Don't Miss
Home / আজকের সংবাদ / দেশে হামে মৃত্যু ৬১০; শতভাগ টিকা কভারেজের দাবির পরও কমছে না হাম, কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের

দেশে হামে মৃত্যু ৬১০; শতভাগ টিকা কভারেজের দাবির পরও কমছে না হাম, কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের

বিশেষ প্রতিবেদক

দেশব্যাপী পরিচালিত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি কভারেজ অর্জনের দাবি করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে সেই সাফল্যের পরও কমছে না হামের সংক্রমণ। বরং প্রতিদিনই হাজারের বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এতে টিকার কার্যকারিতা, প্রকৃত কভারেজ এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৬ জুন সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৬১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯১ জন। বাকি ৫১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে।

গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৪১১ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ২৪৩ জনের শরীরে ল্যাব পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে।

আক্রান্ত ও মৃত্যুর কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিভাগ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। বিভাগটিতে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ২৬৯ জন। আক্রান্ত হয়েছে ৪২ হাজার ৫৭৩ জন।

সারাদেশে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৭৬ হাজার ৮৭৬ জন। এর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় ৯ হাজার ৫০৩ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে।

শতভাগের বেশি কভারেজ, তবু নিয়ন্ত্রণে আসছে না সংক্রমণ

হামের বিস্তার ঠেকাতে স্বাস্থ্য বিভাগ প্রথমে গত ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু করে। মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে সেখানে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ শতাংশ বেশি কভারেজ অর্জনের দাবি করা হয়।

পরে ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য গণটিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, চূড়ান্ত পর্যায়ে জাতীয়ভাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ বেশি কভারেজ অর্জিত হয়েছে।

তবে টিকা প্রয়োগের দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা থাকলেও ছয় থেকে সাত সপ্তাহ পরও সংক্রমণের হার কমার কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে বিশেষজ্ঞ মহলে।

অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, তা জানে না স্বাস্থ্য বিভাগ

বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকার এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশীদ বলেন, “আমরা এখনো বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখিনি। আপনারা যেহেতু বিষয়টি তুলেছেন, আমি মহাপরিচালককে জানাব। এরপর কী করা যায়, তা দেখা হবে।”

হামের প্রকোপ কবে কমতে পারে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। সময় লাগবে। সে পর্যন্ত আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে।”

টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন অধ্যাপক বে-নজির আহমেদের

জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, “টিকা যদি যথাযথভাবে কার্যকর হতো, তাহলে দেশজুড়ে এখনো প্রতিনিয়ত এত সংক্রমণ ঘটত না। বয়সভিত্তিক নমুনা সংগ্রহ করে দেখতে হবে শিশুদের শরীরে কতটুকু অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। যদি পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি না হয়ে থাকে, তাহলে টিকার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।”

তিনি আরও বলেন, সরকারি কভারেজের হিসাব ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।

“ধরুন কোনো এলাকায় প্রকৃতপক্ষে ৩ হাজার শিশু টিকার উপযোগী, কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ হাজার। ওই ২ হাজার শিশুকে টিকা দিয়ে শতভাগ কভারেজ দেখানো হলেও বাস্তবে আরও ১ হাজার শিশু টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না এবং সংক্রমণ অব্যাহত থাকছে,” বলেন তিনি।

কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ

অধ্যাপক বে-নজির আহমেদের মতে, টিকার মান যাচাইয়ের পাশাপাশি সংরক্ষণ ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা জরুরি।

তিনি বলেন, “টিকা উৎপাদন থেকে প্রয়োগ পর্যন্ত নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। সামান্য তাপমাত্রা বিচ্যুতিতেও টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে। গত সেপ্টেম্বর থেকে এসব টিকা ইপিআই কর্মসূচির আওতায় সংরক্ষিত ছিল। সেখান থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের টিকাদান কেন্দ্র পর্যন্ত পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় কোল্ড চেইন ঠিকভাবে বজায় রাখা হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।”

রক্ত পরীক্ষা ছাড়া প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব নয়: ডা. তাজুল ইসলাম

জনস্বাস্থ্যবিদ ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, “শুধু টিকা দিলেই হবে না। টিকা পাওয়ার পর শিশুদের শরীরে কতটুকু রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করতে হবে। বয়সভিত্তিক নমুনা সংগ্রহ করে রক্ত পরীক্ষা করলে খুব সহজেই বিষয়টি জানা সম্ভব।”

তিনি বলেন, “সরকারের তথ্য অনুযায়ী প্রায় এক মাস আগে শতভাগ কভারেজ অর্জিত হয়েছে। কিন্তু এখনো আক্রান্তের সংখ্যা কমছে না। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। টিকা দেওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইমিউনিটি তৈরি হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।”

সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “বারবার সুপারিশ করা হলেও অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হচ্ছে না। ফলে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তারও কোনো বৈজ্ঞানিক উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।”

উদ্বেগজনক পরিস্থিতি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং মৃত্যুর ঘটনাও থামছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত কভারেজ, টিকার কার্যকারিতা এবং কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা নিয়ে দ্রুত বৈজ্ঞানিক তদন্ত না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। একই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদানের বয়সসীমার আগেই কেন অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, সেটিও গভীরভাবে গবেষণা করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

x

Check Also

২০২৭ থেকে ৪র্থ ও ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে চার নতুন বই, জিপিএতে নম্বর যোগ না হলেও পাস বাধ্যতামূলক

শিক্ষাঙ্গন প্রতিবেদক শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেবে, মূল্যায়নের মুখোমুখিও হবে; তবে সেই নম্বর বার্ষিক ফলাফল বা ...