যুক্তরাষ্ট্রে তুষারঝড়ে মৃত ১৭, নিউইয়র্কে জরুরি অবস্থা
Posted by: News Desk
January 5, 2018
এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : তুষারঝড়ে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলীয় রাজ্যগুলোর জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে; মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে অন্তত ১৭ জনের। বাতিল করা হয়েছে নিউইয়র্ক এবং নিউজার্সিসহ বিভিন্ন রাজ্যের চার হাজারের বেশি ফ্লাইট।
নতুন বছরের প্রথম প্রহরে শুরু হাড় কাঁপানো শৈত্য প্রবাহের অবনতি ঘটে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে। হিমাঙ্কের নীচে তাপমাত্রার সঙ্গে যোগ হয় ৫০ থেকে ৬০ মাইল বেড়ে প্রবাহিত তুষার ঝড়, যাকে স্থানীয়ভাবে‘বম্ব সাইক্লোন’ নামে অভিহিত করেছে গণমাধ্যমগুলো।
স্থানীয় সময় ৪ ডিসেম্বর ভোর থেকে তুষারপাতে ঢাকা পড়ে নিউইয়র্কসহ আশপাশের অঙ্গরাজ্যগুলো। ভারী তুষারপাতের কারণে নিউইয়র্কে জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা। পাশাপাশি পাবলিক স্কুলগুলোও বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে নগর প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাউথ ক্যারলিনা, নর্থ ক্যারলিনা, উইসকনসিন, মিজৌরি, মিশিগান, নর্থ ডেকটা, ভার্জিনিয়া, ম্যারিল্যান্ড, ডিসি, পেনসিলভেনিয়া, দেলওয়ার, নিউজার্সি, কানেকটিকাট, ম্যাসেচুসেটস, রোড আইল্যান্ড, নিউ হ্যামশায়ার, ভারমন্ট, নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের প্রায় দেড় কোটি বাসিন্দা বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এক রকম গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে, যার মধ্যে রয়েছে তিন লাখের বেশি বাংলাদেশিও।
ফক্স নিউজের সর্বশেষ খবরে তুষারঝড়ে আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ১৭ জন মারা গেছে বলে জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নিউইয়র্ক নগরে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
তীব্র ঠাণ্ডায় ১৭ জনের মৃত্যুর খবর দিয়ে ফেডারেল সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এর মধ্যে উইসকনসিনে সাতজন, টেক্সাসে চারজন নর্থ ক্যারলিনায় তিনজন এবং মিজৌরি, মিশিগান ও নর্থ ডেকটায় একজন করে মারা গেছেন।
এসব এলাকায় ১২ ইঞ্চি থেকে ২৪ ইঞ্চি পর্যন্ত তুষারপাতের কথা জানিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতের জাতীয় আবহাওয়া বার্তায় বলা হয়, এছাড়া বস্টন ও লং আইল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকায় ১২ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত জলোচ্ছ্বাস হয়েছে। গলে যাওয়া বরফের পানিতে ডুবে যায় বস্টনের রাস্তা।
দুর্যোগের কারণে নিউইয়র্ক, বস্টন, ফিলাডেলফিয়া, বাল্টিমোর, প্রভিডেন্স, রোড আইল্যান্ডসহ ১১টি শহরের সব স্কুলে গতকাল বৃহস্পতিবার ছুটি ঘোষণা করা হয়। সরকারি অফিসে উপস্থিতির ওপর ছিল না কোনো বাধ্যকতা।
নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, পেনসিলভেনিয়া, ম্যাসেচুসেটস ও কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। লোকজনকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেন রাজ্য গভর্নরেরা।
নিউইয়র্ক এবং নিউজার্সির বিভিন্ন এয়ারপোর্টের দুই হাজার ফ্লাইটসহ বস্টন, ফিলাডেলফিয়া, ভার্জিনিয়া এলাকার চার হাজার ফ্লাইট বাতিল করতে হয় বলে জানান পোর্ট অথরিটির নির্বাহী পরিচালক রিক কটন।
নিউইয়র্ক সিটির জ্যামাইকা, জ্যাকসন হাইটস, চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড, ওজনপার্ক, পার্কচেস্টার, হাডসন, নিউজার্সির প্যাটারসন, আটলান্টিক সিটি, পেনাসিলভেনিয়ার ফিলাডেলফিয়া, আপারডারবি, মিল বোর্ন সিটির বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকার সব দোকানপাট ছিল জনমানব শূন্য।
নিউ ইয়র্ক সিটিতে ২৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি ট্যাক্সি চালকের ৯০ শতাংশ দুর্যোগের কারণে কাজে যেতে পারেনি।
