পথে এক পা দিয়েই রেখেছিল। কিন্তু ১০০ মিনিটে ওট ওয়েগহর্স্টের গোলে শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ২-২ গোলে শেষ হয়।
অতিরিক্ত সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় পেনাল্টি শুট আউটে ম্যাচে ভাগ্য নির্ধারিত হয়। আরও একবার দুই দলের সামনে ভাগ্য নির্ধারণের জন্য পেনাল্টির প্রয়োজন হয়। পুরো ম্যাচে ১৭টি হলুদ কার্ডে ইতোমধ্যেই স্প্যানিশ রেফারি এন্টোনিও মাতেও লাহোজকে নিয়ে বিশ্বব্যপী সমালোচনা শুরু হয়েছে। তারপরও পেনাল্টিতে আর্জেন্টিনা তাদের মানসিকতায় দৃঢ় থেকে জয় ছিনিয়ে নেয়।
বিশ্ব ফুটবল হয়তো মেসির দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু ফুটবল বিশ্বের আরেক জাদুকর আছে। না, এই শব্দটা ঠিক ফুটবলার লুকা মদ্রিচকে ফুটিয়ে তুলতে পারে না। তিনি যা, তা পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে একটা শব্দই শিল্পী। শিল্পীর কাজ তৈরি করা। ফুটবলের মাঠে লুকা মদ্রিচ সেই কাজটাই করেন। মাঝমাঠের কারিগর হিসেবে তিনি দলের খেলাটা তৈরি করেন। নিজের এই কাজে তিনি কতটা দক্ষ, কতটা সার্থক-তা ফুটবল দুনিয়া জানে। বিশ্বসেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে নিজের এই শৈল্পিক দক্ষতাটা দেখিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘ এক দশক ধরে। যদি ক্রোয়েশিয়া জাতীয় দলের প্রসঙ্গটি আসে, সেক্ষেত্রে মদ্রিচ শুধুই একজন শিল্পী নন। জাতীয় দলের জার্সিতে শিল্পীর পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ সেনাপতি। আজ দেখা যাক লুকা মদ্রিচ কতটা সহজ হয়।
বিশ্বকাপে সম্ভবত সবচেয়ে আর্কষণীয় ম্যাচ হতে পারতো অল-সাউথ আমেরিকান সেমিফাইনালে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ। কিন্তু ক্রোয়েশিয়া তা হতে দেয়নি, নেদারল্যান্ডসের কাছেও আর্জেন্টিনা কোনোমতো বেঁচে গেছে। কিন্তু সেমিফাইনালের রেকর্ড বলে দিচ্ছে এবারও হয়তো আর্জেন্টিনার ক্রোয়েশিয়ার বাঁধা টপকে ফাইনাল নিশ্চিত করবে। এ পর্যন্ত শেষ চারে বিশ্বকাপ থেকে কখনই বিদায় নেয়নি আর্জেন্টিনা। এর আগে পঞ্চমবার তারা শেষ চারের বাঁধা পেরিয়ে ফাইনালে খেলেছে, যার মধ্যে দুবার সফল হয়ে শিরোপা হাতে নিয়েছে। ২০১৪ সালের ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজিত হয়ে তাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়।
আর্জেন্টাইনরা আগে সব আসরেই শেষ চারে অন্তত দুটি করে গোল দিয়েছে। সব মিলিয়ে এই গোলের সংখ্যা ১৪টি। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি যে অন্য ধরনের এক চ্যালেঞ্জ নিয়ে সামনে আসছে তা মেসি ও তার দল ভালোই উপলব্ধি করতে পারছে। ক্রোয়েশিয়ার জেদি রক্ষণভাগকে কোনোভাবেই ফাঁকি দিতে পারেনি ব্রাজিলের আক্রমণভাগ। একইসঙ্গে গোলরক্ষক ডোমিনিক লিভাকোভিচকেও পরাস্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ঘরের পথে পা রাখতে হয়েছে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিটদের। ডায়নামো জাগ্রেবের নাম্বার ওয়ান গোলরক্ষক বিশ্বকাপ শেষে ফিরে যাবার পর শীর্ষ কোনো ক্লাব নিশ্চিতভাবেই তাকে দলে নিতে আগ্রহী হবে। ১০৬ মিনিটে নেইমার যখন শেষ পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনালে দুর্দান্ত গোলে ডেডলক ভেঙ্গেছিল তখনো মনে হয়নি এটাই ব্রাজিলের এবারের আসরের শেষ ম্যাচ।
ব্রুনো পেটকোভিচ ১১৭ মিনিটে গোল শোধ করে পুরো স্টেডিয়ামকেই কার্যত স্তব্ধ করে দেয়। এরপর ১২ গজের চাপ আর নিতে পারেনি সেলেসাওরা। রডরিগোর শট রুখে দিয়ে শুরুতেই লিভাকোভিচ ব্রাজিলের স্বপ্ন ভঙ্গ করে। এরপর মারকুইনহোসের শট পোস্টে লেগে ফেরত এলে আর কিছুই করার ছিল না। নেইমার তার শেষ শটটিও নিতে পারেননি। তার আগেই টুর্নামেন্ট ফেবারিটদের বিদায় নিশ্চিত হয়। একইসঙ্গে টানা দ্বিতীয়বারের মত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের টিকিট পায় ক্রোয়েশিয়া।
