বিশেষ প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের কৃষক মো. আজগর চলতি বোরো মৌসুমে প্রায় তিন একর জমিতে ধান চাষ করেছেন। কিন্তু সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। গত এক সপ্তাহে কয়েকবার বাজারে গেলেও তিনি মাত্র একবার ডিজেল পেয়েছেন—১০ লিটার চাইলেও দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪ লিটার, তাও প্রতি লিটারে প্রায় ২০ টাকা বেশি দামে।
আজগরের মতো একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন পাশের সরফভাটা ইউনিয়নের কৃষক মো. আলমগীর। তিনি বলেন, ধানের শিষ বের হওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ দিতে না পারলে ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু প্রতিদিন বাজারে গিয়েও প্রয়োজনমতো ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না।
শুধু এই দুই কৃষকই নন—দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকেরাও একই সংকটে রয়েছেন। চট্টগ্রাম, জামালপুর, পটুয়াখালী, রাজশাহী, গাজীপুর, বরগুনা, সিলেট, ফরিদপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারীসহ অন্তত ১২ জেলার কৃষকেরা জানিয়েছেন, তারা প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ১০০ টাকার বদলে ১২০–১৩০ টাকা পর্যন্ত দিয়ে কিনতে হচ্ছে।
সেচ ও কৃষিযন্ত্রে চাপ
দেশে সেচ ও কৃষিকাজের বড় একটি অংশ ডিজেলনির্ভর। গভীর ও অগভীর নলকূপ, পাম্প, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, কম্বাইন্ড হারভেস্টার, থ্রেশারসহ অধিকাংশ কৃষিযন্ত্রই ডিজেলে চলে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্রের সংখ্যা ২১ লাখের বেশি। শুধু সেচ মৌসুমেই ডিজেলের চাহিদা প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন।
এদিকে, কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের হিসাব বলছে, ছয় মাসের সেচ মৌসুমে শুধু সেচযন্ত্রেই প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি প্রয়োজন হয়। যদিও সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে কিছু এলাকায় সেচের চাহিদা কমেছে, তবে সামগ্রিকভাবে সংকট কাটেনি।
সরবরাহে ঘাটতি ও বাজার অস্থিরতা
বর্তমানে দেশে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১২ হাজার টন, কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে সাড়ে ১১ হাজার টনের মতো। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে মজুত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার টন ডিজেল, যা চাহিদার তুলনায় কম।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও এই সংকটকে তীব্র করেছে। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে দাম বেড়েছে এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দেশের ভেতরেও আতঙ্কে অনেকেই অতিরিক্ত জ্বালানি কিনছেন। এতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় বাড়ছে এবং দ্রুত তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেক স্টেশন দিনের বড় সময় বন্ধ থাকছে। অন্যদিকে, অবৈধভাবে তেল মজুত ও বিক্রির অভিযোগে অভিযান চলায় অনেক খুচরা বিক্রেতা তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছেন, যা কৃষকদের সংকট আরও বাড়িয়েছে।
ফসল কাটা নিয়েও শঙ্কা
কৃষকেরা এখন শুধু সেচ নয়, আসন্ন ধান কাটার সময় নিয়েও উদ্বিগ্ন। দেশে ধান কাটার ক্ষেত্রে কম্বাইন্ড হারভেস্টারের ব্যবহার বাড়ছে, যা সম্পূর্ণ ডিজেলনির্ভর। একটি হারভেস্টার চালাতে প্রতিদিন ৬০–৭০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন।
বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে দ্রুত ধান কাটতে না পারলে আগাম বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অতীতে এমন ঘটনার নজিরও রয়েছে, যা দেশের খাদ্য উৎপাদনে বড় ধাক্কা দিয়েছিল।
সমাধানের প্রস্তাব ও সরকারি আশ্বাস
স্থানীয় প্রশাসন বলছে, কৃষকদের অগ্রাধিকার দিয়ে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। রাঙ্গুনিয়ার ইউএনও জানিয়েছেন, পাম্প ও দোকানগুলোকে কৃষকদের আগে ডিজেল দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেন, জ্বালানিসংকট কৃষিতে প্রভাব ফেললে তা সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে। তাই কৃষিখাতে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি ও ভর্তুকি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
বোরো মৌসুমের গুরুত্ব
বাংলাদেশে বোরো ধানই প্রধান খাদ্যশস্যের উৎস। মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫২ শতাংশ আসে এই মৌসুম থেকে। ফলে এই সময়ের কোনো ধরনের ব্যাঘাত দেশের খাদ্যব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ডিজেলের সংকট শুধু একটি জ্বালানি সমস্যা নয়—এটি সরাসরি কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হতে পারে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

