এমএনএ জাতীয় ডেস্কঃ চিকিৎসা করাতে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় গিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ঝিনাইদহ-৪ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজিম আনার। কিন্তু তাকে কেন, কারা, কীভাবে ও কোথায় হত্যা করেছে- এ নিয়ে পরতে পরতে রহস্য দেখা দিয়েছে। তাছাড়া ১৪ তারিখের পর তার ফোন কে ব্যবহার করেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কলকাতা ও ঢাকার পুলিশের ধারণা, এমপি আনার অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, কলকাতায় পরিকল্পনামাফিক খুন করা হয়েছে সরকারদলীয় এই এমপিকে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন বাংলাদেশে তিনজনকে ও কলকাতায় দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এছাড়া এমপি আনারের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে কি না তা নিয়ে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ধোঁয়াশা রয়েছে। এই ঘটনার তদন্তভার নিয়েছে কলকাতা পুলিশের সিআইডি। তার পরেই বিধাননগরের নিউ টাউনের অভিজাত ‘সঞ্জীভা গার্ডেন’ আবাসন পরিদর্শন করেন সিআইডির আইজি অখিলেশ চতুর্বেদী। ভারতের চিকিৎসার জন্য গিয়ে ‘খুন হওয়া’ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিমের মরদেহ এখনও উদ্ধার হয়নি বলে জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ।
বুধবার (২২ মে) বিকালে পশ্চিমবঙ্গ গোয়েন্দা পুলিশের আইজি অখিলেশ চতুর্বেদী বলেন, বাংলাদেশের এমপি আনোয়ারুল আজিম আনার ব্যক্তিগত সফরে এসে এখান থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। ১৮ মে ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারের কাছে একটি নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়। এমপি পরিচিত গোপাল বিশ্বাস এই অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করি। এই ঘটনা তদন্তে ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারের একটি তদন্তকারী দল গঠন করা হয়। এরপর গত ২০ মে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে এই কেসটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার একটি নির্দেশ আসে বলে জানান তিনি।
চতুর্বেদী জানান, গতকাল আমাদের কাছে তথ্য আসে আনারকে খুন করা হয়ে থাকতে পারে। এরপরে আমাদের পুলিশ নিউ টাউনের বিলাসবহুল আবাসন ‘সঞ্জীভা গার্ডেনের’ ওই ফ্ল্যাটটি সনাক্তকরণ করে। কারণ এখানেই তাকে শেষবার দেখা গিয়েছিল। আমাদের কাছে যা তথ্য আছে তাতে এমপি ১৩ তারিখে এই আবাসনে ঢুকেছিলেন। তবে এর আগে এসেছিলেন কিনা সেটি আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিলেন সেই বিষয়টি এখনও তদন্ত সাপেক্ষ, যোগ করেন চতুর্বেদী।
এমপি আনারের শরীর টুকরো টুকরো করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে তার সত্যতা কতুটুকু, এমন প্রশ্নের জবাবে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ কর্মকর্তা চতুর্বেধী বলেন, এটা এখনই বলা সম্ভব নয়। টিম ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ফটোগ্রাফিসহ সবাইকে এই তদন্ত করতে বলা হয়েছে। তারা খতিয়ে দেখছেন।
তিনি আরও জানান, যে প্লটটিতে ওই এমপি উঠেছিলেন সেটি সন্দীপ রায় নামে এক ব্যক্তির। তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আবগারি দপ্তরে কাজ করেন। তিনি ভাড়া দিয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (প্রবাসী বাংলাদেশি) বাসিন্দা আখতারুজ্জামান নামে এক ব্যক্তিকে। এদিকে যে ফ্ল্যাটে আনোয়ারুল আজিম আনার ছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে, সেই ফ্ল্যাটে রক্তের দাগ মিলেছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা সেখান থেকে আঙুলের ছাপ এবং রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেছে।
