এমএনএ প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পাওয়ার পর সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নকে ঘিরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভেতরে তৎপরতা শুরু হয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। অনেকেই বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, দলীয় আনুগত্য ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার বিবরণসহ প্রোফাইল নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পাঠাচ্ছেন। কেউ কেউ প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগও করছেন।
তবে বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, “সংরক্ষিত মহিলা আসনের মনোনয়নের বিষয়টি ঈদের আগে চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।”
জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি। প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি করে সংরক্ষিত আসন বণ্টন করা হয়। আসন অনুপাতে বিএনপি পাবে ৩৫টি আসন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পাবে ১১টি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাবে ১টি আসন। বাকি ৩টি আসন স্বতন্ত্র ও ছোট দলগুলোর মধ্যে বণ্টিত হবে। এসব দলের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণ অধিকার পরিষদ ও খেলাফত মজলিস।
আইন অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের সরকারি গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে মনোনয়ন, বাছাই, প্রত্যাহার ও ভোটের তারিখ নির্ধারণ করবে। বিজয়ীদের গেজেট ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে। সে হিসাবে ১৪ মার্চের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবার নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে তালিকা হতে পারে, যেখানে তরুণদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
প্রবীণদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শিরিন সুলতানা, রেহানা আক্তার (রানু), ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, সংগীতশিল্পী বেবী নাজনীন, নিলুফার চৌধুরী (মনি), বিলকিস ইসলাম, শাম্মী আখতার, সৈয়দা আসিফা আশরাফী (পাপিয়া), রাশেদা বেগম (হীরা), রোখসানা খানম, আয়েশা সিদ্দিকা, নেওয়াজ হালিমা, ফরিদা ইয়াসমীন, হেলেন জেরিন, আইনজীবী শাকিলা ফারজানা, স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রয়াত সভাপতি শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন, চট্টগ্রাম মহিলা দলের মনোয়ারা বেগম (মনি) ও দক্ষিণের আহ্বায়ক রুমা আক্তার।
বেবী নাজনীন বলেন, “আমরা দৌড়ঝাঁপ করছি না। তবে যাঁরা এ পদ দাবি করার যোগ্য, অবশ্যই তাঁদের নাম লিখবেন।”
ছাত্রদলের সাবেক নেত্রীদের মধ্যেও অনেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। তাঁদের মধ্যে মহিলা দলের সহ–স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক আসমা আজিজ, সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সুলতানা জেসমিন (জুঁই), ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব নাসিমা আক্তার (কেয়া), খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষক রোকেয়া চৌধুরী এবং কোতোয়ালি থানা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর সুরাইয়া বেগম রয়েছেন। সাবেক ছাত্রদল নেত্রী সুলতানা জেসমিন বলেন, “রাজনীতিতে শ্রম ও ঘামের পাশাপাশি একাডেমিক যোগ্যতার সংমিশ্রণ দরকার।”
নিপুণ রায় চৌধুরী বলেন, “যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী নেতা সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে নারীর নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও মাঠের ভূমিকা বিবেচনা করেই মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন।”
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-ও সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। দলীয় সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের মধ্য থেকে প্রার্থী বাছাইয়ের চিন্তাভাবনা রয়েছে। আলোচনায় আছেন কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, আইন ও মানবসম্পদ বিভাগীয় সেক্রেটারি আইনজীবী সাবিকুন্নাহার, সহকারী সেক্রেটারি মার্জিয়া বেগম এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক মারদিয়া মমতাজ। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একজনকেও মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দলের নায়েবে আমির ও বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, “আমরা মনোনয়ন ঠিক করছি। সংসদে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেন, এমন উপযুক্ত নারীদের মনোনয়ন দেব।” সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাছুম জানান, মহিলা বিভাগ থেকে খসড়া তালিকা চাওয়া হয়েছে এবং সংসদের প্রথম অধিবেশনের আগেই তা চূড়ান্ত করা হবে।
এনসিপি একটি আসন পাবে। এ পদের জন্য আলোচনায় আছেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ও দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মাহমুদা আলম (মিতু)।
এবারের নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৬ জন। তাঁদের মধ্যে ৭ জন জয়ী হয়েছেন—৬ জন বিএনপির এবং ১ জন স্বতন্ত্র। সংরক্ষিত ৫০টি আসন যুক্ত হলে ৩৫০ সদস্যের সংসদে নারী সদস্যের সংখ্যা হবে ৫৭, যা প্রায় ১৬ শতাংশ।
দলীয় ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন ও নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য এখনো পর্যাপ্ত সময় রয়েছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

