এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : ক্রয়ক্ষমতার সক্ষমতা (পিপিপি) বিচারে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৩তম বড় অর্থনীতির দেশ। তখন বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার দাঁড়াবে ৩ ট্রিলিয়ন ৬৪ বিলিয়ন বা তিন লাখ ছয় হাজার চারশ’ কোটি ডলার।
বিশ্বটাকে আমরা এখন যেরকম দেখি, ২০৫০ সালের মধ্যে তা নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। পরিবর্তন ঘটবে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। আর সে পরিবর্তনের অন্যতম সঙ্গী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে এশিয়া।
এর ফলে ওই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির ৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হবে ২৩তম।
বিশ্বসেরা পেশাগত সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসি (PWC)’র ‘দ্য লং ভিউ: হাই উইল দ্য গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডার চেঞ্জ বাই ২০৫০’ শিরোনামের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পরবর্তী ৩৩ বছরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর শক্তিশালী অর্থনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলোর তালিকা বিন্যাস করা হয়েছে। তাতে বিশ্ব অর্থনীতিতে যেসব দেশ নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে চলে আসবে, তাদের বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে।
অর্থনীতির চালিকাশক্তি ও জীবন ধারণের মানের ওপর নির্ভর করে দেশগুলোর এ তালিকা করা হয়েছে। তালিকার প্রথমে যে দেশটির নাম আছে, যে কারও সাধারণ ভবিষ্যদ্বানীতেও সে দেশটির নাম সবার ওপরেই থাকবে। তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বেশ জোরালো হিসেবেই দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে মালয়েশিয়াকেও ছাড়িয়ে যাবে এবং বাংলাদেশ ও কানাডার অর্থনীতি হবে সমপর্যায়ের।
উৎপাদনের (জিডিপি) ভিত্তিতে ৩২টি দেশের একটি র্যাঙ্কিং করা হয়েছে। দেশগুলোর ক্রয়ক্ষমতার সক্ষমতার (পিপিপি) ভিত্তিতে জিডিপির হিসাব করা হয়েছে। পিডবিল্গউসির হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালে বাংলাদেশের জিডিপির আকার হবে এক হাজার ৩২৪ বিলিয়ন ডলার।
এ সময় বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৮তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। ২০৫০ সালে বাংলাদেশ হবে ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতি, জিডিপি দাঁড়াবে তিন হাজার ৬৪ বিলিয়ন ডলারে। বর্তমানে ৬২৮ কোটি ডলার জিডিপি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৩১তম। পিডবিল্গউসির এ র্যাঙ্কিংয়ে বর্তমানে ৩২তম অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম। তবে ২০৫০ সালে দেশটি বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে উঠে যাবে ২০তম অবস্থানে।
২০৫০ সালের মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া জাপান কিংবা জার্মানির মতো বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির অনেক রাঘব বোয়াল তাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে না বলে প্রতিবেদনে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, আগামী তিন দশকে বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি প্রতিবছর গড়ে ৫ শতাংশের মধ্যে থাকবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালে ভিয়েতনাম, দক্ষিণ আফ্রিকা, কলম্বিয়া ও নেদারল্যান্ডস এবং ২০৫০ সালে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা, পোল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ।
গবেষণায় আরও বলা হয়, ২০৪২ সাল নাগাদ বিশ্ব অর্থনীতির আকার বর্তমানের দ্বিগুণ হবে। ২০১৬-২০৫০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের গড় প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। আর বিশ্বের মোট জিডিপির ৫০ শতাংশ থাকবে ব্রাজিল, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, রাশিয়া ও তুরস্কের দখলে।
২০৫০ সাল নাগাদ সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হিসেবে চীনের অবস্থান অটুট থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে যাবে ভারত। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সের চেয়ে এগিয়ে যাবে মেক্সিকো ও ইন্দোনেশিয়া। পাকিস্তান, মিসর পেছনে ফেলবে ইতালি ও কানাডাকে। এ সময়ে এশিয়ার অর্থনীতির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে ইউরোপ।
