এমএনএ ফিচার ডেস্কঃ জনগনের অভিভাবক হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। একটি জাতির ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক হিসেবে রাজনীতিবিদদের উপর জনগণ সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখে। এজন্য জনগনের আস্থা অর্জনের জন্য নেতাদের দায়িত্ববোধের পরিচয় দেয়া উচিত। কিন্তু আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা মাঝে মাঝে দায়িত্বজ্ঞানহীনের পরিচয় দেন। জনসভা, টকশোতে এমন সব আজগুবি কথা বলে বসেন, তাতে জনগণের মাঝে গুরুতর অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাদের কান্ডজ্ঞানহীন কথাবার্তা মাঝে মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় বয়ে যায়। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে রাজনীতিবিদদের দায়িত্বশীলভাবে কাজ করা এবং কথা বলা উচিত।
সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে মোমেন বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিতে ভারত সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। যাতে তিনি আগামী নির্বাচনে আবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকতে পারেন! তার বক্তব্যে সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিরোধী দল ও সরকারী দলের মিত্রদলগুলোর নেতারাও সরকারের প্রভাবশালী এই মন্ত্রীর অপরিপক্ক মন্তব্যের জন্য ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এমনকি আওয়ামী লীগের নেতারাও পররাষ্ট্র মন্ত্রীর এই বক্তব্যের জন্য ক্ষুব্ধ। তাতে সার্বভৌমত্বকে আঘাতের পাশাপাশি দলের সুনাম ক্ষণ্ন হয়েছে। এই মন্তব্যের ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইমেজকেও আঘাত করেছে। অথচ তাঁর বিচক্ষণ নেতৃত্ব, আপোষহীন ও দূরদর্শী মনোভাবের জন্য বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করেছেন তিনি।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কিছুদিন আগে দলের নেতাদের সতর্কতার সাথে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ নেতারা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করতেও পিছপা হননি। দলের সিনিয়র নেতারা বলেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগের কেউ নন, অতএব, তাঁর বক্তব্যের দায় তাকে এককভাবে নিতে হবে। এই দায় আওয়ামী লীগের নয়। রাজনৈতিক দলের জন্য এটি একটি ভালো দিক। কেননা নিজ দলের কোন নেতা বা মন্ত্রীর অগ্রহণযোগ্য কাজ বা কথার জন্য নিজ দলের অন্যান্য নেতাদের কাছেই সমালোচিত হচ্ছে। কিন্তু ইতিমধ্যে ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে। দেশের মানুষ ও বিরোধী দলের কাছে দলের সুনাম ক্ষুন্ন হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ সরকারী দলের সমালোচনা করার একটা মোক্ষম সুযোগও পেয়ে গেছে বটে!
বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ নেতৃত্বে অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবেলা করে দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ড অব্যাহত রেখেছেন, এধরণের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার জন্য বাংলাদেশ ও ক্ষমতাসীন দলকে একটু বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমএ মোমেনের নিয়ন্ত্রণহীন কথা এবারই প্রথম নয়। তিনি এর আগেও বেফাঁস কথা বলেছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভালো অবস্থার পক্ষে সাফাই করতে গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে বাস করছে! এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা একজন মন্ত্রী হয়ে কিভাবে বলতে পারে! তাঁর মতো আরো বেশ কয়েকজনমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বক্তব্য রেখেছেন। যা তাঁদের দায়িত্ববোধের পরিচয় বহন করেনা। বিরোধী দল পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যের রেশ ধরে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা একটা বিষয় ভুলে গেলে চলবেনা, ভারত আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র। শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রই নয়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের অবদান কখনো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন মন্তব্যে ভারতও অস্বস্তির মধ্যে আছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ভারতের সাথে আমাদের অনেক মিল আছে। এই সম্পর্ক আমাদের অটুট রাখতে হবে। বিএনপি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে তাদেরকেও ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
তাহলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে বিএনপির উচিত এবিষয়ে বেশি ঘাটাঘাটি না করা। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো বেফাঁস কথা বিএনপির মন্ত্রীরা ক্ষমতায় থাকাকালিন সময়ে কি বলেননি! তাদের মন্ত্রীরাও বিভিন্ন সময়ে সময়ে আজগুবি সব মন্তব্য করে সমালোচিত হয়েছেন। জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালিন সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক উক্তিকে ঘিরে তোলপাড় হয় সারাদেশ।
