Don't Miss
Home / নারী ও ‍শিশু / যুদ্ধাস্ত্রের কারণে ধ্বংস হচ্ছে শিশুদের ভবিষ্যত
যুদ্ধ

যুদ্ধাস্ত্রের কারণে ধ্বংস হচ্ছে শিশুদের ভবিষ্যত

এমএনএ ফিচার ডেস্কঃ যুদ্ধ ও অস্ত্র আজ একটি আরেকটির পরিপূরক। বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই বিশ্ব যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। যুদ্ধবাজদেশগুলো তাদের অস্ত্রের মহড়া দেখাতে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বব্যাপী। অস্ত্র ও গোলাবারুদ মানবজীবনের পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিবেশের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে থাকে। আর এর সবচেয়ে বড়া শিকার হচ্ছে শিশুরা। এই বিশ্বে এমন একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠছে যাদের জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন। তাদের মধ্যে অন্যতম শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্যহীন শিশু কিশোর।

যারা যুদ্ধ করে বা করায়, যারা যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যে যুদ্ধের কারণে অগুণিত মানুষ  ক্ষতিগ্রস্থ হয়, সেসব মানুষগুলোর কথা বিশ্বনেতারা কি কখনো ভাবেন!

অনেক শিশু ‍যুদ্ধকালিন সময়ে বাবা-মা, ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনকে হারিয়ে থাকে। অথচ শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের যত্নআত্তি সহানুভূতির উপর বেড়ে উঠে। যুদ্ধের সময় পিতামাতাকে হারিয়ে এসব শিশুরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে আগায়।শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা শারীরিক ও মানসিক বিকাশের মধ্যে থাকা অবস্থায় যদি যুদ্ধ বাঁধে তখন তাদের বিকাশ বাঁধাগ্রস্থ হয়।তারা স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

যুদ্ধে কোন শিশু কিশোর আক্রমণ বা নির্মম নির্যাতনের শিকার হলে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়াই স্বাভাবিক। কখনো কখনো শিশুরা পঙ্গুত্ব বরণ করে থাকে। যে সকল শিশুদের সৈনিক হিসেবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হয়, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। অপর্যাপ্ত খাদ্য, সেনিটেশন, দুর্বল জীবনমানের কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে শিশুরা।

ধ্বংসযজ্ঞ, দ্রারিদ্র্যতা ও সহিংসতার কারণে যুদ্ধ বিধ্বস্ত এলাকায় একটি দুষ্টুচক্রের আবির্ভাব ঘটে। জীবনযাত্রার অবকাঠামো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে শিশুদের পড়ালেখা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের উপর যুদ্ধের কারণে বাধাগ্রস্থ হলে তাতে শুধু শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের উপর প্রভাব পড়ে না, তাদের নিরাপত্তার উপরও প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

যুদ্ধের কারণে শিশুদের শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্থ হলে পুরো জীবনও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, একজন গর্ভবতী নারী যখন সহিংসতার শিকার হন তখন, অনাগত শিশুটিও স্বাস্থ্য ঝুকিতে পড়ে। এমনকি তার জন্মের পর সে শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হয়।

শিশুদের ক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রভাবটা সবচেয়ে বেশি পড়ে।তারা যখন দেখে যুদ্ধে তাদের মা-বাবারা জীবন বাঁচার প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে তুলে নেয় এবং শত্রুর মোকাবেলা করছে। সেক্ষেত্রে তার চোখের সামনে মা-বাবার মৃত্যু হচ্ছে, বা যুদ্ধে প্রতিপক্ষের আঘাতে পঙ্গুত্ব বরণ করছে, এর ফলে শিশু মনে যে রেখাপাত করে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি।বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ঐ শিশুর মানসপটে। নিজের চোখের সামনে সংঘটিত যুদ্ধের প্রভাব ঐ শিশুটির মধ্যে মানসিক উদ্বেগ সৃষ্টি করে।তাদের মধ্যে এমন একটা ভীতির সঞ্চার হয়, এই ভীতি থেকে কেউ তাদের রক্ষা করতে পারেনা। যা তাদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। এতে শিশু মনে উদ্বেগ উৎকন্ঠার সৃষ্টি করে।তারা মনে করে তাদের যুদ্ধ থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবেনা।