চার বছর আগে রাশিয়া বিশ্বকাপে নক আউট পর্বে নির্ধারিত সময়ে কোনো ম্যাচেই জিততে পারেনি। শেষ ষোলো ও কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের পেনাল্টির মাধ্যমে ভাগ্যের সহায়তা নিয়েই পরের ম্যাচে যেতে হয়েছে। এরপর সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের সঙ্গে অতিরিক্ত সময়ের গোলে জয়ী হয়ে ফাইনালে গিয়েছিল ডালিচের দল। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এবারের আসরে হয়ে গেছে। এখন সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের আগে ক্রোয়েশিয়া ১১ ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে। আর সেমিফাইনালে জিততে পারলে ক্রোয়েশিয়া পৌঁছে যাবে শীর্ষ তিন দলের সঙ্গে একই কাতারে। এর আগে পরপর দুটি ফাইনালে ওঠার কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি। আরও একটি পরিসংখ্যান থেকে ডালিচের দল আত্মবিশ্বাস নিতেই পারে। বিশ্বকাপের ১০টি নক আউট ম্যাচে এ পর্যন্ত কোনোটিতেই তারা গোল করতে ব্যর্থ হয়নি।
এর আগে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দুইবার আর্জেন্টিনা ও ক্রোয়েশিয়া মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৯৮ সালে লা আলবিসেলেস্তারা ১-০ গোলে জয়ী হয়েছিল। চার বছর আগে ক্রোয়েটরা ৩-০ গোলে ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নেয়। দুর্দান্ত ওই জয়ী দলটির বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ই লুসাইলে খেলতে যাচ্ছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে হলুদ কার্ড পাওয়ায় টানা দুই কার্ডে আর্জেন্টাইন দুই ফুল-ব্যাক গঞ্জালো মনটিয়েল ও মার্কোস অ্যাকুনা খেলতে পারবে না, যা লিওনেল স্কালোনিকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। রাইট-ব্যাক পজিশনে মনটিয়েলের জায়গা নাহুয়েল মোলিনা ও অ্যাকুনার পজিশনে নিকোলাস টাগলিয়াফিকোর খেলার সম্ভাবনাই বেশি। তবে একটি জায়গা স্কালোনি স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছেন, কোয়ার্টার ফাইনালে ১২০ মিনিটের ম্যাচে নতুন করে কোনো খেলোয়াড় ইনজুরিতে পড়েননি। গোড়ালির ইনজুরি কাটিয়ে দলে ফিরেছেন আলেহান্দ্রো গোমেজ। রডরিগো ডি পল ও অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া সেমিফাইনালের আগে পরিপূর্ণ ফিটনেস ফিরে পাবার আশা করছেন।
নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে স্কালোনি রক্ষণভাগে পাঁচজনকে রেখেছিলেন। কিন্তু ডি মারিয়া সুস্থ হয়ে দলে ফিরলে চারজন ডিফেন্ডার নিয়েই মাঠে নামবেন স্কালোনি। কোয়ার্টার ফাইনালের পর ক্রোয়েশিয়াও পরিপূর্ণ ফিট দল হাতে পাচ্ছে। অসুস্থতা কাটিয়ে বোর্না সোসা ও মিসলাভ ওরসিচ দলে ফিরছেন। গোল করার ক্ষেত্রে খুব একটা স্বস্তিতে না থাকা দলে ডালিচ ব্রাজিলের সঙ্গে প্রথম থেকেই খেলিয়েছিলেন মারিও পাসালিচকে। আজও রাইট উইংয়ে তিনি তার পজিশন ধরে রাখবেন বলেই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পেটকোভিচের নাটকীয় গোলের পর আন্দ্রেজ ক্রামারিজের মূল দলে ফেরাটা একটু কঠিন। কাতার বিশ্বকাপে ৩২ দলটি অংশগ্রহণ করে তার মধ্যে আর মাত্র ৪ দল লড়াইয়ে টিকে আছে। এর মধ্যে ফেভারিট অনেক দলই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, পর্তুগাল, জামানি, ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, স্পেনের মধ্যে হট ফেভারিট দল। এখন দেখার বিষয় শেষ কোনো দল বিশ্বকাপ জয় করতে পারে।
আর্জেন্টিনা-ক্রোয়েশিয়া সেমিফাইনাল ম্যাচের রেফারি: কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে রেফারিকে হয়েছে বেশ আলোচনা ও সমালোচনা। পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডস আঙ্গুল তুলেছে রেফারি বাড়তি সুবিধা দিয়েছে আর্জেন্টিনাকে। এছাড়া আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডসের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের রেফারি অ্যান্তনিও মাতেউ লাহোজ ১৯ বার কার্ড দেখিয়ে ছিলেন আলোচনার শীর্ষে। আর তাই এখন সবার চোখ আর্জেন্টিনা ও ক্রোয়েশিয়া প্রথম সেমিফাইনালের রেফারি কে হবেন তার দিকে।
আজ বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা ও ক্রোয়েশিয়া। এই ম্যাচে মূল রেফারির দায়িত্ব পালন করবেন ইতালির ড্যানিয়েল ওরসাতো। এছাড়া তার সহকারী হিসেবে থাকবেন আরেক ইতালিয়ান সিরো কারবোন। আর দ্বিতীয় সহকারী হিসেবে থাবেন আলেসান্দ্রো জিয়াল্লাতিনি ও ভিএআরের দায়িত্বে থাকবেন ম্যাসিমিলিয়ানো ইরাতি। চলমান কাতার বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন ড্যানিয়েল ওরসাতো। কাতার ও ইকুয়েডরের ম্যাচ দিয়ে পর্দা ওঠে এবারের বিশ্বকাপের। সে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ওরসাতো। এছাড়াও গ্রæপ পর্বের মেক্সিকো ও আর্জেন্টাইনদের ম্যাচে রেফারির দায়িত্ব পালন করেন এই ইতালিয়ান।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

