Don't Miss
Home / হোম স্লাইডার / শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট: উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য সতর্ক বার্তা
শ্রীলঙ্কা

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট: উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য সতর্ক বার্তা

এমএনএ ফিচার ডেস্কঃ দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কা এখন ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পতিত হয়েছে। সংকট এত তীব্র হয়ে উঠেছে যে, দ্রুত এটি মানবিক সংকটে পরিণত হতে চলেছে। দেশটিতে বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভ নেই। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে প্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানী করা যাচ্ছেনা।

মুদ্রাস্ফীতির কারণে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য দশ গুণের বেশি অর্থ দিয়ে কিনতে হচ্ছে শ্রীলঙ্কার জনগনকে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাড়িয়েছে যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনাবাহিনী ডাকতে হয়েছে। রাজপথে মানুষ বিক্ষোভ করছে। কারফিউ দিয়েও আন্দোলন থামানো যাচ্ছেনা। খুব দ্রুত শ্রীলঙ্কা সরকার এই পরিস্থিতি থেকে ‍উত্তোরণের উপায় খুঁজে না পেলে, সব চেষ্টাই ব্যর্থ হবে। শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতি অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি সতর্ক বার্তা বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।

অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় ব্যর্থতার জন্য ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কার মন্ত্রিপরিষদের ২৬ সদস্য পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন রাষ্ট্রপতির কাছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে ও তার ভাই প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে স্ব পদে বহাল ছিলেন। সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীরা রাজাপাকসে পরিবারের পদত্যাগ দাবি করে রাজপথে বিক্ষোভ অব্যহত রেখেছে। অন্যথায় মন্ত্রী পরিষদের পদত্যাগ অর্থহীন বলে মনে করছে আন্দোলনকারীরা। দেশের জনগণ মনে করে শ্রীলঙ্কার বর্তমান অবস্থার জন্য রাজপাকসে পরিবার দায়ী।

বৈদেশিক মুদ্রার গুরুতর ঘাটতির কারণে রাজাপাকসে সরকার জ্বালানীসহ প্রয়োজনীয় আমদানীর জন্য অর্থ প্রদান করতে না পারার কারণে জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। যার ফলে দৈনিক ১৩ ঘন্টা পর্যন্ত অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকছে দেশটি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাথে ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনার আগে গত মাসে দেশটি তার মুদ্রার তীব্র অবমূল্যায়ন করার ফলে সাধারণ শ্রীলঙ্কানরাও ঘাটতি এবং মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলা করছে। শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি গোটাবায়া রাজাপাকসের ২২ মিলিয়ন লোকের দ্বীপরাষ্ট্রে একটি গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ সহিংসতায় পরিণত হয়েছে। পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে বিক্ষোভকারীরা । আগামী দিনে এই ধরনের সহিংসতা আরও তীব্র হতে পারে।

সমালোচকরা বলছেন শ্রীলঙ্কার বর্তমান সংকট সরকারের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার একমাত্র কারণ। কিন্তু বর্তমান সঙ্কটটির সূত্রপাত ২০১৯ সালের নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় যখন রাজাপাকসে জনগনকে কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যা কোভিড-১৯ সংক্রমণের কয়েক মাস আগে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। ফলে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ে। করোনা মহামারীর কারণে বিপর্যস্থ হয়ে পড়ে দেশের লাভজনক পর্যটন শিল্প। বিদেশী কর্মীদের রেমিট্যান্স নিম্নমুখী হয় আশংকাজনকভাবে। ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলি শ্রীলঙ্কার নিম্নমুখী অর্থনৈতিক সূচকের মুখে দেশটিকে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে লক করে দেয়। দেশটিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দুই বছরে প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে।

ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত, দেশটির রিজার্ভে মাত্র ২.৩১ বিলিয়ন ডলার অবশিষ্ট ছিল। কিন্তু ২০২২ সালে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে ১ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড (আইএসবি) যেটি জুলাই মাসে পরিপক্ক হবে। শ্রীলঙ্কাকে বৈদেশিক ঋণ প্রদানকারীদের মধ্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক, জাপান এবং চীন প্রধান।

বিশেষজ্ঞ ও বিরোধীদের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও কয়েক মাস ধরে, রাজাপাকসের প্রশাসন এবং সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ শ্রীলঙ্কা (সিবিএসএল) আইএমএফের সাহায্য প্রত্যাশী হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে তেলের দাম বেড়ে যায়। সরকার এপ্রিলে আইএমএফের কাছে ঋণ গ্রহনের পরিকল্পনা তৈরি করে। আইএমএফ আগামী দিনে সম্ভাব্য ঋণ কর্মসূচি বিষয়ে শ্রীলঙ্কার কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা শুরু করবে। আইএমএফ-এর কাছে যাওয়ার আগেই, শ্রীলঙ্কা তার মুদ্রার তীব্র অবমূল্যায়ন করেছে।  মুদ্রাস্ফীতির ফলে জনগনের কষ্ট বেড়েছে। এতে জনগনের মধ্যে অসন্তোষ দিন দিন দানা বাধছে।

২০০০-এর গোড়ার দিকে, শ্রীলঙ্কা চীনের নিজস্ব প্রবৃদ্ধির মডেলের আদলে দ্বীপ রাষ্ট্রটির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে একটি অবকাঠামো কেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি মডেল গ্রহণ করে এবং শ্রীলঙ্কা তার অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থের জন্য চীনের দিকে ঝুঁকে। প্রতিবেদন অনুসারে, চীন ২০০৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার অবকাঠামো প্রকল্পে ১২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং কলম্বো পোর্ট সিটির মতো অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন অব্যাহত রেখেছে যা চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এন্টারপ্রাইজ দ্বারা নির্মিত হচ্ছে।

