Don't Miss
Home / সারাদেশ / সেনাবাহিনীর ব্রিফিংস্থলের কাছে বিস্ফোরণ, নিহত ৬

সেনাবাহিনীর ব্রিফিংস্থলের কাছে বিস্ফোরণ, নিহত ৬

সিলেট ব্যুরো অফিস : সিলেট মহানগরের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ি এলাকায় সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানা ‘আতিয়া মহল’ ঘিরে অভিযান চলাকালে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ও রাতে দুই দফা বোমা বিস্ফোরণে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয়জনে। এর মধ্যে দুজন পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। বাকি চারজন বেসামরিক নাগরিক।

এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ভোর চারটা অবধি পাওয়া তথ্য মোতাবেক নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। একজন হলেন সিলেট মহানগর পুলিশের পরিদর্শক চৌধুরী মো. আবু কয়সর। আরেকজন হলেন সিলেট নগরীর ঝালোপাড়া চাঁদনীঘাট এলাকার সিরাজুল ইসলাম আওলাদের পুত্র ওয়াহিদুল ইসলাম অপু (২৬)। তিনি মদনমোহন কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগের কর্মী বলে জানিয়েছেন তাঁর বন্ধু জয়শর্মা চৌধুরী। বন্ধুর ভাষ্য, দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে ওয়াহিদুল সবার বড়।

এছাড়াও নগরীর দাঁড়িয়াপাড়ার বাসিন্দা ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম (৩৮)। তিনি নেত্রকোনার পূর্বধলার ইছুলিয়া গ্রামের ব্যবসায়ী এবং দক্ষিণ সুরমা উপজেলা ছাত্রলীগের উপ পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ইসলাম ফাহিম এবং অজ্ঞাত পরিচয়ের আরও দু’জন।

গতকাল শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ওসমানী হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রুহুল আমিন বলেন, দুই দফা বিস্ফোরণে আহতদের মধ্যে এখন হাসপাতালে ৪৩ জন আছেন। এ ঘটনায় নিহত চারজনকে মৃত অবস্থায় এই হাসপাতালে আনা হয়। তিনি বলেন, বিস্ফোরণে আহত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে একজন একটি বেসরকারি হাসপাতালে চলে গেছেন। রুহুল আমিন জানান, বিস্ফোরণের ঘটনার পর হাসপাতালের সবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রথম দফা বোমা বিস্ফোরণে ফারুক, সিরাজ, আলম, বক্কর, আব্দুর রহিম, জুয়েল, রুবেল, রনি, সৈয়দ আলী, সুলেমান, মোসতাক, কানু দাস, আজমল আলী ও সেলিমসহ অজ্ঞাত কয়েকজন আহতরা হয়েছে।

দ্বিতীয় দফা বিস্ফোফরণে দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি শাহ হারুনুর রশীদসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর আরও কয়েক সদস্য আহত হয়েছেন।

আহতদেরকে তিনটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

ওসমানী হাসপাতালের উপপরিচালক দেবপদ রায় বলেন, তাদের হাসপাতালে চারজনের মরদেহ আছে। এর মধ্যে একজন পুলিশ কর্মকর্তা ও তিনজন বেসামরিক নাগরিক।

গত রাত ৯টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎক সুবল জ্যোতি চাকমা জানিয়েছেন, আহত ৪৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে অপু নামের একজনের লাশ রয়েছে। অপর একজন ক্লিনিক্যালি ডেড।

পরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত আরেক চিকিৎক ডা. তারেক আহমেদ চারজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেন। মধ্যরাতের পর আরও দু’জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।

বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, আহতদের মধ্যে পুলিশসহ অন্তত ৪৩ জন সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছে। এর মধ্যে বেসামরিক নাগরিক শিরিন মিয়া, জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ও দক্ষিণ সুরমা থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) জনি লাল দের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গুরুতর আহতদের মধ্যে র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদকে গত রাত সাড়ে ১০টার দিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় পাঠানো হয় বলে হাসপাতাল সূত্রে এ খবরের সত্যতা জানা গেছে।

সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এবং পুলিশ ও সোয়াতের সহায়তায় চলা ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ নিয়ে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ব্রিফিং করা হয়। ব্রিফিং শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট পর সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে ব্রিফিংস্থলের কাছে বোমা বিস্ফোরণের ঘটে। এতে সাংবাদিকসহ ৩০ জনের বেশি আহত হন। এরপর রাত সাতটা ৫৫ মিনিটের দিকে আগের ঘটনাস্থলের কাছে পূর্ব পাঠানতলা মসজিদ এলাকায় আরেকটি বোমার বিস্ফোরণ হয়। ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ হতাহতের ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে একটি মোটরসাইকেলে করে দুই যুবক ব্রিফিংস্থলের কাছাকাছি পৌঁছান। তখন বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে দুই যুবক ছিটকে পড়েন। এরপর আরেকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। যুবকদের সঙ্গে রাখা ব্যাগে বোমা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত রাত পৌনে নয়টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পুলিশসহ ৪৮ জনকে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

