তুষার আহমেদ : রাজধানীতে বসবাস করছে প্রায় দেড় কোটি লোক। তাদের চলাচলের অন্যতম বাহন রিকশা। অথচ রিকশায় চড়তে যাত্রীদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বেশির ভাগ চালক অহেতুক বেশি ভাড়া দাবি করেন। মন মতো ভাড়া না পেলে চলে না রিকশার চাকা। সর্বোপরি রাজধানীর সর্বত্র সরেজমিন দেখা গেছে রিকশা ভাড়া নিয়ে চলছে নৈরাজ্য।
আর এতে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন নগরবাসী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাত্রী হয়রানি রোধে রাজধানীতে রিকশা ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রকে এই দায়িত্ব নিতে হবে।
আতিক হায়াত একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। থাকেন ধানমন্ডির শংকরে। অফিস কাওরান বাজারে। অফিসে আসেন রিকশায় করে। কথা প্রসঙ্গে জানালেন, এই অল্প দূরত্বে আসতে তিন মাস আগেও লাগতো ৫০ টাকা। এখন ৮০ থেকে ৯০ টাকা ছাড়া কথাই বলা যায় না। অহেতুক রিকশা ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় খুবই বিরক্ত তিনি।
নজরুল ইসলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ড্রাইভারের চাকরি করেন। থাকেন মোহাম্মদপুরের চান মিয়া হাউজিংয়ে। অফিস মতিঝিলে। মালিকের বাসা ধানমন্ডির ২৭-এ এইচএসবিসি ব্যাংকের পাশে। বসের বাসায় যাতায়াত করেন রিকশায়। কথা প্রসঙ্গে জানালেন, এই অল্প দূরত্বে আসতে মাস খানেক আগেও লাগতো ৩০ টাকা। এখন ৬০ টাকা ছাড়া কথাই বলা যায় না। অহেতুক রিকশা ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় খুবই বিরক্ত তিনি।
অপরাজিতা আহমেদ ইকবাল রোডস্থ একটি বেসরকারি স্কুলে পড়ছেন। থাকেন মোহাম্মদী হাউজিংয়ে। সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে বের হলেন বাসা থেকে। কিছুদূর হেটে শিয়া মসজিদের সামনে দাঁড়ালেন। কয়েকজন রিকশাচালক অপেক্ষা করছে। রাস্তা পার হতেই, আপা কই যাবেন? বললেন, ইকবাল রোড। ভাড়া কত? মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, সামনে রমজান। বিবেচনা কইরা দিয়েন। এমনে তো ৪০ টাকা ভাড়া। তবে আজ ৬০ টাকা ছাড়া যাওয়া যাবে না।
এ ব্যাপারে অপরাজিতা আহমেদ অনেকটা রাগত স্বরেই বললেন, আপনিই বলেন দেশে কি এমন ঘটে গেল যে, শিয়া মসজিদ থেকে ইকবাল রোড পর্যন্ত মাস খানেক আগেও যেখানে ভাড়া ছিল ২০ টাকা। সেখানে হঠাৎ তা দ্বিগুন-তিনগুন হয়ে যাবে।
কেবল, আতিক হায়াত, নজরুল ইসলাম কিংবা অপরাজিতা আহমেদই নন প্রতিদিন এমন অহেতুক বিড়ম্বনায় পড়েন অনেকেই। কিছুদিন আগেও রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে প্রেসক্লাব পর্যন্ত ভাড়া ছিলো ১৫ থেকে ২০ টাকা। অথচ সেখানে এখন আদায় করা হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। দৈনিক বাংলা থেকে বিজয় নগর পর্যন্ত ২০ টাকায় যাওয়া যেতো। সেখানে এখন আদায় করা হচ্ছে ৪০ টাকা থেকে ৪৫ টাকা। এ নিয়ে রিকশা চালকদেরকে কোনো কারণ জিজ্ঞাস করা যায় না। তাদের এক কথায় উত্তর, ‘টাকা দিয়েই রাস্তায় টিকে আছি। বেশি ভাড়া নিব না কেনো?’
এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মতো রাজধানীর প্রতিটি সড়কের অলিগলিতে রিকশা ভাড়া নির্ধারণ, রিকশাচালকদের পেশাগত লাইসেন্স প্রদান, রুটভিত্তিক রিকশার সংখ্যা নির্ধারণের দায়িত্ব ঢাকার দুই সিটি মেয়রকে নিতে হবে। তাহলে রিকশা সেক্টরে যাত্রী হয়রানি কমবে, নৈরাজ্য বন্ধ হবে। যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা
সম্ভব হবে।
জানা যায়, অবিভক্ত সিটি করপোরেশন সর্বশেষ ১৯৮৭ সালে রিকশার লাইসেন্স প্রদান করে। ওই সময় রাজধানীতে মোট নিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০ হাজার। রাজধানীতে অবৈধ রিকশার সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে। নিবন্ধন বন্ধ থাকায় বর্তমানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ সরকারি কোনো সংস্থার কাছে রাজধানীতে অনিবন্ধিত রিকশার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজধানীতে অনিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।
গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার মোট জনসংখ্যার ১০ ভাগ মানুষ তার নিজস্ব কার মাইক্রোবাস কিংবা অন্যান্য পরিবহনে চলাচল করেন। ভাড়ায় চালিত বাস ও মিনিবাসে ২৫ ভাগ। সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও ট্যাক্সিক্যাবে ৫ ভাগ। আর বাকি ৬০ ভাগ মানুষের বাহন রিকশা। এ সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে রিকশা চালকরা।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

