বিশেষ প্রতিনিধি
প্রায় দুই বছর ধরে স্থবির থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর লক্ষ্যে নতুন করে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। মালয়েশিয়ার আরোপিত শর্ত, অতীতের অনিয়ম এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে এখনো অনিশ্চয়তায় রয়েছে এ গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ।
সংকট নিরসনের উদ্দেশ্যে চলতি মাসেই মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক উপদেষ্টা মাহাদী আমিন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৮ এপ্রিল এ সফর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সফরে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র ও মানবসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ছাড়াও দ্বিপাক্ষিক নানা ইস্যুতে আলোচনা হবে। যদিও এখনো পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি চূড়ান্ত হয়নি।
২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। এর ফলে প্রায় ১৮ হাজার বাংলাদেশি কর্মী, যাদের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন ছিল, শেষ মুহূর্তে যেতে পারেননি। এতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
সরকার ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো অর্থ ফেরতের দাবি তুললেও অনেক কর্মী অভিযোগ করেছেন, তারা সম্পূর্ণ টাকা ফেরত পাননি—যা এ খাতে আস্থার সংকট আরও বাড়িয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আটকে পড়া কর্মীদের পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রথম ফ্লাইট গেলেও পুরো প্রক্রিয়া এখনও ধীরগতির।
বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল প্রায় ৭,৮৭৩ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ার নির্মাণ খাতে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১৬ নভেম্বর থেকে এ বছরের ২৯ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ৮৮১ জন কর্মী ভিসা ও বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স পেয়েছেন—যা মোট চাহিদার তুলনায় খুবই কম।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে বিতর্কিত। গত ১৬ বছরে তিনবার এ বাজার বন্ধ হয়েছে। এরমধ্যে ২০০৯ সালে প্রথমবার বন্ধ হয়, পরে ২০১৬ সীমিত আকারে চালু (১০টি এজেন্সির সিন্ডিকেট) চালু হয়ে ২০১৮ সালে আবারো বন্ধ হয় দুর্নীতির অভিযোগে। ২০২২ সালে নতুন চুক্তিতে চালু হলেও আবারও সিন্ডিকেটের অভিযোগ ওঠে এবং ২০২৪ সালের মে মাসে আবার স্থগিত হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগ করেছে, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে প্রায় ১,১২৮ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়েছে। এ বিষয়ে একাধিক মামলা বর্তমানে বিচারাধীন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকী মালয়েশিয়া সফর করে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। সে সময় মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
মালয়েশিয়া ১০টি শর্ত দিলে বাংলাদেশ তিনটি শর্ত বাতিলের অনুরোধ জানায়। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
গত ২৯ মার্চ সিন্ডিকেটমুক্ত শ্রমবাজারের দাবিতে জনশক্তি রফতানিকারকদের একাংশ মানববন্ধন করে। তাদের প্রধান দাবিগুলো হলো- সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ দেওয়া, সিন্ডিকেটের সম্পূর্ণ অবসান, এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক কর্মী এ বাজারে যায় এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। তবে বারবার সিন্ডিকেট, দুর্নীতি ও নীতিগত অসঙ্গতির কারণে এ বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে।
আগামী ৮ এপ্রিলের সফরটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ সফরে যদি শর্তগুলো নিয়ে সমাধান হয় এবং স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তবে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে শ্রমবাজারটি আবারও পুরোপুরি চালু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

