Don't Miss
Home / জাতীয় / ইউপি নির্বাচন ষষ্ঠ ধাপ : ইভিএম জটিলতায় ভোটাররা, ভোট পড়েছে ৫৫ শতাংশ
সহিংসতা বা প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও অভিযোগ রয়ে

ইউপি নির্বাচন ষষ্ঠ ধাপ : ইভিএম জটিলতায় ভোটাররা, ভোট পড়েছে ৫৫ শতাংশ

এমএনএ জাতীয় ডেস্ক : শেষ হয়েছে ষষ্ঠ ধাপের ২১০ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। এ নির্বাচনে বড় কোনো সহিংসতা বা প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও অভিযোগ রয়েছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ নিয়ে। ভোটগ্রহণে ধীরগতির কারণে ভোট পড়েছে ৫৫ শতাংশ। তবে ইভিএমে ভোটগ্রহণের জটিলতা ও ভোট কম পড়ার কারণ খতিয়ে দেখবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ইভিএম টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে বৈঠকে বসবে কমিশন।
জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার ৫নং পিংনা ইউপি নির্বাচনে ইভিএমে ধীরে ভোটগ্রহণ চলায় বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন সাধারণ ভোটাররা। ইভিএমে ধীরগতির কারণে একটি ভোটগ্রহণ করতে সময় লাগছে ১৩-১৫ মিনিট পর্যন্ত। বেলা সাড়ে ১১টায় পিংনা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের কাওয়ামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ও ২নং সুজাত আলী কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। এ ছাড়া কাওয়ামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের নারী বুথের পোলিং অফিসার আকলিমা বেগম জানান, একটি ভোট নিতে ১৩ মিনিট সময় লেগেছে। এতে ভোটগ্রহণ হচ্ছে ধীরগতিতে। এ কেন্দ্রের লাইনে দাঁড়ানো অন্য দুই ভোটার জানান, সকাল ৯টা থেকে দাঁড়িয়ে আছি। লাইনের লোকই কমছে না, ভেতরে কীভাবে ভোট হচ্ছে আর ভোট দিতে কতক্ষণ লাগবে তা আল্লাই জানে।
৪নং ওয়ার্ডের সদস্য প্রার্থী মামুনুর রশীদ মামুন (মোরগ) অভিযোগ করেন, ইভিএমে ভোটাররা সঠিকভাবে ভোট দিতে পারছে না। নেটওয়ার্ক সমস্যা করছে, আঙুলের ছাপ মিলছে না, অনেক সময় ব্যয় হচ্ছে। ২নং ওয়ার্ডের পিংনা সুজাত আলী কলেজ কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজন ভোটার জানান, তিন ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারা। এ কেন্দ্রের ২নং বুথের পোলিং অফিসার মোবারক হোসেন বলেন, আধা ঘণ্টা ধরে ইভিএম নষ্ট। মেশিনের কেবল পরিবর্তন করলাম, তারপরও কাজ হচ্ছে না। সচল করার চেষ্টা করছি।
কুমিল্লার মুরাদনগরে ইভিএমে ভোট দিতে এসে আঙুলের ছাপ না মেলায় অনেক বয়স্ক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। অনেকেই হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কেউ কেউ আবার উত্তেজিত হয়ে বিকল্প পদ্ধতিতে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সোমবার মুরাদনগর উপজেলার জাহাপুর ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে এমন চিত্র দেখা গেছে। প্রথমবারের মতো জাহাপুর ইউনিয়নের সব কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট হচ্ছে। অনেক ভোটারই ইভিএমের ডেমো ভোটে অংশ না নেওয়ায় চূড়ান্তভাবে ভোটের দিন এসে ভোট দিতে এসে বিপাকে পড়েছেন।
আলোচিত ইভিএমে ভোট চলছে খুবই ধীরগতিতে। এর প্রধান সমস্যা ফিঙ্গারপ্রিন্ট জটিলতা। বয়স্ক পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রে এই সমস্যা প্রকট। বেশ কিছু ভোটার কেন্দ্রে এসে ফিঙ্গারপ্রিন্ট না মেলায় ভোট দিতে পারেননি। এ ব্যাপারে রানীমুহুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আবদুস সাত্তার অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘অনেক ভোটারের ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলছে না। বেশি বয়স্ক নারী ও পুরুষের। এতে করে দুবার, তিনবার, চারবার চেষ্টা করার ফলে ভোটারের দীর্ঘ লাইন জমে যাচ্ছে। ভোটাররা বিরক্ত হচ্ছেন এবং ভোট কাস্টিং কম হচ্ছে। এতে আমাদের কিছু করার নেই।’
একই কেন্দ্রে বয়স্ক ভোটার শহিদ মিয়া (৮০), এনআইডিতে তার জন্মতারিখ ১৯৪২। তিনি দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও ভোট দিতে না পেরে হতাশ হয়ে বলেন, ‘আমি ভোট না দিয়ে যাব না। অনেক কষ্ট করে ভোট দিতে এসেছি, এখন বলা হচ্ছে আমার নাকি আঙুলের ছাপ মিলছে না।’ অন্যদিকে একই কেন্দ্রে হাজী আব্দুর হক (৭২) তিনিও ভোট দিতে এসে ভোট দিতে পারেননি। অন্যদিকে সাতমোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট দিতে আসা আব্দুল হাই বলেন, ‘ভ্যাসলিন দিয়ে হাতের আঙুল পরিষ্কার করা হচ্ছে। এরপরেও অনেকেই ভোট দিতে পারছেন না। ভোট দিতে না পেরে অনেকেই বাড়ি ফিরে গেছেন। এ ছাড়াও দড়িকান্দি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে আসা হামিদা আক্তার বলেন, ‘অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। ভোট কক্ষে পৌঁছে আর ভোট দিতে পারলাম না। ফিঙ্গার মেলেনি। বলছে পরে আসার জন্য।’
