
এমএনএ ডেস্ক রিপোর্ট : ভয়াবহ ব্যবসায়িক মন্দার কবলে পড়েছে দেশের পাঁচ তারকামানের হোটেল ও অভিজাত রেস্তোরাঁগুলো। নিরাপত্তা শংকায় বিদেশী নাগরিকদের বাংলাদেশ সফর স্থগিত, সম্ভাব্য আগন্তুকদের একের পর এক বুকিং অর্ডার ক্যানসেল এবং অবস্থানরত বিদেশীদের হোটেলমুখী না হওয়াই এর মুখ্য কারণ।
একই সঙ্গে দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেমিনার-সিম্পোজিয়াম ও বিত্তবানদের ঝাঁকজমকপূর্ণ সেলিব্রেশন অনুষ্ঠান আয়োজনেও ভাটা পড়েছে। এতে করে দেশের আন্তর্জাতিকমানের সব ক’টি হোটেল ও রাজধানীর অভিজাত এলাকার মানসম্পন্ন রেস্তোরাঁগুলোর ব্যয়বহুল কর্মকাণ্ড পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্রেতার অভাবে রাজধানীর অভিজাত রেস্তোরাঁগুলো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগী হোটেল মালিক ও পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় ১৭ বিদেশী নাগরিকসহ ২৮ জনের প্রাণহানি এবং শোলাকিয়া হামলায় ৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনার নেতিবাচক ধাক্কা এসে পড়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসায়।
তারা জঙ্গি হামলার ঘটনাটিকে হোটেল ব্যবসার জন্য টর্নেডোর আঘাতের সঙ্গে তুলনা করেছেন। একই সঙ্গে বর্তমান সময়কে অস্বাভাবিক বলেও দাবি করেছেন তারা।
কর্মকর্তাদের কয়েকজন বলেছেন, ‘ঝড়ো হাওয়ার মতোই যেন তাদের সবকিছু উড়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যেখানে দিনভর ক্রেতার পদচারণায় কর্মচারীদের অবসর পাওয়ার ফুরসত ছিল না, এখন সেই ক্রেতার অভাবে এসব আন্তর্জাতিকমানের হোটেল ও অভিজাত রেস্তোরাঁর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অলস সময় কাটাচ্ছেন।’
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, রাজধানীর অনেক অভিজাত রেস্তোরাঁ ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। নতুন করে বেকারের খাতায় নাম লেখাচ্ছেন অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে গুলশানের পাঁচ তারকামানের হোটেল ওয়েস্টিনের বুকিং অর্ডার নেমে এসেছে মাত্র ১২ শতাংশে। স্বাভাবিক সময়ে এর হার ছিল ৮০ শতাংশের উপরে। কারওয়ানবাজারের প্যান-প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের বুকিং অর্ডার আগের ৮০ ভাগের স্থলে এখন ৬০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। একই দশা হোটেল র্যাডিসন, লা ম্যারিডিয়ান ও লেকশোরে।
এদিকে আসন্ন এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপের (এপিজি) ৬ দিনব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশে। বিশ্বের ৪৮টি দেশের প্রায় ৫০০ প্রতিনিধির এ সম্মেলনে যোগ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার আশংকায় এ আন্তর্জাতিক সম্মেলন
বাতিল করা হয়েছে। এতেও চরমভাবে ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়েছে র্যাডিসন ব্ল– ওয়াটার গার্ডেন, লা ম্যারিডিয়ান ও হোটেল রিজেন্সির মতো পাঁচ তারকামানের তিনটি হোটেল। যদিও এ সম্মেলন আয়োজনে সরকার এবং হোটেল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিন্দুমাত্র ঘাটতি ছিল না।
