Don't Miss
Home / আইন আদালত / রাজন হত্যার দায়ে চার আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল

রাজন হত্যার দায়ে চার আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল

এমএনএ রিপোর্ট : সিলেটের সবজিবিক্রেতা শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন হত্যার দায়ে চার আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি তিন আসামির সাত বছর করে কারাদণ্ড ও দুই আসামির এক বছর করে সাজার রায় বহাল রেখেছেন আদালত। তবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া এক আসামির সাজা বদলে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

আজ মঙ্গলবার বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।

রাজন হত্যা মামলার রায় পড়ার আগে হাইকোর্টের বিচারক বিচারপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম জানান, বিচারের ক্ষেত্রে ধনী-গরিব সবাই সমান।

তিনি বলেন, কোন মামলায় রায় দেয়ার পর, ঐ রায়ে মামলার একটি পক্ষ বা উভয় পক্ষই অসন্তুষ্ট হতে পারে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় না পড়ে বা না জেনে রায় নিয়ে কোন মন্তব্য করা উচিত নয়।

আজ মঙ্গলবার সিলেটের চাঞ্চল্যকর শিশু রাজন হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় ঘোষণার পূর্বে তিনি এ কথা বলেন।

বিচারপতি সেলিম বলেন, আমরা বিচারক, এ দেশেরই মানুষ। আমরা সব সময় নিজেদের মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করে থাকি। যাতে ন্যায় বিচার নিশ্চিত হয়।

এ সময় তিনি লর্ড ডেনিং এর একটি উক্তির কথা স্মরণ করে বলেন, ‘জাজ সুড নট কম্প্রোমাইজ’ এই বাক্যটি সব সময় স্মরণে রেখে আমি আমার দায়িত্ব পালন করে থাকি। অপরাধ কখনো ধনী-গরিব দেখে হয় না। প্রতিটি মামলাই বিচারকের কাছে সমান। সাধারণ জনগণের মধ্যে ইমোশন থাকতে পারে। কিন্তু বিচারকের নয়।

তিনি আরো বলেন, যদি কেউ কোন মামলার রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়, তার আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আমরা যখন বিচার করি, তখন ধনী-গরিব সবাই আমাদের কাছে সমান। এটা সকলেরই মনে রাখা উচিত। কিন্তু যখন দেখি, কোন জ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী পূর্ণাঙ্গ রায় না দেখেই বিভিন্ন কথা বলেন, তখন কষ্ট লাগে। কারণ আমরা বিচারক, আমরা এর জবাব দিতে পারি না।

এরপরই বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারক বিচারপতি মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন রাজন হত্যা মামলার রায় পড়া শুরু করেন। বিচারিক আদালতের রায়ে রাজন হত্যা মামলায় ১০ আসামির মধ্যে সৌদি আরবে আটক কামরুল ইসলাম (২৪) সিলেট মহানগরীর জালালাবাদ থানার পীরপুর গ্রামের প্রয়াত মনু উল্লাহর ছেলে সাদিক আহমদ ময়না ওরফে চৌকিদার ময়না মিয়া (৪৫), শেখপাড়া গ্রামের সুলতান মিয়ার ছেলে তাজউদ্দিন আহমদ বাদল (২৮) ও সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামের ওলিউর রহমানের ছেলে মো. জাকির হোসেন পাভেল আহমদ ওরফে রাজুর ফাঁসির আদেশ হয়। তাঁদের সেই আদেশ বহাল রয়েছে।।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ময়না চৌকিদারকে অপর দু’টি ধারায় দেওয়া পৃথক পৃথকভাবে সাত বছর ও এক বছর করে কারাদণ্ডাদেশও বহাল রয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের ভিডিওচিত্র ধারণকারী নূর মিয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কমিয়ে ছয়মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত ১০ জনের মধ্যে অন্য ৯ জনকে বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজার পুরোটাই বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।

বহাল রয়েছে কামরুলের দুই ভাই মুহিত আলম ও আলী হায়দার ওরফে আলী এবং পলাতক আসামি শামীম আহমদের সাত বছর করে কারাদণ্ড এবং অন্য দুই আসামি শেখপাড়া গ্রামের প্রয়াত আলাউদ্দিন আহমদের ছেলে দুলাল আহমদ ও দোয়ারাবাজারের জাহাঙ্গীরগাঁওয়ের মোস্তফা আলীর ছেলে আয়াজ আলীকে এক বছর করে কারাদণ্ডের রায় বহাল রাখা হয়।

দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে দশ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং অনাদায়ে ৩ মাস করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত, যা বহাল রেখেছেন উচ্চ আদালত।

১৩ আসামির মধ্যে ৩ জনকে দেওয়া খালাসও বহাল রয়েছে। ফলে অপরাধ সন্দেহজনকভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস পেয়েছেন ফিরোজ মিয়া, আজমত আলী ও রুহুল আমিন।

পলাতক পাভেল আহমেদ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর তিন আসামি আপিল ও জেল আপিল করেন। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নূর মিয়ার আপিলও ছিল। ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আসামিদের করা আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি শেষে এ রায় দেওয়া হয়।

বেলা সোয়া ১১টা থেকে ১২টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত দেওয়া হাইকোর্টের এ দীর্ঘ রায়ে রায়ের প্রতিক্রিয়ায় নিহত রাজনের বাবা শেখ মো. আজিজুর রহমান আলম বলেন, তিনি রায়ে সন্তুষ্ট। ন্যায়বিচার পেয়েছেন। তাঁর প্রত্যাশা, দ্রুত আসামিদের দণ্ড কার্যকর হোক।

২০১৫ সালের ০৮ জুলাই সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চুরির অভিযোগ তুলে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় সদর উপজেলার কান্দিরগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামের শেখ মো. আজিজুর রহমান আলমের ছেলে রাজনকে। হত্যাকারীরাই সেই নৃশংস নির্যাতনের ২৮ মিনিটের একটি ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিলে তা নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর মহানগরীর জালালাবাদ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বাদী হয়ে মুহিত আলমসহ অজ্ঞাত ৪/৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে গিয়ে হত্যাকারীদের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার অভিযোগে বরখাস্ত হন জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন, এসআই জাকির হোসেন ও আমিনুল ইসলাম।

মামলার মূল আসামি কামরুল ইসলাম ওই ঘটনার পর পালিয়ে সৌদি আরবে চলে যান। পরে ভিডিও দেখে প্রবাসীদের সহযোগিতায় তাকে আটক করা হয়। এরপর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

পরবর্তীতে তদন্ত শেষ করে সৌদি আরবে আটক কামরুল ইসলামসহ ১৩ আসামিকে অভিযুক্ত করে ওই বছরের ১৬ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এ হত্যা মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর সুরঞ্জিত তালুকদার।

মাত্র ১৭ কার্যদিবস বিচারিক কার্যক্রম শেষে ওই বছরের ০৮ নভম্বের সিলেট মহানগর দায়রা জজ আকবর হোসেন মৃধার আদালত রাজন হত্যার দায়ে মূল আসামি কামরুলসহ ৪ আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। ১৩ আসামির মধ্যে একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, তিনজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড ও ২ জনকে এক বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। খালাস দেওয়া হয় তিনজনকে।

রায়ের দু’দিন পরে এ মামলার ডেথ রেফারেন্স পৌঁছে হাইকোর্টে। পরে আপিল করেন দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন।

পেপারবুক তৈরির পর গত বছর মামলাটি শুনানির জন্য কার্যতালিকাভূক্ত হয়।

গত ৩০ জানুয়ারি এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হয়।

শুনানি শেষে গত ১২ মার্চ রায়ের দিন ১১ এপ্রিল ধার্য করেন হাইকোর্ট।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জহিরুল হক জহির, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আতিকুল হক সেলিম ও বিলকিস ফাতেমা। আসামিপক্ষে ছিলেন এস এম আবুল হোসেন, বেলায়েত হোসেন শাহরিয়ার ও শহিদ উদ্দিন চৌধুরী। পলাতক এক আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী ছিলেন হাসনা বেগম।

x

Check Also

এক মামলায় জামিন পেয়েছেন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী

আদালত প্রতিবেদক সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী একটি মামলায় জামিন পেয়েছেন। রোববার (১২ এপ্রিল) ঢাকা ...