প্রকল্পটি ২০৪৩ সালে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে, অর্থাৎ শ্রীলঙ্কার প্রায় দুই দশক ধরে এই প্রকল্প থেকে কোনো রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। শেষ হওয়ার পরেও, পুনরুদ্ধার করা জমির ৪৩% চীনকে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হবে কারণ শ্রীলঙ্কার কাছে এটির অর্থায়নের অন্য কোনও উপায় নেই।

একটি দুষ্টচক্রের কারসাজিতে শ্রীলঙ্কা মূলত: তাদের অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য চীন থেকে অর্থ্ ধার করেছে। এই ঋণ তাদের পক্ষে ফেরত দেওয়া সহজ নয়। ফলে শ্রীলঙ্কাকে প্রকল্পগুলোর নিয়ন্ত্রণ চীনের কাছে ছেড়ে দিতে হয়েছে বা চীনের অর্থ ফেরত দিতে অন্য কোন উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে।

এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় শ্রীলঙ্কা ঋণ পুনর্গঠন বা ক্রেডিট লাইন বাড়ানোর জন্য চীনের কাছে আবেদন জানালেও চীন তাতে সাড়া দেয়নি। এর কারণ চীনের কাছ থেকে অর্থ ধার করা অন্যান্য দেশের জন্যও একটি খারাপ নজির স্থাপন করবে।

শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। যে কোন সংকট শুরুর প্রারম্ভিক লক্ষণ আগেই দেখা যায়। আর লক্ষণ দেখা মাত্রই যথাযথ ব্যবস্থা নিলে তা সহজে মোকাবেলা করা যায়। অতিরিক্ত সরকারী ব্যয় শ্রীলঙ্কায় দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার অন্যতম কারণ।

শ্রীলঙ্কায় চলমান অর্থনৈতিক মন্দা থেকে প্রথম যে শিক্ষা পাওয়া যায় তা হল রাতারাতি কোনো সংকট তৈরি হয় না। যে কোনো সঙ্কট আঘাত হানার অনেক আগেই সেই সংকটের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। লক্ষণ দেখা মাত্রই যথাযথ ব্যবস্থা নিলে যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব। ক্রমবর্ধমান ঋণ মোকাবেলা ও অত্যধিক ব্যয়ের কারণে দেশটি আজ দেওলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।

বিগত বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কা সরকার যেসব বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে তার বেশীরভাগই আর্থিকভাবে লাভজনক হয়নি। এসব প্রকল্প নিজেদের অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বিধায় ঋণ নিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্ত ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে শ্রীলঙ্কা সরকার। এগুলো তাই যেন গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে শ্রীলঙ্কা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে পারতো। অর্থনৈতিকভাবে সুফল আনবে এমন সরকারি ব্যয়, রপ্তানিতে বৈচিত্র্য এবং ঋণের উপর কম নির্ভরতা হওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কার সরকার ভুল পথে চলে দীর্ঘদিন ধরে এসব পরিকল্পনাগুলোকে উপেক্ষা করেছে।

তদুপরি, শ্রীলঙ্কাকে তার স্বাধীনতার পর কয়েক দশক ধরে গৃহযুদ্ধ মোকাবেলা করতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় সরকারকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। তাছাড়া অনেক বিদেশী শক্তি শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। তাই তাদের অর্থনীতির বিকাশ ও টিকিয়ে রাখতে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশ বা এমনকি ভারতের মতো দেশের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থায় ছিল। তাদের জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষিত। এতদসত্ত্বেও তাদের সংকট দিন দিন তীব্রতর হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার ট্র্যাজেডি অনেকের জন্য শিক্ষনীয়। দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের জন্যও বেশ কিছু শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। একটি স্থিতিশীল ও ধারাবাহিক সরকারই পারে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে। দ্বিতীয়ত, আমাদের অবশ্যই বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলি থেকে অর্থনৈতিকভাবে সুফল পেতে হবে এবং এগুলোকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ যে ঋণ নেয় তা এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত যাতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাবর্তন অবশ্যই খরচের চেয়ে বেশি এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে কারণ, বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে এবং প্রকল্পগুলো চলমান রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যাতে দুর্নীতিমুক্ত থাকে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো হরহামেশা অভিযোগ করে থাকে যে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতির কারণে ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং সুনির্দ্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়না।

আমরা বিশ্বাস করি, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প দুর্নীতিমুক্ত করা হলে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা রোধ করা গেলে, প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে ব্যবহৃত হলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে নিরাপদ থাকবে। এছাড়া  রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকার পাশাপাশি বিদের্শী ঋণ নির্ভরতা অনেকাংশে কমিয়ে আনতে হবে।  বিদেশী ঋণ ছাড়া যে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায় পদ্মাসেতু তার বড় প্রমাণ।

বর্তমান শ্রীলঙ্কা পরিস্থিতি বিশ্বের সমস্ত উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি নজির হিসাবে এসেছে এবং আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোকে শ্রীলঙ্কার বর্তমান গুরুতর পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক পথে থাকতে হবে। শ্রীলঙ্কার এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি থেকে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিক্ষা নেওয়া উচিত। আমরা আশা করি শ্রীলঙ্কা শীঘ্রই এই মানবিক সংকট কাটিয়ে উঠবে এবং শ্রীলঙ্কার মানুষ আবার তাদের সুন্দর শান্তির নীড় খুঁজে পাবে।

লেখক: মিয়া মনসফ, যুগ্ম সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ)

x

Check Also

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত চালুতে সরকারের জোর তৎপরতা: উপদেষ্টা মাহদী

এমএনএ প্রতিবেদক মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় চালু করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে ...