Don't Miss
Home / আজকের সংবাদ / গণতন্ত্রের চর্চা নেই আ’লীগ-বিএনপিতে

গণতন্ত্রের চর্চা নেই আ’লীগ-বিএনপিতে

এমএনএ ডেস্ক রিপোর্ট : আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল। দুই দলই একাধিকবার ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনা করছে। পালাবদলের মতো ক্ষমতার সঙ্গী এ দুটি দলের গঠনতন্ত্রে গণতন্ত্র চর্চার সব কিছুই বলা আছে। আছে গোপন ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের বিধিবিধান। কিন্তু দল দুটি তা মেনে চলে না। ক্ষেত্রবিশেষে মেনে চলার প্রক্রিয়া শুরু করে, বাস্তবে সিদ্ধান্ত হয় অগণতান্ত্রিক পন্থায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দল দুটির গঠনতন্ত্রে গণতন্ত্রের কথা থাকলেও বাস্তব চর্চা নেই আ’লীগ-বিএনপিতে।

ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়েছে মার্চের ২২ তারিখ। এ দিন দলের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সেখানে উপস্থিত থেকে সুবল সাহাকে সভাপতি এবং সৈয়দ মাসুদ হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা দেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র এভাবে নাম ঘোষণা করার পদ্ধতি অনুমোদন করে না।

গঠনতন্ত্রে বলা আছে, জেলা কমিটি করতে হলে কাউন্সিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে দ্বিতীয় অধিবেশনে কাউন্সিলরদের গোপন ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। অথচ বাস্তবে তার কিছুই হচ্ছে না।

ফরিদপুরের মতো একইভাবে চাঁদপুর, কক্সবাজারসহ দেশের অনেক জেলায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ইচ্ছা ও ঘোষণায় নতুন কমিটি হয়েছে। এভাবে অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দলটিতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গঠনতন্ত্রে যেভাবে বলা আছে সেভাবে গণতন্ত্রের চর্চা হয় না।

BNP-Awami-Leage

শুধু জেলা পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব তৈরিই নয়, জেলা সম্মেলনের মেয়াদ মেনে চলার ক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৩ বছর অনুযায়ী জেলা সম্মেলন হওয়ার কথা। কিন্তু অধিকাংশ জেলাতেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্মেলন হয় না। যে কারণে অতীতে অনেকবারই সব জেলার সম্মেলন শেষ না করেই কেন্দ্রীয় সম্মেলন করেছে দলটি।

সবশেষ ১৩ বছর পর গত রবিবার ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের কমিটিও দেয়া হয়েছে, তাও দেয়া হয় কেন্দ্র থেকেই। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে কমিটি ঘোষণা দেন।

এছাড়া দলের কমিটি গঠন নয়, নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রেও শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। মনোনয়ন দেয়ার সময় বাহ্যিকভাবে গণতান্ত্রিক একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলেও বাস্তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ইচ্ছার ওপর মনোনয়ন পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদেও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব পরিলক্ষিত হয়। বর্তমান মেয়াদে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের বৈঠক হয়েছে মাত্র একটি।

কিন্তু গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রাষ্ট্রের এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে প্রেসিডিয়াম সদস্যদের আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া এবং সভাপতিকে উপদেশ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। গঠনতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক প্রেসিডিয়াম সদস্যের নির্দিষ্ট দায়িত্বের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা পরিলক্ষিত হয় না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ফোরাম অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ) অনুযায়ী দলের দলের সর্বস্তরের নেতৃত্বে নারীদের অংশগ্রহণ ৩৩ শতাংশ করার বিধান আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রেও সংযোজন করা হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের ৭৩ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদে নারীর সংখ্যা মাত্র নয়জন, যা মাত্র ১২ শতাংশ।

Awamileague-Logo

এদিকে দলের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির ক্ষেত্রেও ব্যাপক হারে গঠনতন্ত্র লংঘনের ঘটনা ঘটেছে। বিধান অনুযায়ী দলের প্রতিটি সম্পাদকীয় পদের বিপরীতে ৫ জন করে উপ-সম্পাদক থাকতে পারবেন। সে অনুযায়ী আওয়ামী লীগের ১৯টি সম্পাদকীয় পদের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৯৫ জন সহ-সম্পাদক থাকতে পারবেন। কিন্তু সেখানে সহ-সম্পাদকের সংখ্যা ৬শ’ ছাড়িয়ে গেছে।