তুষারঝড়ের প্রাবল্য স্থানীয় সময় ৫ জানুয়ারি দুপুর পর্যন্ত থাকবে বলে জানানো হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। তবে ওয়েদার ডটকমের পূর্বাভাসে বলা হয়, এরপর তুষারঝড় থামলেও বাড়বে ঠান্ডার প্রকোপ। ৬ ও ৭ জানুয়ারি তীব্র ঠান্ডা থাকবে। আর ৮ জানুয়ারি বৃষ্টিপাতের পর তাপমাত্রার কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
নিউইয়র্ক ডেইলির খবরে বলা হয়েছে, ৪ জানুয়ারি ভোরেই নিউইয়র্ক শহরে আঘাত করে তুষারঝড়। ভারী তুষারপাতের সঙ্গে ছিল কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। ৫ জানুয়ারি সকালের মধ্যেই নগরের পাঁচটি বোরোতে ১০ ইঞ্চি পুরু বরফ জমতে পারে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বৈরী আবহাওয়ার কারণে এরই মধ্যে ব্রঙ্কসের ছয়টি ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে জ্যাকসন হাইটস ও রুজভেল্ট অ্যাভিনিউ এবং কিউ গার্ডেন ও কুইন্সের মধ্যে ই ও এফ ট্রেন চালু ছিল।
নগরের পরিবহন বিভাগ জানিয়েছে, স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের ফেরি ও রেলওয়েতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিলম্ব হচ্ছে। এদিকে নিউইয়র্ক শহরের লং-আইল্যান্ড সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো। এ অবস্থায় সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একইভাবে নিউজার্সির গভর্নর ক্রিস ক্রিস্টি অঙ্গরাজ্যের সব অফিস বন্ধ ঘোষণা করে নির্দিষ্ট কিছু কাউন্টিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, বিভিন্ন এয়ারলাইনস এরই মধ্যে বহু ফ্লাইট বাতিল করেছে। নিউওয়ার্ক লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দরের ৪৫০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। আর লা গার্ডিয়ার বাতিলকৃত ফ্লাইটের সংখ্যা ২৬৭। একই অবস্থা জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরেরও। বিমানবন্দরটির ১৬৯টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
গত সপ্তাহ থেকেই নিউইয়র্কসহ আমেরিকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোয় শীতের প্রকোপ বাড়তে থাকে। জমতে শুরু করে বরফ। ২ জানুয়ারি থেকেই তুষারঝড়ের সতর্কতা দিচ্ছিল গণমাধ্যমগুলো। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যেসব অঙ্গরাজ্যে বহু বছর তুষারপাত হয়নি, সেখানেও তুষারপাতের ঘটনা ঘটেছে। জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে জর্জিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি, ভার্জিনিয়াসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে। ফ্লোরিডাসহ আমেরিকার বহু এলাকায় স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো।
এবিসি নিউজের তথ্যমতে, মেক্সিকো উপসাগরে সৃষ্ট এ তুষারঝড় ৪ জানুয়ারি আঘাত হানার কথা থাকলেও একদিন আগেই ফ্লোরিডায় আঘাত হানে ঝড়টি। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬০-৭০ মাইল। আমেরিকার জাতীয় আবহাওয়া বিভাগ ভার্জিনিয়া, ম্যারিল্যান্ড, ডেলাওয়্যার, নিউজার্সির উপকূল, নিউইয়র্ক ও নিউ ইংল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকায় সতর্কতা জারি করেছে। আর কানাডা সীমান্তবর্তী নিউইয়র্কের নায়াগ্রা ফলস এখন কার্যত বরফ স্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।
আমেরিকার ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের আবহাওয়াবিদ ড্যান পিটারসন বলেন, ‘উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ঝড়টি আঘাত করবে। এ ঝড়ের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি ১৪ ইঞ্চি পর্যন্ত বরফ জমতে পারে। ঝড়টি চলে যাওয়ার পর নেমে আসবে ভয়াবহ ঠান্ডা। ঝড়টির কারণে এ বছর বেশ কিছু এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড হতে পারে। এ অবস্থায় সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ করছি আমি।’
জরুরি অবস্থা নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রে তুষারঝড়ে মৃত ১৭ 2018-01-05