আয়েশা বেগম বলেন, ছাপ ওঠেনি, ‘ছবিও ভাসেনি। তাই ভোট দিতে পারেননি। মন খারাপ করে বাড়ি চলে যাচ্ছি।’ এ ছাড়াও বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ফিঙ্গার সমস্যায় ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত ভোটাররা। ধীরগতির ভোট, কেন্দ্রেও ফিঙ্গারের সমস্যায় ভোট দিতে পারেননি অনেকেই। সবার অভিযোগ হাতের ছাপ উঠে না যন্ত্রে। হাতে লেবু ঘষতে ঘষতে সুমি ইসলাম বলেন, ‘ফিঙ্গার উঠে না।’ ৩৫ বছরের কম বয়সি মায়া বলেন, ‘আমার বয়স কম। কিন্তু আমারও ফিঙ্গার সমস্যা। ভ্যাসলিন দিয়ে হাত মসৃণ করার চেষ্টা করলেও কাজ হয়নি। এভাবে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় অনেক বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ভোট শুরুর প্রথম ৫ ঘণ্টায় ভোট পড়েছে ৩০-৩২ শতাংশ।
এদিকে ঢাকার দোহার উপজেলার বিলাশপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মাঝিরকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের নৌকা প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া ওই ইউপির একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনি এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিলাশপুর ইউপিতে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী রাশেদ চোকদারের লোকজন ওই কেন্দ্রের দ্বিতীয় তলার ২ ও ৩ নম্বর বুথে ঢুকে ভোটারদের নৌকা প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করছেন।
এদিকে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোটগ্রহণে ধীরগতি এবং ভোট কম পড়ার কারণ এক সপ্তাহের মধ্যে খতিয়ে দেখবে নির্বাচন কমিশন। এ ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার সোমবার নির্বাচন ভবনে এসব কথা বলেন। ষষ্ঠ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে তিনি বলেন, ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু এবং সুন্দর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। তবে ইভিএমে ভোটগ্রহণে ধীরগতি ছিল। এতে ভোট কম পড়ছে। ৫৫ শতাংশের মতো ভোট পড়েছে। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ের যে তথ্য পেয়েছি, তাতে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কোনো অপ্রীতিকর খবর পাওয়া যায়নি। ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু এবং সুন্দর পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। কোনো কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়নি।
ব্যালট পেপারে ভোট বেশি পড়লেও ইভিএমে কম পড়ার কারণ জানতে চাইলে হুমায়ুন কবীর বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ভোটারের আঙুলের ছাপ ম্যাচ করে না। এতে ভোট দিতে অসুবিধা হয়। ধীরগতি হয়। আমরা নির্বাচনের আগে মক ভোট নেই। প্রত্যাশা থাকে ভোটাররা আসবেন। কিন্তু তারা অনেকে আসেন না। আমাদের সম্মানিত মা-বাবা যারা থাকেন, তারা ভোট দিতে এলে বোঝাতে সময় লেগে যায়। ফলে বাইরে দীর্ঘ লাইন হয়। অনেকে চলে যান। ভোটাররা যাতে অপেক্ষা করেন, ফেরত না যান সে জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা মাঠ পর্যায় মতামত চেয়েছি। এ ছাড়া টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে এক সপ্তাহের মধ্যেই বৈঠকে বসব। কীভাবে ইভিএমে ভোটগ্রহণের গতি বাড়ানো যায়, ভোট পড়ার হার বাড়ানো যায়, তা নিয়ে বসব। তিনি আরও বলেন, আমরা যেটা দেখেছি, অনেক জায়গায় কাগুজে ব্যালটের পরিবর্তে ইভিএম চেয়েছে। এতে এনআইডি আর আঙুলের ছাপ না মিললে কোনোভাবেই ভোট দেওয়া যায় না। এই কারণে মাঠ কর্মকর্তাদের ইভিএমের প্রতি ঝোঁক বেশি। আর কাগুজে ব্যালটের ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ। আর ইভিএমে প্রক্রিয়া বেশি। তবে মেশিনে কোনো জটিলতা নেই।
নির্বাচন পরিচালনা শাখা-২-এর যুগ্ম সচিব ফরহাদ আহম্মদ খান জানান, ২৪টি জেলার ৪৪টি উপজেলায় মোট ২১০টি ইউপিতে ষষ্ঠ ধাপের নির্বাচন হয়েছে। এ ধাপে সব ইউপিতে ভোট হয়েছে ইভিএমে। এতে চেয়ারম্যান পদে ১ হাজার ১৯৯ জন, সাধারণ সদস্য পদে ৭ হাজার ৮৪৬ জন ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে ২ হাজার ৫৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছেন। নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ১২ জন, সাধারণ সদস্য পদে ১০০ জন ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে ৩২ জন; মোট ১৪৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
ভোটগ্রহণ করা হয়েছে ২ হাজার ১৮৬টি ভোটকেন্দ্রের ১৩ হাজার ৩০৫টি ভোটকক্ষে। এতে মোট ৪১ লাখ ৮২ হাজার ২৬৩ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। এ পর্যন্ত তফসিল দেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ১৩৮টি ইউপিতে। মোট ইউপি হলো ৪ হাজার ৫৭৪টি। ৪৩৬টি ইউপি নিয়ে মামলা ও সীমানা জটিলতা থাকায় নির্বাচন করা যায়নি। এর আগে পাঁচটি ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন করেছে ইসি। সপ্তম ধাপে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি এবং ১০ ফেব্রুয়ারি অষ্টম ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
x

Check Also

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স আজ গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে: রাষ্ট্রপতি

এমএনএ প্রতিবেদক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স আজ যে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে, ...