সিরিয়ায় যুদ্ধের সময় ওখানকার শিশুদের মানসিক ও স্বাস্থ্যের উপর সংঘাতের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছে সেভ দ্যা চিলড্রেন। শতকরা ৮৪% প্রাপ্ত ও প্রায় সকল শিশুই তাদের মানসিক চাপের কারণ হিসেবে বোমা হামলা ও গোলাগুলিকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৮৯% বলেছেন, শিশুরা স্নায়ুচাপে ভুগছে, ৭১% ব্যক্তি বলছেন, মানসিক চাপে প্রস্রাবে বিছানা ভেজাচ্ছে। এর ফলে নানাবিধ শারীরিক সমস্যায় ভুগছে শিশুরা।

সারা বিশ্বে ৮৫ মিলিয়ন বাস্তুচ্যুত মানুষ রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২৭ মিলিয়ন শরণার্থী।এর সবাই জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে অর্ধেকের বয়স ১৮ বছরের নিচে।যেমন মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মধ্যে হাজার হাজার শিশু আছে।

আরো যে সব দেশের বাস্তুহারা মানুষ রয়েছে, দেশগুলো হচ্ছে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, কঙ্গো, সুদান, দক্ষিণ সুদান, ভেনেজুয়েলা, প্যালেস্টাইন, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, ইউক্রেন এবং আরো অনেক দেশ থেকে এসেছে।

নৃশংসতা এবং যুদ্ধের কারণে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া শিশুরা এক কঠিন অবস্থা পার করছে পৃথিবীতে।তারা কখনো অন্যদের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেনা।

শিশুদের মনে ভীতি সৃষ্টির জন্য যুদ্ধকে শুধু দায়ী করছি আমরা। কিন্তু অস্ত্রও অনেক সময় শিশুদের মনে ভীতির কারণ হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে স্কুলে বন্দুক দিয়ে হামলা হয়েছে আমেরিকার টেক্সাসে।বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জাতি আমেরিকা। সেই দেশে একজন বন্দুকধারী কিভাবে স্কুল চলাকালিন সময়ে নির্বিচারে গুলি করে শিশু ও শিক্ষকদের হত্যা করেছে। আমেরিকান নাগরিকরা এখন স্কুলে তাদের সন্তানদের পাঠিয়ে নিরাপদে ঘর বসে থাকতে পারেনা। দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় তাদের সন্তানদের নিয়ে। সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পায়। এই ভীতি তাদের তাড়িয়ে বেড়াবে ভবিষ্যতে। এই ভীতির প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদী। ভবিষ্যতে এই প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে সন্দেহ নাই।

টেক্সাসের ঘটনা কোন বিচ্ছ্ন্নি ঘটনা নয়। আধুনিক বিশ্বে গত কয়েক দশকে এরকম অনেক ঘটনা ঘটেছে। ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল আগ্নেয়াস্ত্র।ঐ বছর  ৪৩৬৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউরূপের অনেক দেশ এসব অস্ত্রের প্রধান নির্মাতা। অথচ এই অস্ত্রের আঘাতে তাদের সন্তানরা বলি হচ্ছে।

আর যুদ্ধবাজরা মধ্যপ্রাচ্য আফ্রিকা ও এশিয়ার শিশুদের ভবিষ্যত ধ্বংস করছে যুদ্ধ ছড়ানোর মধ্য দিয়ে।আর এখন ইউক্রেণ-রাশিয়া যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইউরোপে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সেইদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এই যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে যাবে আমেরিকা পর্যন্ত। তখন তারা যুদ্ধের কারণে ভয়াবহ ক্ষতির বিষয়টি অনুধাবন করবেন। তাই যুদ্ধবাজ ও অস্ত্র প্রস্তুতকারক দেশগুলোকে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ভাবতে হবে!