এছাড়া সহ-সম্পাদকদের নিয়োগ দেয়ার বিধান দলের সভাপতির হলেও বর্তমান কমিটির সহ-সম্পাদকদের নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে দলের দফতর সম্পাদকের স্বাক্ষরযুক্ত চিঠি দেয়া হয়েছে। যদিও দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার বিষয়ে টেলিফোনে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে চাননি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত কথা বলবেন। তবে প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একমাত্র আওয়ামী লীগেই অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা রয়েছে। এ দলের সম্মেলন নিয়মিত হয়, প্রতিটি সিদ্ধান্ত হয় আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে। আর ইউনিয়ন, থানা, জেলাসহ প্রতিটি পর্যায়ের সম্মেলন শেষ করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংগঠনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

তবে দেশব্যাপী নাশকতা এবং বিভিন্ন নির্বাচনসহ যৌক্তিক কারণেই কখনও কখনও সম্মেলন একটু পেছাতে হয়েছে, যা এবারও ঘটেছে। নাশকতায় সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের জীবন বিপন্ন করে আওয়ামী লীগ সম্মেলন করতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নুরুল আমিন বেপারি আওয়ামী লীগে গণতান্ত্রিক চর্চার প্রসঙ্গে বলেন, এ দলটি গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পরিক্রমাতেই জনগণের দলে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য আওয়ামী লীগের রয়েছে অনেক ত্যাগ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিববুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক থাকার জন্য মন্ত্রিত্ব ছেড়েছিলেন।

BNP

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দলটিকে নানা চড়াই-উতরাই পার করতে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কখনও কখনও এ দলটিতেও গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব দেখা যায়। বিরোধী দলে থাকতে পুরোপুরি চর্চা থাকলেও সরকারে থাকাবস্থায় এ দলটিতে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব পরিলক্ষিত হয়। বাকশাল গঠন এক ধরনের গণতন্ত্র পরিপন্থী উদ্যোগ ছিল বলেও মতামত দেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক তারেক শামসুর রেহমান বলেন, সিদ্ধান্ত নেয়ার সব ক্ষমতা একজন ব্যক্তির ওপর দেয়া গণতন্ত্র চর্চার অন্তরায়। যেটা আওয়ামী লীগে পরিলক্ষিত হয়। তাছাড়া একই নেতৃত্ব বারবার ঘুরেফিরে আসায় আওয়ামী লীগে গণতান্ত্রিক বিকাশ হচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।

তারেক শামসুর রেহমানের মতে, গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য দলটিতে আরও তরুণ নেতৃত্ব আসা প্রয়োজন।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আওয়ামী লীগ জনগণের দল। কিন্তু জনগণ ও দলের নেতাকর্মীরা এর মালিকানা সেভাবে ভোগ করতে পারেন না। আওয়ামী লীগে অনেক সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত হয় না, অনেক নীতি-নির্ধারণও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হয় না। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনে একটি আর্থিক হিসাব জমা দিলেও আর্থিক হিসাব-নিকাশে অস্বচ্ছতা রয়েছে।

তার মতে, শাসক দলটিতে মনোনয়নের পদ্ধতি আরও সুস্পষ্ট হওয়া উচিত। অবশ্য এক্ষেত্রে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে আওয়ামী লীগ অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, গত কয়েকটি সংসদ নির্বাচনে দলটিতে তৃণমূল থেকে প্রার্থী মনোনয়নের সুপারিশ এসেছে। কিন্তু অন্যান্য দলে সেটাও পরিলক্ষিত হয়নি।

গঠনতন্ত্রে আছে বাস্তবে নেই ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় ফেরার ঘোষণা দিলেও বিএনপি দলের ভেতরে বাস্তবিক অর্থে গণতন্ত্রের চর্চা শুরু করতে পারেনি। দলের কাণ্ডারি বলতে যাদের বোঝায় সব ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে তারাই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। দল পরিচালনায় সব ক্ষেত্রেই তাদের ইচ্ছার ওপর সবকিছু নির্ভর করে।

PM-S.-Hasina

দলের গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক পন্থায় দলীয় প্রধান থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতা নির্বাচিত হওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। শুধু সাংগঠনিক কমিটি গঠন নয়, নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া থেকে শুরু করে যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা নেই।

অনেক সময় বাইরে থেকে লোক দেখানো গণতন্ত্রের মুখোশ লাগিয়ে দেয়া হয়। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত সঠিক না হলেও তা সবাইকে মেনে নিতে হয়। পদ, পদবিসহ প্রভাব বিস্তারের কর্তৃত্ব পাওয়ার আশায় অনেকে আবার ভুল ধরিয়ে দেয়ার পরিবর্তে তোষামোদকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এ চিত্র শুধু বিএনপির ক্ষেত্রে নয়, সরকারি দল আওয়ামী লীগেও একই চিত্র।

বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলে আরও বেশি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে দলের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চার বিষয়ে এমন মতামত পাওয়া গেছে।

বিশিষ্ট আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শাহদীন মালিক বলেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমনকি সম্প্রতি শেষ হওয়া বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলেও দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার বক্তব্যে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনাসহ গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। কিন্তু তিনি নিজের দলের মধ্যেই গণতন্ত্রায়নের সুযোগ রাখেননি। কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচনের বিধান থাকলেও তা না করে সব ক্ষমতাই নিজের হাতে নিয়েছেন। তার মতো করেই নেতা নির্বাচন করছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশে গণতন্ত্র কায়েম করার কথা বলতে বলতে অনেকে মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন। কিন্তু দলের মধ্যেই কোনো গণতন্ত্র নেই। বিএনপির নেতারা এখন কোথাও বক্তব্য দিতে গেলে সবার আগে যে অভিযোগটি করেন তা হল- দেশে বর্তমানে কোনো গণতন্ত্র নেই।

বাস্তব হিসাব-নিকাশে বিএনপি নেতাদের এমন মন্তব্য সত্য হলেও আগে বিচার্য বিষয় হবে, যারা এটি বলছেন তাদের দলের মধ্যে গণতন্ত্র কতখানি আছে বা সেভাবে গণতন্ত্রের চর্চা হয় কিনা।

Khaleda10

যদি একেবারে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলের কমিটি গঠন করার ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী মূল্যায়ন না করা হয়, গোপন ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত দিনে কমিটি গঠন করা না হয় তাহলে তারা ক্ষমতায় এসে দেশে গণতন্ত্র কায়েম করবেন কীভাবে?

তারা মনে করেন, দেশ পরিচালনায় গণতন্ত্র দৃশ্যমান করতে হলে আগে তা নিজ দলের মধ্যে বাস্তবায়ন করে দেখাতে হবে। তা না হলে পাঁচ বছর পর শুধু একদিন ভোট দেয়ার জন্য গণতন্ত্র কায়েম করে লাভ হবে না। যদিও এখন তাও নেই বললে চলে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিএনপি রাজনীতিতে নতুন ধারা সৃষ্টি করবে বলে তাদের কাউন্সিলে ঘোষণা দিয়েছিল। সম্প্রতি শেষ হওয়া কাউন্সিলের দিনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সে ধারা সৃষ্টি করার সুযোগও ছিল। কিন্তু তারা সেই সুযোগ হাতছাড়া করেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের কয়েকজন বলেন, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতেই নাকি বিএনপি আন্দোলন করছে। কিন্তু নিজ দলের মধ্যে সেই চর্চা কতখানি বিদ্যমান আছে তা বিচার-বিশ্লেষণ করার সময় এসে গেছে। কেননা জনগণ পাঁচ বছর পর শুধু একদিনের জন্য দেশের মালিক হতে চান না, প্রতিটি দিন পূর্ণমাত্রায় গণতন্ত্রের সুফল ভোগ করতে চান।

তারা বলেন, রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিতে দীর্ঘদিন থেকে দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতিবাজ ও সুবিধাবাদীরা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে চলে আসছেন। যোগ্য, ত্যাগী এবং জনপ্রিয় নেতারা ছিটকে পড়ছেন। এবার কাউন্সিলের মাধ্যমে কিছুটা পরিবর্তন হলেও যেভাবে প্রত্যাশা করা হয়েছিল তা হয়নি।

সবচেয়ে বড় কথা হল, গণতন্ত্রের কথা যদি বলতে চান তাহলে কাউন্সিলের দিনই গোপন ভোটের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ নির্বাহী কমিটি গঠন করা উচিত ছিল। এভাবে কমিটি গঠিত হলে আজ এ প্রশ্ন উঠত না।

গত সোমবার সকালে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিএনপিতে গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। এ কারণে মির্জা ফখরুল একজনের ইচ্ছায় মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন।

BNP-Awami-Leaque

বিএনপির গঠনতন্ত্রে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে তিন বছরের জন্য তিনি নির্বাচিত হবেন। চেয়ারপারসনের পাশাপাশি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদেও নির্বাচনের বিধান এনে গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হয়। কিন্তু ষষ্ঠ কাউন্সিলে এ দুটি পদে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন করা হয়।

যদিও নির্বাচনে খালেদা জিয়া ছাড়া কেউ চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র কেনেননি। নিয়মানুযায়ী আর কোনো প্রার্থী না থাকায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানও একই প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হন। চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহস কোনো নেতা দেখাননি।