দিনটি ছিল ২০০২১ সালের ৯ মে। রামপুরায় বাবার কোলে থাকা অবস্থায় শিশু নওশীন ছিনতাইকারীর গুলিতে নিহত হয়। নিহত শিশুর পরিবারকে সান্তনা দিতে গিয়ে তৎকালিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল(অবঃ) আলতাফ হোসেন চৌধুরী বলেছিলেন, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে।
রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী যদি এমন মন্তব্য কি করতে পারে! কিন্তু মন্ত্রী এমপি বা রাজনৈতিক নেতারা হরহামেশাই এমন কান্ডজ্ঞানহীন কথা বলে থাকেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট আরো একটি কলঙ্কজনক দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়। ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বোমা হামলা করা হয়েছিল। এসব ঘটনা আমাদের দেশের ন্যাক্বারজনক ঘটনাগুলোর অন্যতম। আর এসব ঘটনা নিয়ে বিএনপি প্রায়ই নানান রকম মন্তব্য করে বিতর্কের জন্ম দেয়। সাবেক বিএনপি নেতা এস কিউ চৌধুরী প্রায়ই আওয়ামী লীগ নেত্রীকে উদ্দেশ্য করে আরেকটি ১৫ই আগস্ট সৃষ্টির হুমকি দিতেন। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের মিছিল থেকে ‘পঁচাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার’ এমন শ্লোগান দেয়া হয়েছে। বিএনপি নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন সভা সমাবেশে ২১শে আগস্ট আওয়ামী লীগ নিজেই ঘটিয়েছিল এমন মন্তব্যও করে থাকেন। যা খুবই দুঃখজনক ও অযৌক্তিক। এসব ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ না করে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়।
সরকারী বা বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা যদি দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলেন, তাদের পথ অনুসরণ করে তৃণমূলের নেতা কর্মীরাও। ফলে মাঠ পর্যায়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে।
রাজনীতি হলো মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য নিজেকে ব্রত করা। মানুষের কল্যাণে রাজনীতিবিদরা কাজ করবেন এটাই জনগন বোঝেন ও জানেন। এজন্য রাজনীতিবিদকে বুদ্ধিমত্তার সাথে কথা বলতে হবে, কাজ করতে হবে। একজন রাজনীতিবিদকে জনগণ ও দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করে দেশের পক্ষে কথা বলতে হবে। কিন্তু বর্তমান রাজনীতিতে বেশির ভাগ নেতাকর্মীদের মধ্যে অসততা, দুর্নীতি, অতিকথন ও হিংসাপরায়ণের নীতিই পরিলক্ষিত হচ্ছে। সে কারণে জনগণ রাজনীতিবিদদের উপর আস্থা হারাচ্ছে। মেধাবী ও শিক্ষিতরা রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেনা।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনে উদ্যোগ নেন। কিন্তু পঁচাত্তর সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারের হত্যার পর দেশের উন্নয়ন থমকে দাঁড়ায়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সামরিক সরকার দেশ পরিচালনা করেছে। জনগণের সমীহ আদায় করতে সামরিক লেবাসে রাজনৈতিক দল গঠন করলেও দেশের উন্নয়নে দৃশ্যমান তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। কিন্তু পরবর্তীতে চার মেয়াদে বঙ্গবন্ধুকন্যা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার সুবাদে তাঁর বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশের ব্যাপক উন্নতি হয়। বঙ্গবন্ধুকে পঁচাত্তরে হত্যা করা না হলে দেশ যে অনেক এগিয়ে যেতো তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনাকে তাঁর সহকর্মীরা রাষ্ট্রপরিচালনায় যদি সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন তাহলে যে স্বপ্ন নিয়ে শেখ হাসিনা এগিয়ে যাচ্ছে তাঁ বাস্তবায়ন করা খুব একটা কষ্ট হবেনা।
শেখ হাসিনার পদাঙ্ক অনুসরণ করে একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে। যে প্রজন্ম দেশ গড়ার কাজে নিজে সম্পৃক্ত করবে। তরুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের। দেশের স্বার্থ সংরক্ষণে তাদেরকে সবসময় দেশের পক্ষে কথা বলতে হবে। সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা ও খারাপ কাজে ভুল শুধরিয়ে দিতে হবে। দেশের নিরাপত্তা ও স্বার্থ বিষয়ক যেকোন ইস্যুতে সরকার ও বিরোধীদলকে একমত হতে হবে। তাদের অনুসারী নতুন প্রজন্মও নিজেদের সেভাবে গড়ে তুলবে। তরুন প্রজন্ম থেকে মেধাবী প্রতিনিধিরা রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না হলে মাস্তানরাই রাজনীতির নেতৃত্বে আসবে। তখন দেশের এই উন্নয়নের ধারবাহিকতায় ছেদ পড়বে।
প্রত্যেক রাজনৈতিক দলে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার কর্মসূচি থাকতে হবে। যাতে স্ব স্ব দলের আদর্শকে ধারণ করে নিজেকে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে দীক্ষা নিতে পারে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিবিদদের ইতিবাচক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। যাতে নতুন প্রজন্ম থেকে মেধাবী নেতৃত্ব সৃষ্টির সুযোগ তৈরী হয়। আগামীতে আমাদের রাষ্ট্রপরিচালনায় যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠুক এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
-মিয়া মনসফ, যু্গ্ম সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী(এমএনএ)
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

