এমএনএ প্রতিবেদক
স্বেচ্ছাচারী গ্রেফতার ও আটক নিরসনে কেবল আইন প্রণয়ন নয়, বরং তার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।
৪ এপ্রিল রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারের আজিমুর রহমান সম্মেলন কক্ষে “বাংলাদেশে গ্রেফতার ও আটক: প্রেক্ষাপট ও আইনগত বিশ্লেষণ” শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) আয়োজিত এ সভায় অংশ নেন আইনজীবী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সভায় প্রধান আলোচকদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের আইন বিভাগের ডিন মোঃ নাজমুজ্জামান ভূইঁয়া বলেন, স্বীকারোক্তি অবশ্যই স্বেচ্ছায় ও বিবেকের তাড়নায় হতে হবে। কিন্তু বাস্তবে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বীকারোক্তি আদায়ের প্রবণতা দেখা যায়, যা রিমান্ড ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। তিনি মন্তব্য করেন, “রিমান্ডে প্রাপ্ত স্বীকারোক্তি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।” তিনি আরও বলেন, আইন প্রণয়নে গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে অনেক সংস্কার কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। বিচার বিভাগ, পুলিশ ও সরকার পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়—সমন্বিতভাবে কাজ করলেই মানবাধিকারভিত্তিক জবাবদিহিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
মূল প্রবন্ধের আলোচনায় বক্তারা বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির সাম্প্রতিক সংশোধনীতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হলেও তার বাস্তব প্রয়োগ এখনও সন্তোষজনক নয়। বিচারিক স্বাধীনতা ও বিবেকের প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। তারা উল্লেখ করেন, অনেক দেশে কম আইন থাকা সত্ত্বেও নাগরিকরা বেশি নিরাপদ, অথচ বাংলাদেশে বহু আইন থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় ন্যায়, সুশাসন ও জবাবদিহিতাভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বক্তারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ অনুসরণ, বিভিন্ন দেশের আইনি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি আস্থা বৃদ্ধি এবং গ্রেফতারের ক্ষেত্রে কার্যকর স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
সভায় বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার ও আটকের ভুক্তভোগীরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, এসব ঘটনায় মামলা করতে গেলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি আদালতের আদেশ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে রাষ্ট্র ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা স্বেচ্ছাচারী গ্রেফতার রোধে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে বডি ক্যামেরা চালু করা, পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, সন্ধ্যার সময় আদালতে চালান দেওয়ার প্রচলিত প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা, এবং পুলিশের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো গ্রহণে আদালতের অনাগ্রহ দূর করা।
এছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিচারিক জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা এবং রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের আরও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়।
সভায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান গ্রেফতার ও আটকের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক অধিকার তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের সীমাবদ্ধতা, গ্রেফতারের কারণ জানার অধিকার, বিচারিক নিয়ন্ত্রণ, নির্দোষ হিসেবে অনুমিত হওয়ার নীতি এবং ক্ষতিপূরণের অধিকার। তিনি বলেন, “আইনে যেমন দুর্বলতা আছে, তেমনি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। কিন্তু কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবেই বিচারব্যবস্থার সাফল্য অনেকাংশে সরকারের সুশাসন নিশ্চিত করার সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।” তিনি ‘ট্যাগিং’ সংস্কৃতি বন্ধেরও আহ্বান জানান, যেখানে কাউকে আগেভাগেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. কাজী জাহেদ ইকবালের সঞ্চালনায় সভার উদ্দেশ্য তুলে ধরেন ব্লাস্টের আইন বিভাগের পরিচালক এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো: বরকত আলী। আলোচনায় অংশ নেন বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আরমান হোসাইন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ল-এর সহকারী অধ্যাপক মোঃ মোস্তফা হোসেন এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ বদিউজ্জামান তপাদার। এছাড়া ভুক্তভোগী হিসেবে বক্তব্য দেন লিমন হোসেন ও ইমতিয়াজ হোসেন রকি।
সভায় বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, স্বেচ্ছাচারী গ্রেফতার ও আটক বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