কলকাতা পুলিশ সূত্র বলছে, তাদের ধারণা ওই ফ্ল্যাটে আনারকে হত্যা করে তার দেহ টুকরো টুকরো করা হয়। সেই দেহাংশ এখনও মেলেনি। তবে ফ্ল্যাটে রক্তের নমুনা মিলেছে। পুলিশ কয়েকজনকে খুঁজে পেয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ মে ভারতে চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলেন ঝিনাইদহের এমপি আনোয়ারুল আজিম আনার। প্রথমে উঠেছিলেন বরাহনগরে তাঁরই এক বন্ধু গোপাল বিশ্বাসের বাড়িতে। দিন দুয়েক সেখানে থাকার পর এক দিন বাড়ি থেকে বেরোন আনোয়ারুল। তার পর থেকেই আর তাঁর খোঁজ মিলছিল না। বাংলাদেশে আনারের পরিবারও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে অগত্যা গোপালের সঙ্গে যোগাযোগ করে। গোপাল তাদের জানান, তিনিও আনারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
সিআইডির আইজি অখিলেশ জানিয়েছেন, খোঁজ না পেয়ে গোপাল থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন। সেই অভিযোগের তদন্ত করতে একটি দল গঠন করে ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেট। অখিলেশ বলেন, ‘‘সেই তদন্ত চলছিল। তার মধ্যে ২২ মে আমরা জানতে পারি, ওকে খুন করা হয়েছে। শেষ বার যেখানে তাঁকে দেখা গিয়েছিল, সেই জায়গাটি খুঁজে বার করে স্থানীয় থানা। এর পরে সিআইডিকে তদন্তের ভার দেয়া হয়।’’
সিআইডি সূত্রের খবরে জানা যায়, নিউ টাউনের যে আবাসনে এমপি আনার ছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে, সেই ফ্ল্যাটটির মালিক সরকারি কর্মচারী জনৈক সন্দীপ। তিনি আবার আখতারুজ্জামান নামে এক ব্যক্তিকে ফ্ল্যাটটি ভাড়া দেন। সিআইডির আইজি জানিয়েছেন, আখতারুজ্জামান আমেরিকার নাগরিক। কিন্তু আখতারুজ্জামানের নামে ভাড়া নেয়া ফ্ল্যাটে কী করে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য থাকলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে অখিলেশকে প্রশ্ন করা হলেও তিনি জবাব দেননি।
বাংলাদেশের এমপি আনার যে কলকাতার নিউ টাউনের ফ্ল্যাটে আছেন, তা জানা গেল কীভাবে? অখিলেশ বলেন, ‘‘১৮ তারিখে একটি নিখোঁজ অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। তার পর ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেট একটি এসআইটি গঠন করে। সেই তদন্ত করতে গিয়েই আমরা খবর পাই।’’
নিউ টাউনের আবাসনের ফ্ল্যাটে রক্তের দাগ পাওয়া গিয়েছে বলে পুলিশ সূত্রের খবরে জানা যায়। ইতোমধ্যেই সেখানে পৌঁছে নমুনা সংগ্রহের কাজ করেছেন ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞেরা। রক্তের দাগ বাংলাদেশের সংসদ সদস্যেরই কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। অন্যদিকে গত ১২ মে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে আনোয়ারুল আজিম আনার ভারতে প্রবেশ করে ১৪ মে পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। তবে ১৬ মে সংসদ সদস্যের ফোন থেকে আনারের ব্যক্তিগত সহকারী আবদুর রউফের কাছে ফোন আসে। তিনি ফোন ধরতে পারেননি। পরে আবার তিনি ফোন করলে ফোনটি বন্ধ পেয়েছেন। এর পর থেকে সংসদ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
আনোয়ারুল আজিমের হত্যায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। বাংলাদেশে আটক করা হয় তাদের। আটককৃত ব্যক্তিরা সম্প্রতি কলকাতা থেকে দেশে ফিরেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেন, গত ১২ মে তিনি (আনোয়ারুল আজিম আনার) ভারতে গিয়ে নিখোঁজ হন। এই ঘটনায় ভারতে একটি সাধারণ ডায়েরি হয়। সেই ডায়েরির সূত্র ধরেই বাংলাদেশ পুলিশ ও ভারতের পুলিশ তদন্ত শুরু করেছিল। আজ সকালেই আমরা নিশ্চিত হয়েছি, তিনি খুন হয়েছেন। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আমরা তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। আটককৃতরা হত্যাকাণ্ডে বিষয়ে কোনো তথ্য দিয়েছে কিনা জানতে চাইলে পুলিশ কমিশনার বলেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে, এখনই এর বেশি কিছু বলা যাবে না।
