বিশেষ প্রতিনিধি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রবাসী শ্রমবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। নতুন করে শ্রমিক পাঠানো প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ হুমকির মুখে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প শ্রমবাজার হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো—বিশেষ করে মালয়েশিয়া—কে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়েই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুলতে পারে।
এ লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল আগামী ৮ এপ্রিল মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছে। সফর শেষে ইতিবাচক অগ্রগতি আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমিক গ্রহণকারী দেশ মালয়েশিয়া ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ রেখেছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে প্রায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই ধারাবাহিকতা থেমে যায়।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত বাজার না খুললে আগামী বছরগুলোতে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ থাকার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং একাধিক মামলা। দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা করেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি—এসব অভিযোগের বেশিরভাগই ভিত্তিহীন।
মালয়েশিয়া সরকারও বারবার অনুরোধ জানিয়েছে, অপ্রমাণিত মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ এই সুযোগ হারালে অন্য দেশগুলো তা কাজে লাগাচ্ছে। ইতোমধ্যে নেপাল, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমার মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানো অব্যাহত রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে নেপাল থেকে প্রায় ৫ লাখ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ইতোমধ্যেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমবাজার বন্ধ থাকলে এই সমস্যা আরও প্রকট হবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘদিন শ্রমবাজার বন্ধ থাকলে তা সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেখানে কর্মরত অনেক শ্রমিক দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হতে পারেন। যারা থাকবেন, তাদের আয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এতে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিকল্প হিসেবে মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার খুলে দেওয়া এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ বিদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। দেশটির নীতিমালা অনুযায়ী মোট কর্মশক্তির প্রায় ১৫ শতাংশ বিদেশি শ্রমিক হতে পারে। এই হিসেবে বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ নতুন শ্রমিক নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আগামী কয়েক বছরে এই সংখ্যা ১২ লাখে পৌঁছাতে পারে। তবে ২০২৬ সালের পর থেকে বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির। ফলে এখনই সুযোগ কাজে লাগানো না গেলে ভবিষ্যতে সুযোগ কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি আরবের পর মালয়েশিয়াই এমন একটি দেশ, যেখানে অদক্ষ শ্রমিকদেরও বড় পরিসরে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে যেতে ভাষা দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হওয়ায় সেখানে সুযোগ সীমিত।
সরকার ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে। ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনাতেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক আবুল হাসানাত হুমায়ুন কবীর জানিয়েছেন, শ্রমবাজার খোলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং অপ্রমাণিত মামলার বিষয়টিও সরকার গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে।
সবকিছু নির্ভর করছে আসন্ন উচ্চপর্যায়ের মালয়েশিয়া সফরের ওপর। সংশ্লিষ্টদের আশা, চলমান জটিলতা নিরসন হলে খুব দ্রুতই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবার উন্মুক্ত হবে।
এটি শুধু বেকারত্ব কমাতেই নয়, দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