মহাসচিব পদে দলের অন্য নেতারা কেউ কেউ আগ্রহী হলেও কাউন্সিলরদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নেই জেনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সবাই খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে দায়িত্ব দিয়ে দেন। চেয়ারপারসন তার এই ক্ষমতাবলে পরবর্তীকালে মহাসচিবসহ নির্বাহী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে নেতাদের নাম ঘোষণা করেন।

বিএনপির দলীয় কাউন্সিলের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে কাউন্সিল অধিবেশনের মাধ্যমে অথবা কোনো কাউন্সিল অধিবেশন আয়োজন ছাড়াই শুধু দলীয় চেয়ারপারসনের ক্ষমতা প্রয়োগ করে মহাসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুবা কয়েকজনকে জাতীয় স্থায়ী কমিটি থেকে বাদ দিয়ে নতুন মুখ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় দলের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় প্রয়াত মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়াকে সরিয়ে দিয়ে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিব করা হয়। দেলোয়ারের মৃত্যুর পর বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়।

এসব ক্ষেত্রে দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের মতামত এক রকম উপেক্ষিত থেকে যায়। গঠনতন্ত্রে দলীয় প্রধানের সর্বময় ক্ষমতা থাকায় নেতারাও তার দিকেই তাকিয়ে থাকেন।BNP-Awami-League-

শুধু নেতৃত্ব নির্বাচন নয়, স্থানীয় এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও দলটিতে গণতন্ত্রের চর্চা দেখা যায় না। প্রক্রিয়াটা গণতান্ত্রিক হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে সিদ্ধান্ত আসে ভিন্নভাবে। তৃণমূলের সুপারিশের ভিত্তিতে মনোনয়ন চূড়ান্ত করার বিধান থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না।

এক্ষেত্রে শুধু লোক দেখানো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। কিন্তু সবাই জানে, দলের কোন পর্যায়ের সিদ্ধান্তে কী হয়। চলমান ইউপি নির্বাচনে তৃণমূল থেকে প্রার্থীদের সুপারিশ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রার্থী চূড়ান্তকালে সেই সুপারিশ উপেক্ষিত হচ্ছে। তৃণমূলের সুপারিশের বাইরে গিয়েও অনেককে প্রার্থী করা হচ্ছে। আর এ নিয়ে কেউ সেভাবে প্রতিবাদ করতে গেলে দেখা যাবে, তার পদই হাওয়া হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপি একটি সফল কাউন্সিল করতে পেরেছে। কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের মধ্যেও চাঙ্গা ভাব সৃষ্টি হয়েছে। তবে কাউন্সিলেই যদি দলের নেতৃত্ব নির্বাচন করা যেত তাহলে দলের ভাবমূর্তি আরও বাড়ত।

তিনি বলেন, সামনে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা বাড়াতে হবে। কারণ দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা থাকলে সমাজের সব স্তরে এর প্রতিফলন পড়বে। এদিকে নেতা নির্বাচনে দলের প্রধানকে ক্ষমতা দেয়াকে নেতিবাচকভাবে হিসেবে দেখছেন না বিএনপির অনেক নেতা।

তাদের মতে, শুধু নির্বাচনই একমাত্র গণতন্ত্রের মানদণ্ড তা নয়। আস্থা, বিশ্বাস এবং সমঝোতার মাধ্যমে দলের শৃঙ্খলা ও গতি ত্বরান্বিত করতে পারাও গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

এছাড়া শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর অনেক দেশে কিছু কিছু ব্যক্তি বা পরিবার দলের অন্যতম কাণ্ডারিতে পরিণত হয়ে গেছে। যে কারণে দলের কমিটি গঠন থেকে শুরু করে অনেক কিছুই তার মতামতের ওপর নির্ভর করে। এটি এক ধরনের স্বৈরতন্ত্র হলে তা ওই দলের জন্য বিশেষ প্রয়োজন হয়ে দেখা দিয়েছে।

তবে এ কথা অবশ্যই অনস্বীকার্য যে, সত্যিকারার্থে গণতন্ত্রের চর্চা করতে হলে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে আগে তার দলের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যোগ্যতা অনুযায়ী নেতৃত্ব গ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। তাছাড়া গণতন্ত্রের আড়ালে রাজতন্ত্র বেশিদিন টেকসই হয় না।

x

Check Also

ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬ দুর্নীতি সহায়ক, লুটেরাদের পুনর্বাসন আত্মঘাতী: টিআইবি

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক সদ্য পাস হওয়া ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনার ...