এমএনএ প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকা-র গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি একগুচ্ছ উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। নতুন এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো—যাত্রীসেবা উন্নত করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যানজট ও বিশৃঙ্খলা কমানো।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। এসব আলোচনার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যৌথভাবে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে। একই সঙ্গে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ৩৮ পৃষ্ঠার একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যেখানে আগামী ছয় মাস, পরবর্তী অর্থবছর এবং আগামী পাঁচ বছরে করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে।

নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে স্বল্পমেয়াদে “পিংক বাস” চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আটটি রুটে ৯টি বাস চালু করা হবে। এসব বাসে চালক ও সহকারী হিসেবে নারীরাই কাজ করবেন, এজন্য তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্স দেওয়া হবে। এই উদ্যোগ নারীদের গণপরিবহনে অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়ক হবে বলে মনে করছে সরকার।
পরিবেশবান্ধব যাতায়াত উৎসাহিত করতে উত্তরা মেট্রোরেল স্টেশনকেন্দ্রিক সাইকেল রাইড শেয়ারিং চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় রয়েছে ৬টি সাইকেল স্ট্যান্ড নির্মাণ; ১৫০টি সাইকেল সরবরাহ ও প্রায় ৬ কিলোমিটার সাইকেল লেন তৈরি। এই প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) বাস্তবায়নের কথা ভাবা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত বাসরুট রেশনালাইজেশন পুনরায় কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় অসংখ্য বাসরুট কমিয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি রুটে আনা; কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা; নির্দিষ্ট স্টপেজে বাস থামানো ও স্বয়ংক্রিয় দরজা ব্যবস্থা চালু করা হবে।
এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি বাস্তবায়িত হলে গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমবে।
জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে বিদ্যুৎ–চালিত বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে বৈদ্যুতিক স্কুলবাস আমদানিতে শুল্ক শূন্য করা ও গণপরিবহনে ইলেকট্রিক বাস আনতে করছাড় দেওয়া হবে। এটি পরিবেশ দূষণ কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গণপরিবহনের মান উন্নত করতে কন্ডাক্টর ও সুপারভাইজারদের লাইসেন্সিং চালু; আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৫,০০০ কর্মীকে লাইসেন্স প্রদান ও ২,৫০০ শ্রমিককে ইউনিফর্ম সরবরাহ করা হবে। এছাড়া শিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণদের জন্য ভাড়া ছাড়ের নীতিমালা প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা মেট্রোরেল উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চালু রয়েছে এবং এটি কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হচ্ছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন।
তবে সব এলাকায় মেট্রোরেল নেওয়া সম্ভব নয় বলে বিকল্প হিসেবে মনোরেল বা লাইট রেল চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মনোরেল একক লাইনের ওপর চলাচল করে, যা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তুলনামূলক কম জায়গা ও খরচে নির্মাণযোগ্য।
এমআরটি লাইন-১ এবং লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুই প্রকল্প মিলিয়ে ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মেট্রোরেল নয়—বাস, লাইট রেল, মনোরেলসহ একটি সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এতে করে রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা—যেমন বাসাবো, গোড়ান, মাদারটেক ও পুরান ঢাকার বাসিন্দারাও উন্নত সেবা পাবে।
সব মিলিয়ে, সরকারের এই বহুমুখী পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো রাজধানীর গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে একটি আধুনিক, নিরাপদ ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সফল বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে—সমন্বয়, কার্যকর নজরদারি এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