প্রতিক্ষণেই ভারতীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে- ডিবি প্রধান হারুন: আনোয়ারুল আজিম বাংলাদেশের কিছু অপরাধীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন- বলেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। বুধবার দুপুরে ঢাকার মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, কালিগঞ্জের তিনবারের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিমের ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এটি একটি নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড এটি পারিবারিক, আর্থিক, নাকি এলাকার কোনো দুর্বৃত্তকে দমন করার জন্য হয়েছে, তা আমরা তদন্ত করে দেখছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা নিবিড়ভাবে ভারতীয় পুলিশের সঙ্গে কাজ করছি। প্রতিক্ষণেই তাদের সঙ্গে আমাদের কথা হচ্ছে। অনেক তথ্য পাচ্ছি। তদন্তের স্বার্থে সেসব বিষয় আমরা বলতে চাচ্ছি না।
গোয়েন্দা পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, সংসদ ভবন এলাকা থেকে সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ভারতের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। এ জন্য এ ঘটনায় শেরে বাংলা নগর থানায় আজকের মধ্যে মামলা হবে। তার মেয়ে মামলা করতে সহযোগিতা ও পরামর্শের জন্য আমাদের কাছে এসেছেন। আমরা তার মেয়েকে মামলা করতে সহযোগিতা করবো। একজন সংসদ সদস্যকে বাংলাদেশের কিছু অপরাধী নৃশংসভাবে যেভাবে হত্যা করেছে, আমরা তাদের কয়েকজনকে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছি। তদন্তের স্বার্থে আমরা আটক ব্যক্তিদের নাম বলছি না।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধাননগরের নিউটাউনে যে ফ্ল্যাটে সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিমকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে এখনো কোনো লাশ খুঁজে পায়নি পুলিশ। কলকাতা পুলিশ বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনকে এ তথ্য জানিয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।
ভারতে এমপি আনারের মৃত্যু রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে আরেকটি বিষয় দেশটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সামনে এসেছে। তা হলো এমপি আনারের মোবাইল ফোন। তিনি নিখোঁজ হওয়ার আগ পর্যন্ত থেকে শুরু করে সর্বশেষ লোকশন থেকে হোয়ার্টস অ্যাপে সব বার্তা দেয়া হয়েছে। একবার তার ফোন থেকে পিএসকে ফোন করাও হয়েছিল। পিএস সেটি রিসিভ করতে পারেনি। পরে ফিরতি কল করা হলেও এমপি আনার ফোন ধরেন নাই। এমনকি তার সর্বশেষ লোকশন যখন বিহার ও ঝাড়খান্ডে ট্রেস হলো, তার পর মরদেহ মিললো কলকাতায়! এমন সব ধাঁধায় দেশটির পুলিশসহ গোয়েন্দাদের সন্দেহ তার ফোনেই হয়তো লুকিয়ে আছে মৃত্যুর রহস্য। আদৌ কি মোবাইল ফোনটি এমপি আনারের কাছে ছিল? এর উত্তর জানতে হয়তো আরও কিছু অপেক্ষা।
এদিকে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় খুন করার উদ্দেশ্যে অপহরণের অভিযোগে মামলাটি দায়ের করেন এমপি আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহাদ আলী বলেন, অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এখন তদন্ত করে আসামিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
এমপি আনার সংসদ ভবন এলাকায় থাকতেন। সেখান থেকে তিনি ভারতে গেছেন। তাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) প্রধান হারুন-অর-রশিদের পরামর্শে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা দায়ের করেন তার মেয়ে। এদিকে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিমের খুনের ঘটনা নিয়ে কলকাতার নিউ টাউন থানায় হত্যা মামলা দায়ে করা হয়েছে। পুলিশ বাদী হয়ে এই মামলা রুজু করা হয় বলে জানা গেছে।
চিকিৎসার জন্য গত আট দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর কলকাতায় এমপি আনার খুন হন বলে বুধবার খবর আসে। তবে তার মরদেহ উদ্ধার হয়েছে কি না তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। এদিকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে সন্দেহে একটি গাড়ি আটক করেছে কলকাতা নিউ টাউন পুলিশ। গতকাল নিউটাউন থানার সামনে গাড়ির ভেতর থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে ফরেনসিক টিম। গাড়ির মালিক গাড়িটি ভাড়ায় ব্যবহার করতে দিয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

