স্ত্রীর পরকীয়ায় খুন হয়েছেন পিপি রথীশ : পুলিশ
Posted by: News Desk
April 4, 2018
এমএনএ জেলা প্রতিনিধি : নিখোঁজের পাঁচ দিন পর রংপুরের বিশেষ জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর-পিপি ও আওয়ামী লীগ নেতা রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনা তার স্ত্রীর পরকীয়ার জেরে খুন হয়েছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ।
রথীশ চন্দ্রের লাশ উদ্ধারের পর গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টায় রংপুরের এএসপি মিজানুর রহমান এ দাবি করেন।
এএসপি বলেন, এ ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত। রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের স্ত্রী দীপা ভৌমিকের সহকর্মীর সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্ক ছিল। এর জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
পুলিশ বলছে, যে বাড়িতে রথীশের লাশ পাওয়া গেছে, তা দীপার সহকর্মী ও প্রেমিক তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামের ভাই খাদেমুল ইসলাম জাফরীর বাড়ি।
গতকাল মঙ্গবার রাত সোয়া ১ টার দিকে রংপুর নগরীর মোল্লাপাড়া এলাকায় একটি নির্মাণাধীন বাড়ির মেঝে থেকে তার গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ওই আইনজীবীর স্ত্রী এবং তার প্রেমিকসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রংপুরের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, স্ত্রীর পরকীয়ার কারণে রথীশ চন্দ্র ভৌমিককে খুন হতে হলো। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরো যারা জড়িত তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
দীপাকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়ে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া র্যাব-১৩ এর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর আরমিন রাব্বী জানান, রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের স্ত্রী দীপা ভৌমিকের দেয়া তথ্য মতে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, চার-পাঁচ দিন আগে হত্যার পর লাশটি নির্মাণাধীন বাড়িটিতে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল।
গত শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে নগরীর বাবুপাড়া এলাকার বাড়ি থেকে বের হয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে শহরের দিকে রওনা হয়েছিলেন রথীশ। এরপর থেকে তার সন্ধান ছিল না।
এ ব্যাপারে বাবু সোনার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয় গত ৩০ মার্চ, শুক্রবার বাবু সোনা নিখোঁজ হয়েছেন। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্তর্ধানের পর ট্রাস্টের নেতারা সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে জামায়াতে ইসলামী কিংবা জঙ্গি গোষ্ঠী কিংবা ভূমিদস্যুরা রথীশকে ধরে নিয়ে গেছে।
এরপর বিভিন্ন সংগঠন তাকে উদ্ধারে মানববন্ধন, সমাবেশ, অনশনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে।
এরপরই মাঠে নামে র্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা প্রথমেই পরকীয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে তদন্তে নামেন।
এরপর পুলিশ বাবু সোনার স্ত্রী তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা দীপা ভৌমিক ও তার প্রেমিকা একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামের মোবাইল ফোনের কললিস্ট বের করে।
কললিস্ট দেখে আঁতকে উঠেন পুলিশ। প্রতিদিন প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি ৩০ থেকে ৩৫ বার মোবাইলে কথা বলতেন।
ওই কললিস্ট দেখে সন্দেহ হলে গত সোমবার রাতে নগরীর রাধাবল্লভ এর বাড়ি থেকে তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলাম ও মতিয়ার রহমানকে আটকের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
কামরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। এরপর হত্যাকাণ্ডের তথ্য জানায় কামরুল।
এ ঘটনায় বাবু সোনার ছোট ভাই সুশান্ত ভৌমিক বাদী হয়ে কোতয়ালি থানায় একটি মামলা করেছেন।
তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন রথীশ। তার স্ত্রী দীপা এই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তৌহিদা খাতুন জানান।
গতকাল মঙ্গলবার রাতে র্যাব বাবু পাড়ার বাড়ি থেকে দীপা ভৌমিককে গ্রেপ্তার করে। তাদের দেয়া তথ্য পেয়ে র্যাব গতকাল মঙ্গলবার রাতে সোয়া একটার দিকে বাবু সোনার বাবুপাড়ার বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে মোল্লাপাড়ায় খাদেমুল ইসলাম জাফরীর নির্মাণাধীন বাড়ির মেঝে থেকে লাশটি উদ্ধার করে।
রংপুর জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান লাশ উদ্ধারের সময় উপস্থিত ছিলেন।
এরপর রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের ছোট ভাই সুশান্ত ভৌমিক, রংপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক, রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু এবং অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসেন তুহিনকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যান লাশ শনাক্তের জন্য।
লাশটি ফুলে ফেঁপে যাওয়ায় চিনতে পারছিলেন না। দুর্গন্ধে ওই এলাকায় যাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। খবর পেয়ে সাংবাদিকরাও ছুটে যান সেখানে।
এরপর সুশান্ত ভৌমিক ও জাহাঙ্গীর হোসেন তুহিন খুন হওয়া রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের পায়ের জুতা দেখে লাশ শনাক্ত করেন। পরে আজ বুধবার ভোরে লাশটি উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, রংপুর তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন রথীশ চন্দ্র ভৌমিক। ওই বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি করতেন বাবু সোনার স্ত্রী দীপা ভৌমিক ও কামরুল ইসলাম।
দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে বাবু সোনার মাঝে মাঝে ঝগড়া হতো। পরকীয়ার কারণে অশান্তি ছিল পরিবারের মধ্যে। বিষয়টি নিয়ে অনেকবার ঘরোয়াভাবে বিচারও হয়। কিন্তু তারপরও পরকীয়া থেকে ফেরাতে পারেনি স্ত্রীকে।
বাবু সোনার এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। বাড়িতে তেমন একটা লোকজন থাকতো না। বাবু সোনাও বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে গভীর রাতে বাড়িতে ফিরতেন।
র্যাব ও পুলিশ জানায়, জাপানি নাগরিক হত্যা ও মাজারের খাদেম হত্যা মামলার পিপি ছিলেন রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনা।
এছাড়াও রংপুর আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সহ-সাধারণ সম্পাদক, জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের রংপুর বিভাগের ট্রাস্ট্রি, পূজা উদযাপন পরিষদের রংপুর জেলার সভাপতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দীপা ভৌমিক তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক কামরুল ইসলামের সঙ্গে দীপার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে এলাকায় গুঞ্জন ওঠে। পরকীয়া সম্পর্কের জেরে কামরুল ও দীপা পরিকল্পিতভাবে বাবু সোনাকে হত্যার পর তার মরদেহ মাটির নিচে পুঁতে রেখেছে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা।
রংপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক বলেন, আমার সহকর্মী বাবু সোনার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আমি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। যেন কেউ আর এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে সাহস না পায়।
নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতের পিপি জাহাঙ্গীর হোসেন তুহিন বলেন, আমি বাবু সোনার জুতা দেখে চিনতে পারি। বাবু সোনা একজন ভাল মানুষ ছিলেন। তার এ ধরনের হত্যাকাণ্ড মেনে নেওয়া যায় না।
রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু বলেন, বাবু সোনা জেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। আমরা আইন শৃংখলা বাহিনীর কাছে দাবি জানাই এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
খুন হওয়া রথিশ চন্দ্র ভৌমিকের ছোট ভাই সুশান্ত ভৌমিক বলেন, আমি দাদার লাশ দেখে তাকে শনাক্ত করি। আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি চাই।
র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান রাত দেড়টায় গণমাধ্যমকে বলেন, পরিবারের উদ্যোগে গতকাল মঙ্গলবার দিনভর রংপুর শহরের বাড়ির পাশের ডোবায় তল্লাশি চালানো হয়। সেখানে একটি রক্তমাখা শার্ট পাওয়া যায়।
নতুন করে পুলিশ আরও দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এ নিয়ে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের স্ত্রী ও মেয়েসহ ছয়জন।
রংপুর পুলিশের এএসপি (সার্কেল-১) সাইফুর রহমান সাইফ বলেন, ডোবায় তল্লাশির সময় যে শার্টটি পাওয়া গেছে, সেখানে রক্তের মতো দাগ রয়েছে। কাদাপানিতে দাগটি ঠিক স্পষ্ট নয়। তাই শার্টের ‘ফরেনসিক’ পরীক্ষার পর বোঝা যাবে শার্টটি কার এবং ওই দাগ রক্তের কিনা।
তিনি আরও জানান, ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে এমন সন্দেহে তাজহাট উচ্চবিদ্যালয়ের দুই শিক্ষককে গতকাল মঙ্গলবার আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও কোনো ক্লু পাওয়া যায় কিনা তা দেখা হচ্ছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে করা মামলাটির তদন্তে নেমেছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক দল। তবে নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে নিখোঁজের ঘটনায় তদন্ত অগ্রগতি সম্পর্কে সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে বলেও ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানান।
নতুন করে আটকরা হলেন- তাজহাট উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মতিয়ার রহমান ও কামরুল ইসলাম। আইনজীবী রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের স্ত্রী দীপা সরকার তাজহাট উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। আটক অন্য ব্যক্তিরা তার সহকর্মী ও পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ। এর মধ্যে কামরুল ইসলামের সঙ্গে অতিঘনিষ্ঠতা নিয়ে পারিবারিক বিরোধ ছিল এবং এ নিয়ে প্রায় মারধরের ঘটনাও ঘটত বলে পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
পুলিশ হয়েছেন স্ত্রীর খুন পিপি পরকীয়ায় রথীশ 2018-04-04