নিচে পিডব্লিউসির তালিকায় থাকা ৩২টি দেশের নাম উল্লেখ করা হলো এবং তাদের সম্ভাব্য অর্থনীতি মার্কিন ডলারে নিরুপণ করা হলো-
| ১. | চীন | ৫৮.৪৪৯ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ২. | ভারত | ৪৪.১২৮ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ৩. | যুক্তরাষ্ট্র | ৩৪.১০২ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ৪. | ইন্দোনেশিয়া | ১০.৫০২ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ৫. | ব্রাজিল | ৭.৫৪০ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ৬. | রাশিয়া | ৭.১৩১ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ৭. | মেক্সিকো | ৬.৮৬৩ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ৮. | জাপান | ৬.৭৭৯ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ৯. | জার্মানি | ৬.১৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ১০. | যুক্তরাজ্য | ৫.৩৬৯ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ১১. | তুরস্ক | ৫.১৮৪ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ১২. | ফ্রান্স | ৪.৭০৫ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ১৩. | সৌদি আরব | ৪.৬৯৪ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ১৪. | নাইজেরিয়া | ৪.৩৪৮ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ১৫. | মিসর | ৪.৩৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ১৬. | পাকিস্তান | ৪.২৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ১৭. | ইরান | ৩.৯০০ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ১৮. | দক্ষিণ কোরিয়া | ৩.৫৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ১৯. | ফিলিপিনস | ৩.৩৩৪ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ২০. | ভিয়েতনাম | ৩.১৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ২১. | ইতালি | ৩.১১৫ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ২২. | কানাডা | ৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ২৩. | বাংলাদেশ | ৩.০৫৪ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ২৪. | মালয়েশিয়া | ২.৮১৫ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ২৫. | থাইল্যান্ড | ২.৭৮২ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ২৬. | স্পেন | ২.৭৩২ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ২৭. | দক্ষিণ আফ্রিকা | ২.৫৭০ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ২৮. | অষ্ট্রেলিয়া | ২.৫৬৪ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ২৯. | আর্জেন্টিনা | ২.৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ৩০. | পোল্যান্ড | ২.১০৩ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ৩১. | কলাম্বিয়া | ২.০৭৪ ট্রিলিয়ন ডলার |
| ৩২. | নেদারল্যান্ডস | ১.৪৯৬ ট্রিলিয়ন ডলার |
জনসংখ্যাই উৎপাদনশীলতার মূলে রয়েছে বলে ২০৫০ সাল নাগাদ এমন চিত্র দাঁড়াতে পারে। এখন পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে শীর্ষে মার্কিনিদের অবস্থানের কারণ হলো চীন বা ভারতের শ্রমিক ও মূলধনের উৎপাদনশীলতার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা অনেক বেশি। কিন্তু ধীরে ধীরে এসব দেশও উৎপাদনশীলতায় এগিয়ে আসছে।
গত শতকের বিভিন্ন সময়ে চীনের অর্থনীতিতে উত্থান-পতন ছিল। তবে ওই সময়জুড়ে মার্কিনিরা চীনের অর্থনীতিকে উদারবাদের দিকে উৎসাহ দিয়ে গেছে। চীনের বাজার সংস্কারের কারণে প্রায় ৮০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ভারতের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই ধরনের অভিজ্ঞতা প্রযোজ্য। ভারতকেও মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে আসতে উৎসাহ জুগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তাতে করে ভারতে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি পেয়েছে।
চীন বা ভারতের অর্থনীতেতে যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি মুখ্য ভূমিকা পালন করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব অস্বীকার করার মতোও নয়। এর ফলে এসব দেশের জাতীয় উৎপাদনশীলতা বেড়েছে এবং এর ফলে এসব দেশের জিডিপি বেড়েছে। গোটা বিশ্বেও দারিদ্র্য অনেকটাই কমেছে।
তবে অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থান থেকে সরে আসার সময় এগিয়ে আসছে। আগে বা পরে, তাদের শেষ পর্যন্ত কমপক্ষে তিন নম্বরে নেমেই আসতে হবে। সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

