Don't Miss
Home / সারাদেশ / উচ্চ ব্যয়, নিম্নমানের সেবা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সংকটে স্থবির বাংলাদেশের পর্যটন খাত

উচ্চ ব্যয়, নিম্নমানের সেবা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সংকটে স্থবির বাংলাদেশের পর্যটন খাত

বিশেষ প্রতিবেদন

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল এবং হাজার বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন—সব মিলিয়ে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে এখানে। তবে এই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশের পর্যটন খাত এখনও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, সমন্বয়ের অভাব এবং কার্যকর প্রচারণার ঘাটতির কারণে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ; এমনকি দেশীয় পর্যটকদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে দেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজারে। প্রায় তিন দশকে এই প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক মানদণ্ডে অত্যন্ত সীমিত। ১৯৯৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট বিদেশি পর্যটক আগমন হয়েছে প্রায় ৮৬ লাখ।

এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে পর্যটক আগমনে ওঠানামা লক্ষণীয়। ২০০৮ সালে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৬৭ হাজার পর্যটক এলেও পরবর্তী বছরগুলোতে তা কমে যায়। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও ২০২০ ও ২০২১ সালে মহামারির কারণে বড় ধরনের পতন ঘটে। পরবর্তীতে পুনরুদ্ধার হলেও প্রবৃদ্ধির গতি এখনও প্রত্যাশিত নয়।

বাংলাদেশ বর্তমানে পর্যটন খাত থেকে জিডিপির মাত্র ৪ দশমিক ৪ শতাংশ আয় করে, যেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল ও মালদ্বীপ এই খাতকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ ব্যয় ও নিম্নমানের সেবা; অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা; আকাশপথের সীমাবদ্ধতা এবং প্রচারের ও নিরাপত্তার অভাবসহ কয়েকটি মৌলিক কারণে দেশের পর্যটন খাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা: পর্যটন সক্ষমতায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম। সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন হলেও যানজট, নিম্নমানের সড়ক এবং পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন আবাসন সুবিধার অভাব পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করে।

আকাশপথের সীমাবদ্ধতা: আন্তর্জাতিক ফ্লাইট নেটওয়ার্ক দুর্বল। ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে সরাসরি সংযোগ সীমিত হওয়ায় ভ্রমণ ব্যয় বেড়ে যায়, যা বিদেশি পর্যটকদের জন্য বড় বাধা।

প্রচারের অভাব: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিং কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও উপস্থিতি দুর্বল।

নিরাপত্তা উদ্বেগ: পর্যটন এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশ থাকলেও বিদেশি পর্যটকদের আস্থা এখনও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। চুরি, ছিনতাই ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।

উচ্চ ব্যয় ও নিম্নমানের সেবা: অনেক ক্ষেত্রে খরচ বেশি হলেও সেবার মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে।

সমন্বয়ের অভাব: পর্যটন বোর্ড, করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নেই।

তথ্য ও দক্ষতার ঘাটতি: পর্যটন-সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে হালনাগাদ তথ্যের অভাব এবং সেবাদানকারীদের পেশাদারিত্বের ঘাটতি স্পষ্ট।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত ৩০ বছরে দেশে সব মিলিয়ে প্রায় ৮৬ লাখ বিদেশি পর্যটক এসেছেন। বছরভিত্তিক পর্যটকের সংখ্যা হলো— ১৯৯৫ সালে ১,৫৬,০০০ জন, ১৯৯৬ সালে ১,৬৬,০০০ জন। ১৯৯৭ সালে ১,৮২,০০০ জন। এছাড়া ১৯৯৮ সালে ১,৭২,০০০, ১৯৯৯ সালে ১,৭৩,০০০, ২০০০ সালে       ১,৯৯,০০০, ২০০১ সালে ২,০৭,০০০, ২০০২ সালে ২,০৭,০০০, ২০০৩ সালে ২,৪৫,০০০, ২০০৪  সালে ২,৭১,০০০, ২০০৫ সালে ২,০৮,০০০, ২০০৬  সালে ২,০০,০০০, ২০০৭ সালে ২,৮৯,০০০, ২০০৮ সালে ৪,৬৭,০০০, ২০০৯ সালে ২,৬৭,০০০, ২০১০ সালে ১,৩৯,১০৬, ২০১১  সালে ১,৫৬,৫৪৫, ২০১২ সালে ১,৫৯,৫২৪, ২০১৩ সালে ১,০৪,০০৯, ২০১৪  সালে ১,৩৩,৯০২, ২০১৫ সালে ২,৬১,৪১৬, ২০১৬ সালে ৪,০০,৬৫৯, ২০১৭ সালে      ৫,০০,৮৬৫, ২০১৮ সালে ৫,৫২,৭৩০, ২০১৯ সালে ৬,২১,১৩১, ২০২০ সালে       ১,৮১,৫১৮, ২০২১ সালে ১,৩৫,১৮৬, ২০২২  সালে ৫,২৯,২৬৮,  ২০২৩  সালে ৬,৫৫,৪৫১ ও ২০২৪ সালে ৬,৬০,০০০ জন।

বাংলাদেশে আগত বিদেশি পর্যটকদের বেশিরভাগই প্রতিবেশী ভারত থেকে আসে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত পর্যটকের হার প্রায় ৫ শতাংশ, যার বড় অংশ প্রবাসী বাংলাদেশি। বিশ্ব পর্যটন বাজারের বড় অংশ—প্রায় ৫৩ শতাংশ—ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে এলেও বাংলাদেশ সেই বাজারে খুবই সীমিত উপস্থিতি রাখতে পেরেছে। এশিয়ার বাইরে থেকে পর্যটক আগমনের হার যেখানে অনেক দেশে ২০ থেকে ৭১ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা মাত্র ৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুজহাত ইয়াসমিনের মতে, পর্যটন এলাকাগুলোর ধারণক্ষমতা নির্ধারণ না করাই একটি বড় সমস্যা। নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি পর্যটক উপস্থিত হওয়ায় সেবার মান ব্যাহত হয় এবং পরিবেশগত চাপ বাড়ে।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশীর মতে, সমস্যাগুলো চিহ্নিত হলেও বাস্তবায়নে আন্তরিকতার অভাব রয়েছে।

কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বিমানবন্দর আধুনিকায়ন শেষ হলে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও আলাদা জোন তৈরি করার প্রস্তাবও এসেছে।

হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতের প্রতিনিধিরা নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন খাতকে কার্যকরভাবে উন্নত করতে হলে একটি সমন্বিত ‘মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শুল্কমুক্ত বিপণি সুবিধা চালু করা প্রয়োজন।

পর্যটন শিল্প বেকারত্ব কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই খাতকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী খাতে রূপান্তর করা সম্ভব।

x

Check Also

দীর্ঘ ২৫ বছরেও শেষ হয়নি রমনা বটমূলের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে হামলা মামলার বিচার

বিশেষ প্রতিবেদন বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপনে যখন সারাদেশে আনন্দ-উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে, তখনও অনেকের মনে ফিরে ...