সংসদ প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১২তম দিনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ২১টি অধ্যাদেশ অবিকল রেখে সংশ্লিষ্ট বিল পাস করেছে জাতীয় সংসদ। একই সঙ্গে বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট তিনটি অধ্যাদেশ রহিত করে পৃথক বিলও পাস করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর এসব বিল আইনে পরিণত হবে।
দিনভর আইন প্রণয়ন কার্যক্রমের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, মতভেদ এবং শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের ওয়াকআউট সংসদের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলে।
সংসদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা ধারাবাহিকভাবে বিলগুলো উত্থাপন করেন এবং কণ্ঠভোটে পাস হয়। পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) বিল; জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬; বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন (সংশোধন) বিল; শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (সংশোধন) বিল; বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) বিল; পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) বিল; বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) বিল; বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল; স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) ও (পৌরসভা) সংশোধন বিল; আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) বিল; ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা বিল; বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ ও গ্যাস সংশোধন বিল; মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন বিল; বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন সংশোধন বিল; মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ বিল; বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ বিল; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার সংশোধন বিল; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ ট্রাস্ট সংশোধন বিল; ও জেলা পরিষদ সংশোধন বিল।
এসব আইনের মাধ্যমে প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, শ্রম, জ্বালানি, অভিবাসন, পরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনার পথ সুগম হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সংসদ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইন পাস করেছে। এগুলো হলো— সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬; সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল, ২০২৬।
এতে বিচার বিভাগীয় কাঠামো ও মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রমে নতুন বিন্যাস আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দিনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) সংশোধন বিল। বিলটিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে।
বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেন, “একাত্তরে কার কী ভূমিকা ছিল, আল্লাহই ভালো জানেন। আমরা সবাই আংশিক সাক্ষী।”
তিনি দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা ও ‘সহযোগী’ তালিকা পুনর্বিবেচনা করা উচিত এবং রাজনৈতিক দলকে এভাবে চিহ্নিত করা বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে।
সংসদের বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলকে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা “যুক্তিযুক্ত নয়” এবং এটি সংশোধন করা প্রয়োজন।
তবে জোটের শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিলটির ওপর কোনো আপত্তি নেই বলে জানায়। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
পাস হওয়া আইনে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে— ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বাধীনতার লক্ষ্যে পরিচালিত যুদ্ধই ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং যেসব ব্যক্তি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বা মুক্তিবাহিনীর অংশ ছিলেন—তাঁদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এতে সশস্ত্র বাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্সসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দিনের কার্যক্রমের এক পর্যায়ে সন্ধ্যা ৫টা ৫৬ মিনিটে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “গণবিরোধী বিলগুলো পাস হয়েছে, এর দায় আমরা নিতে চাই না।”
তিনি ও তাঁর জোটের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
ওয়াকআউটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিরোধীরা আইন প্রণয়নের প্রতিটি ধাপে অংশগ্রহণ করেছে—ফার্স্ট রিডিং থেকে থার্ড রিডিং পর্যন্ত। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সমর্থনও দিয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “সমস্ত প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে শেষে ওয়াকআউটের যৌক্তিকতা কতটুকু?”
একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিরোধীরা পুনরায় অধিবেশনে যোগ দেবে।
দিনের কার্যক্রমে একদিকে দ্রুত আইন পাসের মাধ্যমে সরকার তার নীতিগত অগ্রগতি বজায় রাখে, অন্যদিকে বিরোধীরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও বিতর্কের ঘাটতির অভিযোগ তোলে।
বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা ও ঐতিহাসিক দায় নির্ধারণের প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজন আবারও স্পষ্ট হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এসব আইন কার্যকর হলে দেশের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার ও সামাজিক খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

