যে নারীর উচ্চাভিলাষে ৩৭ বছরের একনায়কের পতন
Posted by: News Desk
November 22, 2017
এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : যে নারীর কারণে জনরোষ, বিক্ষোভ আর চাপের মুখে গতকাল মঙ্গলকার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে তিনি হলেন তার দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রেস মুগাবে
কিন্তু দেশটিতে এমন অনেকেই আছেন যাদের ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে আসলে ৩৭ বছর প্রেসিডেন্ট থাকা রবার্ট মুগাবে নন, বরং তার দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রেস মুগাবে।
সদ্য সাবেক হওয়া এই ফার্স্ট লেডিকেই নিজের জায়গায় অর্থাৎ জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট বানানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন রবার্ট মুগাবে।
৯৩ বছর বয়সী মুগাবের চেয়ে বয়সে ৪১ বছরের ছোট গ্রেসকে তিনি বিয়ে করেছিলেন ১৯৯৬ সালে।
পরে সময়ের পরিক্রমায় তিনি উঠে আসেন জিম্বাবুয়ের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এবং নিজেও লড়াইয়ে নেমেছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন মানাঙ্গাগওয়ার সাথে।
যার ফলে শেষ পর্যন্ত মানাঙ্গাগওয়াকে বরখাস্ত করেন প্রেসিডেন্ট মুগাবে আর সেটিই শেষ পর্যন্ত তাকে পদত্যাগে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে।
৯৩ বছর বয়সী রবার্ট মুগাবের স্ত্রী গ্রেস মুগাবের বয়স এখন ৫২। অনেকের মনে প্রশ্ন কে এই গ্রেস মুগাবে? কি করে তিনি জিম্বাবুয়ের ক্ষমতার লড়াইয়ের অন্যতম চরিত্রে পরিণত হলেন?
বিবিসির এক প্রতিবেদেনে জানানো হয়, ৪১ বছরের বড় রবার্ট মুগাবের সঙ্গে গ্রেস যখন প্রেম শুরু করেন তখন তিনি মূলত স্টেট হাউজের একজন টাইপিস্ট ছিলেন। মুগাবে তখন বিবাহিত ছিলেন যদিও তার স্ত্রী স্যালি তখন অসুস্থ ছিলেন এবং পরে ১৯৯২ সালে মারা যান। ১৯৯৬ সালে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রেসকে বিয়ে করেন মুগাবে। মুগাবে ও গ্রেস দম্পতির তিন সন্তান রয়েছে।
বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য সমালোচিত গ্রেস ২০১৭ সালে একজন মডেলকে নিগ্রহ করার ঘটনায় অভিযুক্ত হন। এছাড়াও ইউনিভার্সিটি অফ জিম্বাবুয়ে থেকে সমাজবিজ্ঞানে তার পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। রবার্ট মুগাবের মতো গ্রেস মুগাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
২০১৪ সালে ক্ষমতাসীন জানু পি-এফ পার্টির মহিলা শাখার প্রধান করা হয় । ডিসেম্বরে তাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করার কথা শোনা যাচ্ছিলো।
অথচ গেরিলা নেতা হিসেবে আফ্রিকার কালো মানুষদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে নেমে স্বাধীন জিম্বাবুয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন রবার্ট মুগাবে। ৩৭ বছর ধরে একনাগাড়ে ক্ষমতায় থেকে পরিচিতি পেয়েছেন একনায়কের। অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ব্যর্থতা ও বিরোধীদের হত্যার মধ্য দিয়ে এ দীর্ঘ সময় ক্ষমতা আকড়ে ধরে রেখেছিলেন তিনি। ৯৩ বছর বয়সে এসেও আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকার বাসনা ছিল তার। ইচ্ছে ছিল উত্তরাধিকারী হবেন তার চেয়ে বয়সে ৪১ বছরের ছোট স্ত্রী গ্রেস মুগাবে। তবে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে তার সব আশাই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে রবার্ট মুগাবের। দেশটির প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সদ্য পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া রবার্ট মুগাবে সেনাবাহিনী, নিজের রাজনৈতিক দলের চাপ ও ব্যাপক জনরোষের মুখে এ সিদ্ধান্ত নিলেও অনেকে মনে করছেন, স্ত্রী গ্রেস মুগাবের উচ্চাভিলাষী আকাঙ্ক্ষা ও বিলাসবহুল জীবনযাপনই এ পরিস্থিতির জন্য অনেকটা দায়ী।
ব্রিটিশ শাসিত রোডেশিয়ার এক সাধারণ স্কুলশিক্ষক ছিলেন মুগাবে। মার্কসবাদে দীক্ষিত মুগাবে স্কুলশিক্ষক থাকা অবস্থাতেই সংখ্যালঘু শাসক ব্রিটিশ সাদা মানুষদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। কালো মানুষদের অধিকার রক্ষার লড়াই করতে গিয়ে জেলে যাওয়ার পাশাপাশি, মুজাম্বিকে নির্বাসনেও যেতে হয়েছে তাকে। ১৯৭৪ সালে মুজাম্বিকে নির্বাসিত অবস্থায় তৈরি করেন নিজের রাজনৈতিক দল জানু।
যুক্তরাজ্যের মধ্যস্ততায় ১৯৭৯ সালের ল্যাঙ্কাস্টার হাউজ এগ্রিমেন্টের আওতায় ১৯৮০ সালে রোডেশিয়ায় প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর জানু পার্টির নেতা হিসেবে তাতে জয়লাভ করেন রবার্ট মুগাবে। সদ্য স্বাধীন জিম্বাবুয়ের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১০০টি দেশের প্রতিনিধি আর হাজার হাজার জিম্বাবুয়েবাসীর সামনে শপথ নেন তিনি।
নির্বাচনের আগে জিম্বাবুয়ের প্রাকৃতিক সম্পদের সমবন্টনের অঙ্গীকার করেছিলেন মুগাবে। কিছুদিনের মধ্যে সেই অঙ্গীকার নিপীড়ন আর বঞ্চনায় পরিণত হলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতা আকড়ে রাখতে বিরোধী মতের ২০ হাজার নাগরিককে হত্যা করেন মুগাবে।
১৯৮৭ সালে বিরোধী দল জাপুকে নিজের দলের সঙ্গে একীভূত করে জানু-পিএফ নাম দিয়ে নতুন দল গঠন করেন তিনি। নিজের ক্ষমতা আরও বাড়াতে প্রেসিডেন্ট হন তিনি। কথিত আছে, ওই বছর থেকেই নিজের ব্যক্তিগত সহকারী ৪১ বছরের ছোট গ্রেস মারুফুর সঙ্গে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন মুগাবে।
মুগাবের প্রথম স্ত্রী ছিলেন স্যালি মুগাবে। অনেকেই বলে থাকেন, মুগাবের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু ছিলেন তিনি। পুরো জিম্বাবুয়েতেই একমাত্র তার কথাই বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নিতে পারেন মুগাবে। একসময় দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোকে তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন, তার স্ত্রীকে ‘আমাই’ (মাদার অব দি নেশন) নামে সম্বোধন করতে।বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় ‘জাতির মাতা’।
১৯৯২ সালে মারা যান স্যালি। আর ১৯৯৬ সালে গ্রেসকে বিয়ে করেন মুগাবে। তাদের বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। উচ্চাভিলাষী নারী গ্রেসের ছিল শপিং বাতিক। শপিং বাতিকগ্রস্ততার জন্য জিম্বাবুয়েতে কখনো কখনো তাকে গুসি গ্রেস, ফার্স্ট শপার, এমনকি ডিসগ্রেস নামেও ডাকা হতো। বিরক্ত হয়ে একবার তার শপিং করা বন্ধ করেছিলেন মুগাবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনসম্মুখে বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন গ্রেস। নিজেকে ভাবতে শুরু করেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন মানগাগওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, কয়েক সপ্তাহ আগে ভাইস প্রেসিডেন্টকে বহিষ্কার করার ঘটনায় মুগাবেকে প্রভাবিত করেছিলেন গ্রেস। আশঙ্কা তৈরি হয় তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে নতুন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে। আর এই ঘটনাই কাল হয়ে ওঠে মুগাবের জন্য। দেশটির সেনাবাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। গত বুধবার এক নীরব অভ্যুত্থানে তাকে গৃহবন্দী করে ফেলা হয়। আর এতেই বিদায় ঘণ্টা বেজে ওঠে ৩৭ বছরের একনায়কের।
আফ্রিকা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার সাদরাক গুটু গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সংকটের শুরু করেছিলেন গ্রেস মুগাবে। স্বামীকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নিজেই তা দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি। আর সেনাবাহিনী ভেবেছে যথেষ্ট হয়েছে। এবার থামো।’
অবশ্য গ্রেসকে এই কাজে সমর্থন দিচ্ছিলেন জি৪০ নামে তরুণদের একটি দল। এই গ্রুপটি সম্প্রতি জিম্বাবুয়েতে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ছাড়া ২০১৪ সাল থেকে গ্রেস জানু-পিএফ দলের নারী শাখার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার টেলিভিশন অনুষ্ঠানে গ্রেস একবার বলেছিলেন, লোকে তার সম্পর্কে কী মনে করে, তাতে তার কিছু যায় আসে না। ‘আমি চামড়া মোট করে ফেলেছি। আমার কিছুই মনে হয় না। আমার স্বামী বলেন, এসব এড়িয়ে যাওয়া হলো আর্শীবাদ।’
তবে এখন রবার্ট মুগাবের পদত্যাগের ঘোষণার পর গ্রেস মুগাবের ভবিষ্যৎ কি হয় সেদিকেও দৃষ্টি রয়েছে অনেকের।
মুগাবের যে নারীর প্রেসিডেন্ট কারণে পতন 2017-11-22