Don't Miss
Home / আজকের সংবাদ / তেলাপোকা জনতা পার্টি: ব্যঙ্গ থেকে রাজনৈতিক বার্তা, ভারতে তরুণদের নতুন ক্ষোভের প্রতীক

তেলাপোকা জনতা পার্টি: ব্যঙ্গ থেকে রাজনৈতিক বার্তা, ভারতে তরুণদের নতুন ক্ষোভের প্রতীক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতে “তেলাপোকা (ককরোচ) জনতা পার্টি” (সিজেপি) নামে এক ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বেকারত্ব, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও তরুণদের হতাশাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অনলাইন আন্দোলন খুব অল্প সময়েই লাখো তরুণের সমর্থন পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

২০২৬ সালের ১৬ মে আন্দোলনটি শুরু করেন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপক। তিনি অতীতে আম আদমি পার্টির (এএপি) সঙ্গে কাজ করেছিলেন বলেও জানা যায়।

এই আন্দোলনের সূত্রপাত ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এক বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। ১৫ মে সুপ্রিম কোর্টের এক শুনানিতে তিনি বেকার তরুণদের “তেলাপোকা” ও “সমাজের পরজীবী” হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, অনেক তরুণ তেলাপোকার মতো, যাদের কোনো চাকরি নেই বা পেশায় জায়গা নেই। তাদের কেউ মিডিয়ায় যায়, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়, আবার কেউ আরটিআই অ্যাকটিভিস্ট হয়ে সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।

এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে তরুণদের একটি বড় অংশ এটিকে অপমানজনক ও বাস্তবতা-বিবর্জিত বলে আখ্যা দেয়।

প্রতিক্রিয়ার পরদিনই অভিজিৎ দীপক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে “সব তেলাপোকার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম” চালুর ঘোষণা দেন। সেখানে সদস্য হওয়ার শর্ত হিসেবে ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলা হয়—“বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা এবং পেশাদারভাবে অভিযোগ করার দক্ষতা থাকতে হবে।”

“বেকার ও অলসদের কণ্ঠস্বর” স্লোগান নিয়ে চালু হওয়া ওয়েবসাইটটি মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ৪০ হাজারের বেশি সদস্য পাওয়ার দাবি করে। পরে সেই সংখ্যা ৩ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে বলেও জানানো হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আন্দোলনটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২১ মে পর্যন্ত তাদের ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ ছাড়িয়েছে বলে দাবি করা হয়। সমর্থকদের দাবি, অনুসারীর সংখ্যায় এটি বিজেপি ও কংগ্রেসের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টকেও ছাড়িয়ে গেছে।

তেলাপোকা জনতা পার্টির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ইশতেহারে একাধিক বিতর্কিত ও আলোচিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা “আরেকটি পিএম কেয়ারস গড়তে” আসেনি কিংবা “করদাতার টাকায় দাভোস সফর” করতেও নয়; বরং জনগণের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায়।

ইশতেহারের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো— অবসরের পর কোনো প্রধান বিচারপতিকে রাজ্যসভার আসন না দেওয়া; বৈধ ভোট মুছে ফেলা হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ইউএপিএ আইনে ব্যবস্থা; সংসদ ও মন্ত্রিসভায় নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ; অম্বানি ও আদানির মালিকানাধীন গণমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণা; ও দলবদলকারী এমএলএ বা এমপিদের ২০ বছর নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা।

তেলাপোকা জনতা পার্টির এক্স অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে ব্লক হওয়ার পর বিষয়টি নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করে। কংগ্রেস নেতা ও সংসদ সদস্য শশী থারুর অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করার সিদ্ধান্তকে “গভীরভাবে অদূরদর্শী” বলে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, গণতন্ত্রে ভিন্নমত, ব্যঙ্গ, রসিকতা এবং হতাশা প্রকাশেরও জায়গা থাকতে হবে। তরুণদের নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্ম থাকা উচিত।

তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-সমর্থকরা এই উদ্যোগকে বিরোধী শিবিরঘেঁষা ডিজিটাল প্রচারণা বলে দাবি করেছেন। তাদের বক্তব্য, অভিজিৎ দীপকের অতীতে আম আদমি পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় এই প্ল্যাটফর্মের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।

অভিজিৎ দীপকের দাবি, এই আন্দোলন শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইতোমধ্যে কিছু তরুণকে তেলাপোকার পোশাক পরে বিভিন্ন বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা গেছে।

তিনি বলেন, “এটি এমন একটি আন্দোলন, যা ভারতের রাজনৈতিক আলোচনার ধরন বদলে দেবে। এটি অনলাইনে চলবে, আর প্রয়োজন হলে মাঠেও নামবে।”

বিশ্লেষকদের মতে, তেলাপোকা জনতা পার্টির উত্থান কেবল একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন ট্রেন্ড নয়; বরং এটি ভারতের তরুণ সমাজের গভীর হতাশা ও বঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ।

ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৮০ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৯ দশমিক ১ শতাংশ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আয় বৈষম্য ও নিয়োগে অনিয়ম নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে।

প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের সময়ই দেশজুড়ে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। আন্দোলনের মুখে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষাও বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী প্রশান্ত ভূষণ বলেন, প্রধান বিচারপতির মন্তব্যে তরুণ ও অধিকারকর্মীদের প্রতি বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তিনি মনে করেন, দেশে একটি “তরুণ বিদ্রোহ” প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জি তরুণদের নেতৃত্বে একাধিক রাজনৈতিক আন্দোলন বড় পরিবর্তনের জন্ম দিয়েছে। শ্রীলংকা, নেপাল এবং বাংলাদেশে তরুণদের বিক্ষোভ সরকারবিরোধী শক্তিকে নতুন গতি দিয়েছে।

সেই ধারাবাহিকতায় “তেলাপোকা জনতা পার্টি” এখন ভারতে তরুণদের ক্ষোভ, ব্যঙ্গ ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের নতুন প্রতীকে পরিণত হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

x

Check Also

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নতুন মহাপরিচালক মুফতি মুহিববুল্লা হিল বাকী

এমএনএ প্রতিবেদক সরকার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ–এর পেশ ইমাম মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লা হিল ...