জঙ্গি হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিকমানের হোটেল ব্যবসায় কতটা ধাক্কা লেগেছে জানতে চাইলে প্যান-প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের জনসংযোগ কর্মকর্তা সালমান কবির সাংবাদিকদের বলেন, এসব হোটেল ব্যবসার প্রাণ হচ্ছেন বিদেশীরা। কিন্তু বিভিন্ন দেশ থেকে আগত এ অতিথিরাই এখন জঙ্গি হামলা ইস্যুতে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি মনে করে বাংলাদেশে আসা কমিয়ে দিয়েছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমাদের বুকিং রেটে। আগে যেখানে ৮০ শতাংশ বুকিং হতো, এখন সেটি কমে ৬০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।
তিনি অবশ্য দাবি করেন, এখনই এর প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে না। কারণ দেশে একদিকে ঈদের লম্বা ছুটি ছিল। এ সময়ে এমনিতেই বিদেশীদের আনাগোনা কম থাকে। অন্যদিকে লম্বা ছুটির পর ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা হয়ে উঠতেও একটু সময় নেয়। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বুঝে উঠার জন্য আমাদের আরও মাস দেড়েক অপেক্ষা করতে হবে। তাহলেই এর ধাক্কা কতটা পড়েছে তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর কারওয়ানবাজারের হোটেল সোনারগাঁওয়ের নিরাপত্তাকর্মীদের তৎপরতা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এরপরও এখানে আগের মতো অতিথিদের পদাচারণা ও লবিতে আড্ডার দৃশ্য চোখে পড়েনি। এ হোটেলে রুম ও স্যুটের সংখ্যা ২৭৭টি। স্ট্যান্ডার্ড, ডিলাক্স এবং প্রিমিয়ার এ তিন ধরনের রুম ও স্যুটেই দেশী-বিদেশী অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হোটেলের ৮০-৯০ শতাংশ রুম ও স্যুট বুকিং হতো। সেই সঙ্গে হোটেলের ডাইনিং রুম, ঝর্ণা গ্রিল, ক্যাফে বাজার, অ্যারোমজ, লবি লাউঞ্জ, পুল ক্যাফে, ব্যালকনিভারও দেশী-বিদেশী অতিথিদের পদচারণায় সরগরম থাকত। চলত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম। কিন্তু গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর দেশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এ হোটেলের সার্বিক পরিস্থিতিও বদলে গেছে।
লেকশোর হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির রুম সার্ভিস ছাড়া সব ধরনের সার্ভিস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। হোটেলের বাইরে এ সংক্রান্ত নোটিশ টানিয়ে রেখেছে কর্তৃপক্ষ। এর নিরাপত্তা কর্মকর্তা সেলিম জানান, গুলশানে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পর সন্ধ্যার পর থেকে কয়েকটি সার্ভিস বন্ধ ছিল। তবে এখন থেকে সব ধরনের সার্ভিস বন্ধ থাকবে।
আর নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোটেল র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রচণ্ডরকম একটা ঝড় বয়ে গেলে সেখানে কুঁড়েঘরের যে অবস্থা হয়, আমাদেরও সে অবস্থার মুখেই পড়তে হয়েছে।
তিনি এপিজি সম্মেলন বাতিল হয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে বলেন, আন্তর্জাতিক বড় একটি সম্মেলন অনুষ্ঠানের সক্ষমতা, অতিথিদের নিরাপত্তা, ভ্রমণ এবং আপ্যায়নের মতো সবরকম প্রস্তুতিই আমাদের ছিল। অতিথিদের থাকার জন্য বুকিং অর্ডারও ছিল। এর দিনকয়েক আগে এত বড় আয়োজন বাতিল হয়ে গেলে কি ধরনের ক্ষতি হয় সেটি আপনারাই আন্দাজ করে নেন। অবশ্য এসব শংকার মধ্যেও আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। কারণ জঙ্গি হামলার পর জঙ্গি দমনে সরকারের জিরো টলারেন্স মনোভাব আমাদের সেই আশ্বস্ত হওয়ার জায়গাটি তৈরি করেছে। আমরা মনে করি, হয় তো একটা খারাপ সময় পার করছি। কিন্তু সেটি ক্ষণস্থায়ী।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