যেখানে যুদ্ধ নেই সেখানে ধর্ম, জাতি এমনকি পারিবারিক মতাদর্শের কারণে শিশুরা বৈষম্য ও নির্যাতনের সম্মুখীন হয়।

যেমন ভারত ও ইসরায়েলের মুসলমান, আরব দেশে ইহুদি, রাশিয়ায় ‍উদারপন্থী ছাড়াও আরো অনেক কারণে বৈষম্যে শিকার হচ্ছে।

শিশুদের উপর যৌণ নির্যাতন, মাধকের অপব্যবহারের কারণে শিশুদের বেড়ে উঠার পরিবেশ কেড়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের অধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে।

অতিকষ্টে লালন পালন পালনের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠা শিশুদের জীবনে বিপর্য্য় নেমে আসে। আদর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে এক মানবেতর জীবনে পদার্প্ন করে।অনেকে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়, আবার কেউ কেউ সন্ত্রাসী বা অসামাজিক কার্য্ক্রমে জড়িয়ে পড়ে।

এরকম পরিবেশ থেকে কোন মেধাবী সৃষ্টি হতে পারেনা। মানবতাকে ভয় দেখাতে অ্যাডলফ হিটলার বা বেনিতো মুসোলিনি সৃষ্টি হয়ে মানবতাকে ভয় দেখাতে পারে। তাতে মানবসভ্যতার কোন কল্যাণ বয়ে আনে না।

বিগত দুই তিন দশকে মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত ভারসাম্যহীন একটি প্রজন্ম সৃষ্টি করেছি, তারাই খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে উঠবে, তখন কী ফল বয়ে আনবে এই বিশ্বের জন্য তা সহজে অনুমেয়।

যত শীঘ্রই সম্ভব বর্তমান শিশুদের মধ্য থেকে ক্ষতিগ্রস্থ শিশুর সংখ্যা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা না হলে এর পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর।

এই বিশ্বভ্রন্মান্ডের শিশুরা আগামীদিনের সম্পদ।তাদের জন্য ভিসামুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলা উচিত। তাদের জন্য নিরাপদ বিশ্বের কথা ভাবতে হবে। যদি আমরা তা না পারি, ক্ষতিগ্রস্থ হবে এই পৃথিবী।এই পৃথিবী নামে গ্রহে তাদের নিরাপদ পরিবেশ করে দিতে বিশ্বনেতাদের ভাবতে হবে।এজন্য অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে। যুদ্ধরত দেশেগুলো শিশু ও তাদের পরিবারকে রক্ষায় মনোযোগী হতে হবে।জনবহুল অস্ত্র ও বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক্ থাকতে হবে।স্কুল, হাসপাতাল ও গুরুতপূর্ণ্ অবকাঠামোগুলো রক্ষায় মনোনিবেশ করতে হবে।

যে সব দেশ অস্ত্র প্রস্তুত করেন ব্যবসায়িক কারণে বা নিজেদের নিরাপত্তার প্রয়োজনে, কিন্তু এসব অস্ত্রের ব্যবহার যদি নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, একদিন এসব অস্ত্র তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে! তখন তারা দায় এড়াতে পারবেননা।

আমরা এই বিশ্বের নাগরিক হিসেবে প্রতিটি স্তরে শান্তি কামনা করি। শিশুদের জন্য নিরাপদ জায়গা হোক, এই বিশ্ব তা প্রত্যাশা করতেই পারি।শিশুদের অধিকার রয়েছে তাদের নিরাপদে বেড়ে ওঠার একটি সুন্দর শান্তিময় উপযুক্ত জায়গা হোক। ভয় ও সহিংসতা তাদের স্পর্শ করবেনা।অকৃপন ভালোবাসা তাদের ন্যায্য পাওনা। তাহলে তারাও একদিন মেধাবী হয়ে এই পৃথিবীর সেবক হিসেবে আবির্ভূত হবে।

আমরা আশা করি, বিশ্ব নেতারা শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ আবাস তৈরিতে এগিয়ে আসবেন।

লেখক: মিয়া মনসফ, যুগ্ম সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সির (এমএনএ)

x

Check Also

আবারও ছড়িয়ে পড়ছে হাম, ২৩.২% শিশু দুই ডোজ নেওয়ার পরও আক্রান্ত

দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে একাধিক জরুরি পদক্ষেপ ...