অভিযানে থাকা সেনা সদর দপ্তরের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফখরুল আহসান ব্রিফিংয়ে বলেন, তারা ওই ভবন থেকে ৭৮ জনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে। ভেতরে জঙ্গিদের অবস্থান রয়েছে। তাই তাদের অভিযান চলমান আছে। আজ রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযান সমাপ্ত করা হবে। গতকাল অভিযান চলাকালে জঙ্গিরা ১০-১২টি শক্তিশালী বিস্ফোরক ব্যবহার করেছে।

এর আগে বিকেল পর্যন্ত দফায় দফায় গুলি আর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। গতকাল বেলা পৌনে তিনটার দিকে আহত অবস্থায় শিবুল মালাকার (২৭) নামের একজনেক সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা বলেন, সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানার কাছে বেলা দুইটার একটু পর থেকে প্রায় সাড়ে তিনটা পর্যন্ত থেমে থেমে গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এরপর প্রায় দেড় ঘণ্টা এমন কোনো শব্দ হয়নি। বিকেল পাঁচটা থেকে আবার গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় অনেকক্ষণ। এর আগে ওই বাড়ির প্রাঙ্গণে ঢুকে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, শিববাড়ির কাছেই পৈতপাড়া এলাকার বসন্ত মালাকারের ছেলে শিবুল। তিনি ঘটনাস্থলের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর ফটো স্টুডিওর ব্যবসা আছে। অভিযান চলাকালে তিনি আহত হন।

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সূত্রে জানা গেছে, আহত ব্যক্তিকে গতকাল বেলা পৌনে তিনটার দিকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম সাংবাদিকদেরকে বলেন, ওই ব্যক্তির শরীরের পেছনের দিকে গুলি লেগেছে। তাঁর অবস্থা শঙ্কামুক্ত। তিনি বর্তমানে হাসপাতালের চারতলায় সার্জারি ওয়ার্ডের ৪ নম্বর বেডে আছেন।

আটকে পড়া বাসিন্দাদের উদ্ধারের কাজ শেষ বলে গতকাল বেলা সোয়া একটার দিকে জানিয়েছেন জালালাবাদ সেনানিবাসের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের এক কর্মকর্তা।

গতকাল বেলা সোয়া ১১টার দিকে উদ্ধারকাজের বর্ণনা দিয়ে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, সেনাবাহিনীর কমান্ডো দল আতিয়া মহল নামের ওই বাড়ির বাসিন্দাদের বের করে আনে। আতিয়া মহল ও তার পাশের আতিয়া মহল-২ নামের আরেকটি ভবনের মাঝখানে ফায়ার সার্ভিসের মই দিয়ে সেতু তৈরি করা হয়। এই পথে সেনাবাহিনীর সহায়তায় বাসিন্দাদের বের করা হয়। সে সময় ফায়ার সার্ভিসকে বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেখা গেছে।

সকাল ১০টা ৫ মিনিটের দিকে পরপর দুটি গুলির শব্দ শোনা গেছে। এলাকার বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

জালালাবাদ সেনানিবাসের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের কর্মকর্তা গতকাল সকাল সাড়ে নয়টার একটু পরই সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ নামে অভিযান শুরুর কথা জানিয়েছিলেন। সে সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ নামে এই অভিযান সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে হচ্ছে। পুলিশ ও সোয়াত সহায়তা করছে। সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা মূল অভিযান চালাচ্ছেন। ১৭ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আনোয়ারুল মোমেন অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

অভিযান শুরু হওয়ার পরই ওই এলাকায় ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। বেলা সাড়ে ১১টার পর বৃষ্টি থেমে যায়।

সকাল আটটার দিকে ঘটনাস্থলে অভিযানের প্রস্তুতি শুরু করে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ফোর্স।

ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, পুলিশের সাঁজোয়া যান ও কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে।

গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় চালানো অভিযানেও অংশ নিয়েছিল সিলেটের জালালাবাদ থেকে যাওয়া সেনাবাহিনীর কমান্ডো দল।

জঙ্গিরা অবস্থান করছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে পাঁচতলা বাড়িটি ঘেরাও করে পুলিশ। গত শুক্রবার দিনভর বারবার মাইকে আহ্বান জানিয়েও ভেতরে থাকা জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করাতে পারেনি পুলিশ। উল্টো ভেতর থেকে গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। অভিযান চালাতে ঢাকা থেকে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াতের একটি দল গত শুক্রবার বিকেলে সিলেটে পৌঁছায়। সেদিন রাতভর বাড়িটি ঘিরে রাখা হয়। সন্ধ্যার পর সেনাবাহিনীর দুটি গাড়ি ঘটনাস্থলে যায়।

পুলিশের ধারণা, আতিয়া মহল নামের বাড়িটির নিচতলার একটি ফ্ল্যাটে সন্দেহভাজন জঙ্গিরা অবস্থান করছে। ভেতরে একজন নারী থাকার কথা নিশ্চিত হলেও মোট কতজন আছেন, সেটা জানা যায়নি। পুলিশের ধারণা, ভেতরে নব্য জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ নেতা মাইনুল ওরফে মুসা রয়েছেন।

আতিয়া মহল নামের পাঁচতলা ওই বাড়িতে মোট ২৯টি ফ্ল্যাট রয়েছে।

x

Check Also

ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬ দুর্নীতি সহায়ক, লুটেরাদের পুনর্বাসন আত্মঘাতী: টিআইবি

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক সদ্য পাস হওয়া ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনার ...