এমএনএ প্রতিবেদক
রাজধানীতে জ্বালানি তেলের সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চালক ও পরিবহন–নির্ভর মানুষজন। ব্যক্তিগত গাড়ির চালক আকরামুল ইসলাম রাত তিনটায় ঘুম থেকে উঠে বনশ্রী এলাকার আশপাশে পাঁচটি পাম্প ঘুরেও তেল পাননি। পরে ভোর চারটার দিকে জাহাঙ্গীর গেট এলাকায় লাইনে দাঁড়ান, যাতে সকালে তাঁর নিয়োগকর্তার সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও বেলা ১১টা পর্যন্ত তিনি তেল পাননি। প্রায় সাত ঘণ্টা পর বিজয় সরণির একটি পাম্প থেকে তিনি জ্বালানি সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।
আকরামুল জানান, আগের দিনও গাড়ি চালাতে পারেননি। নিয়মিত এমন পরিস্থিতি চলতে থাকায় তাঁর আয় ব্যাহত হচ্ছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হিসেবে তিনি শঙ্কায় আছেন—এভাবে গাড়ি বন্ধ থাকলে চাকরিও হারাতে পারেন। ঈদের ছুটিতে তিনি পরিবারের সঙ্গে নোয়াখালী গেলেও সেখানেও একই সমস্যার কারণে গাড়ি চালাতে পারেননি।
একই চিত্র ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক মো. সাব্বিরের ক্ষেত্রেও। আগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও বাড়তি আয়ের আশায় মোটরসাইকেল চালানো শুরু করেন তিনি। গত তিন বছরে মাসে ২৮ থেকে ৩৫ হাজার টাকা আয় করলেও গত এক মাসে তা নেমে এসেছে প্রায় ২০ হাজারে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে সামান্য তেল পাওয়ায় কাজ করতে পারছেন না, ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাব্বির জানান, কখনো তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। তাও বেশির ভাগ পাম্পে পুরো ট্যাংক ভরতে দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেওয়া হচ্ছে—মোটরসাইকেলে ৫০০ টাকা, প্রাইভেট কারে ২ হাজার এবং মাইক্রোবাসে ৩ হাজার টাকার জ্বালানি।
রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে একই অবস্থা দেখা গেছে। আসাদগেট এলাকার একটি পাম্পে সরবরাহ বন্ধ থাকলেও দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছেন চালকেরা। কেউ কেউ তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় গাড়ি ঠেলেও পাম্পে পৌঁছেছেন। সাভার থেকে আসা ফয়েজ উল্লাহ জানান, ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাননি, অথচ গন্তব্যে পৌঁছানোর অন্য কোনো উপায় নেই।
অ্যাপভিত্তিক পণ্য সরবরাহকারী রাজন শিকদারও একই সমস্যায় পড়েছেন। সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় তিনি কোনো অর্ডার নিতে পারেননি। তেল না পেলে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে, যা সরাসরি তাঁর আয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে।
এদিকে, কিছু পাম্পে আনুষ্ঠানিকভাবে রেশনিং না থাকলেও সব গ্রাহককে তেল দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাম্প কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে সীমিত পরিমাণে জ্বালানি সরবরাহ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নজরদারি চলছে, তবে সংকটের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
জ্বালানি তেল সরবরাহে সোনার বাংলা পাম্পে রেশনিং করা হচ্ছে কেন জানতে চাইলে কর্মচারী মো. সুজন বলেন, ‘সিরিয়াল অনেক লম্বা। সবাইকে যাতে দেওয়া যায়। তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় রাত থেকে প্রাইভেট কারে জ্বালানি সরবরাহ করা যায়নি।’
রাজধানীর আসাদগেটে সকাল থেকে তালুকদার পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এর মধ্যে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পাম্প বন্ধ থাকলেও ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন কেনার আশায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন প্রাইভেট কার ও বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা। অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে কিছু মোটরসাইকেলকেও।
তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য সকাল সাতটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ফয়েজ উল্লাহ। তিনি সাভার থেকে এসেছেন। গন্তব্য কেরানীগঞ্জ। পথের অন্তত পাঁচটি পাম্প ঘুরে কোথাও জ্বালানি পাননি।
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সামনে এলে তেল সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়। পরে দেড় কিলোমিটার গাড়ি ঠেলে তালুকদার ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ান।
বেলা ১টায় কথা হয় ফয়েজ উল্লাহর সঙ্গে। তখনো তিনি তেলের জন্য অপেক্ষায়। তিনি বলেন, ‘দেড় কিলোমিটার গাড়ি ঠেলে এসেছি। ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করছি। কখন পাম্প খোলে জানি না। তেল না পেলে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।’
তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে কথা হয় অ্যাপে পণ্য সরবরাহ করা রাজন শিকদারের সঙ্গে। তিনিও সকাল ৬টা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। জ্বালানি সংগ্রহের জন্য আজ তিনি পণ্য সরবরাহের কোনো অর্ডার নিতে পারেননি। তাঁর আশা ট্যাংক ফুল নিতে পারলে কয়েক দিন অন্তত মোটরসাইকেল চালানো যাবে। বললেন, তেল নিতে না পারলে অর্ডার নেব কীভাবে? এই কাজে সংসার চলে।
জ্বালানির হিসাব রাখছেন ট্যাগ কর্মকর্তা
যমুনা অয়েল কোম্পানির ঢাকা জোনের অফিসার (সেলস) ইমরান হোসাইন ট্যাগ অফিসারের দায়িত্ব পালন করছিলেন সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে। তেল লোড–আনলোডের হিসাব রাখছিলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমাকে আরও আটটি পাম্প ঘুরতে হবে। সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনই প্রথম। কোনো অসংগতি চোখে পড়েনি।’
সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে ইমরান হোসাইন বলেন, ‘সরকার রেশনিং উঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সব গ্রাহক যেন তেল পায়, তাই পাম্প মালিক কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়ে রেশনিং করছেন।’
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

