Don't Miss
Home / হোম স্লাইডার / জলবায়ু সংকট ও পরিবেশগত বিশৃঙ্খলার দায় যুদ্ধবাজরা এড়াতে পারেনা
যুদ্ধ

জলবায়ু সংকট ও পরিবেশগত বিশৃঙ্খলার দায় যুদ্ধবাজরা এড়াতে পারেনা

এমএনএ ফিচার ডেস্কঃ বর্তমান পৃথিবীতে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে এক মারাত্মক পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে পুরো বিশ্ব। এই যুদ্ধ ইউক্রেন রাশিয়ার মধ্যে হলেও রাশিয়ার সাথে পশ্চিমাদের যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

একটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সামরিক আক্রমণ শুরু হলে সম্পদ ও জীবনের ব্যাপক ক্ষতির কথা সবাই বলি। কিন্ত আরো একটি ক্ষতি হিসেবের বাইরে থেকে যায়। তাহলো পরিবেশগত ক্ষতি। পরিবেশগত ক্ষতির কারণে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উঞ্চতা, খাদ্য ও ফসলের ক্ষতি মারাত্মক দূষণ হয়ে থাকে। অতএব, নিজেদের স্বার্থ আদায়ের জন্য যারা যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ তৈরি ও প্রয়োগের কারণে পরিবেশগত ক্ষতি হয়ে থাকে, এজন্যে এইসব যুদ্ধের কারণে ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুদ্ধবাজদের জরিমানা হিসেবে অর্থ প্রদান করা উচিৎ।

একটি যুদ্ধ পরিবেশের উপর যা যা প্রভাব ফেলতে পারে তাহলো- গ্রীণহাউস গ্যাসের নির্গমন, বন্যপ্রাণীর উপর প্রভাব, অস্ত্র, প্রতিরক্ষা ও সামরিক শিল্পগুলির মাত্রাতিরিক্ত দূষণ করে।বিষ্ফোরক অস্ত্রের তেজষ্ক্রিয়তা কয়েক বছর ধরে মাটিতে থেকে যায়। ফলে প্রকৃতির স্বাভাবিক অবস্থা ধ্বংস করে দিতে পারে।

সম্প্রতি জাতিসংঘের উদ্যোগে স্কটল্যান্ডে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনে(কপ-২৬)  কয়লার ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার প্রস্তাব করা হয়।কেননা মানুষের সৃষ্টি জীবাশ্ম জালানির নির্গমনের কারণে পৃথিবী দিন দিন উঞ্চ হয়ে উঠছে।পৃথিবীর উঞ্চতা রোধ করতে বন উজাড় বন্ধ করা, মিথেন গ্যাস হ্রাস করার উপর জোর দেয়া হয়। কিন্ত বর্তমান বিশ্বে ইউক্রেন রাশিয়ার চলমান যুদ্ধ বিশ্ব পরিবেশের জন্য যে হুমকি তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার প্রয়োজন নেই।

যুদ্ধ শুরুর অনেক আগেই পরিবেশগত প্রভাব শুরু হয়। সামরিক শক্তি গড়ে তোলা, তাদের  প্রশিক্ষণ, সামরিক খরচ, যানবাহন, বিমান, জাহাজ অবকাঠামো। এছাড়া সেনাবাহিনীর ব্যবহার্য্ অস্ত্র থেকে যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হয়, যা বিশ্বের কয়েকটি দেশের স্বাভাবিক নির্গমন হওয়া কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায় বেশী।

এছাড়া যুদ্ধে যে সব প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহার হয় তার পাশাপাশি বিপজ্জনক পারমানবিক ও রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ে।সামরিক ব্যয় পরিবেশগত সমস্যা সমাধান ও টেকসই উন্নয়নে বাধাগ্রস্থ করে।  উচ্চ মাত্রার সামরিক ব্যয়ের কারণে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়ে এবং  পরিবেশগত হুমকি জলবায়ু পরিস্থিতির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে সহযোগিতা পাবার সুযোগ কমে যায়।

যুদ্ধের কারণে পরিবেশগত ক্ষতি ও শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। শহরাঞ্চলে বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহার ও প্রচুর পরিমাণে ধ্বংসাবশেষের কারণে বায়ু ও মাটি দূষণ হয়ে থাকে। এসব গুরুত্বর দূষণ হয় শিল্প বা জ্বালানি ডিপোতে যদি আক্রমণ করা হয় বা অসতর্কভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে তেল ও শিল্প স্থাপনার উপর আক্রমণ করা হয়। তাতে করে খাল, কূপ, পানি নিষ্কাষণ পাম্প, ফসলসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়ে থাকে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে

যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত অস্ত্র এবং সামরিক অস্ত্র, ধ্বংসযজ্ঞ জাহাজ, সামবেমিরন ও উপকূলে তেলের ডিপোগুলোর কারণে সামুদ্রিক দূষন হতে পারে। অনেক অস্ত্রের তেজস্ক্রিয়তা ও বিষাক্ত উপাদান পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হতে পারে।

যুদ্ধের কারণে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী বসতবাড়ি ছেড়ে স্বেচ্ছায় উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেয়। সেখানে আরেক মানবিক ও পরিবেশ বিপর্য্য় ঘটে। স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো প্রয়োজনীয় পরিষেবার অভাবের কারণে উদ্বাস্তু শিবিরে স্বাস্থ্য বিপর্য্য় ঘটে। উদাহরণ স্বরূপ বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে। বিশাল বন কেটে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করা হয়েছে।

যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ে বিশ্ববাসীকে অবহিত করতে জাতিসংঘ ৬ নভেম্বরকে ‘যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘর্ষে পরিবেশের শোষণ প্রতিরোধের আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।যুদ্ধ দ্বারা মানবগোষ্ঠী যে ক্ষতির কারণ হয় তা স্বীকার করার দিন। এই দিবস পালন করার মধ্য দিয়ে যুদ্ধবাজদের কিছুই আসে আর যায়না।

বিশ্বের মধ্যে বৃহত্তম তেলের ভোক্তা ও গ্রীণহাইস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হিসেবে আমেরিকা শীর্ষে।জলবায়ু পরিবর্তনের উপর অসম প্রভাব অন্যান্য দেশের তুলনায় তাদের বেশি। ইরাক যুদ্ধে পরিবেশ দূষণের কারণে ক্যান্সার, জন্মগত ক্রটি ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে।

১৯৯৭ সালে কিয়োট প্রটোকল আন্তর্জাতিক চুক্তিতে আমেরিকা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। যাতে পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবার বিষয়ে দায়বদ্ধতার আইনি কাঠামো যাতে দাঁড় করানো না যায় সেক্ষেত্রে তারা অসহযোগিতা করে।

পেন্টাগন থেকে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের সহযোগী দেশগুলোর বিমান বাহিনী গত ২০ বছরে অন্যান্য দেশের উপর ৩৩৭,০০০বার এর বেশি বোমা ও ক্ষেপনাস্ত্র ফেলেছে, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় আরো ৩,২৪৬টি বোমা ও ক্ষেপনাস্ত্র ফেলেছে।এই বোম ধ্বংস করেছে বেসমারিক জীবন, ধ্বংস করেছে প্রকৃতি। সম্প্রতি রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ দুটি বৃহত্তম খাদ্য উৎপাদনকারী দেশে প্রকৃতির সর্বশেষ্ট ধ্বংসের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধ একদিন বন্ধ হবে সেখানে। কিন্তু প্রকৃতির পূর্বাবস্থায় ফিরে আসতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পারমানবিক অস্ত্র পরীক্ষা স্থলভাগ ও জলভাগে বিপর্য্য় সৃষ্টি করেছে। এর ফলে মার্কিন ভূখন্ডের জমিকে দূষিত করেছে। যার ফলে গর্ভপাত, ক্যান্সার ও অন্যান্য রোগের মহামারী দেখা দিয়েছে।সেখানে মার্কিন পরীক্ষার কারণে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের অনেক অংশ বসবাসের অযোগ্য ও স্বাস্থ্যঝুকির কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। তা সত্বেও মার্কিন সিনেটে আর্মড সার্ভিসেস কমিটি নতুন করে পারমানবিক অস্ত্র পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

১৯৯০ এর দশকের শুরু থেকে বিশ্ব জুড়ে বেশ কয়েকটি মাঝারি থেকে বৃহৎ আকারের যুদ্ধ হয়েছে। যেমন, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, কঙ্গো যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ, লিবিয়া যুদ্ধ, ইউক্রেন দ্বন্দ্ব ইত্যাদি। এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য হলো অস্ত্রের বেচাকেনা। অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলো তাদের তৈরি অস্ত্র বিক্রি করে থাকলেও কিন্তু পরিবেশের ক্ষতির জন্য কোন রকম ক্ষতিপূরণ দেয়না।

আমরা ‍যুদ্ধ বাঁধলে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর কথা বলি। কিন্তু যুদ্ধবাজরা অস্ত্র ও বোমা দিয়ে বেসামরিক মানুষের পাশাপাশি আরো অনেক প্রজাতিকে ধ্বংস করে। সে পরিমান অগুণিত। আমরা আমাদের কষ্টের কথা বলতে পারলেও অবুঝ অন্যান্য প্রজাতি তা বলতে পারেনা। যুদ্ধের কারণে অন্যান্য প্রজাতির বাসস্থান ধ্বংস হচ্ছে।এবং তাদের বংশ করা হচ্ছে।

রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী, প্রতিরক্ষা অস্ত্র তৈরির শিল্পগুলিকে গ্রিনহাউস নির্গমনের পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহারের বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা দেয়া দরকার। তাদের বুঝতে হবে মৃত্যুর চেয়েও ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ সবচেয়ে জরুরী। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সাল থেকে যুদ্ধে ৬.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশী অর্থ্ ব্যয় করেছে শুধু যুদ্ধের জন্য। কিন্তু এই অর্থ উন্নয়নের জন্যও হওয়া জরুরী। আর জলবায়ু সঙ্কট মোকাবেলায় সামরিক বাহিনীকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। বিশ্বকে যুদ্ধমুক্ত রাখতে ও শান্তির কল্যাণে অস্ত্রের অগ্রাধিকার এখন থেকে কমাতে হবে।

আমাদের বিশ্ব নেতারা যুদ্ধ,আগ্রাসন বা আক্রামণের কারণে পরিবেশগত ক্ষতি অনুধাবন করলে ভালো হতো। অন্যথায় যুদ্ধবাজদের কৃতকর্মের জন্য মূল্য দিতেই হবে। এইচজি ওয়েলস বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ আমরা নিজ থেকে যদি শেষ না করি, যুদ্ধই একদিন আমাদের শেষ করে দেবে।

আমরা প্রত্যাশা করি, একদিন এই বিশ্বেই শান্তির রাজত্ব হবে।

 লেখক : মিয়া মনসফ, যুগ্ম সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী(এমএনএ)

x

Check Also

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত চালুতে সরকারের জোর তৎপরতা: উপদেষ্টা মাহদী

এমএনএ প্রতিবেদক মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় চালু করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে ...