এমএনএ রিপোর্ট : নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় চার হাজার অনিয়মিত শিক্ষার্থীর একটি তালিকা এখন পুলিশের হাতে। গতকাল রবিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তালিকাটি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। এনিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন নিয়মিত হাজার দশেক শিক্ষার্থী।
ওই শিক্ষার্থীদের কে কোথায় অবস্থান করছেন, কী কারণে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত নন এবং তারা জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছেন কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে বলা হচ্ছে, দুই বছর ধরে অনুপস্থিত ও অনিয়মিত এই শিক্ষার্থীদের কেউ বিদেশে চলে গেছেন, কারও স্বজন গুরুতর অসুস্থ, কেউ ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যার কারণে পড়ালেখা ছেড়েছেন। তবে পুলিশ বলছে, তালিকায় বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনের নামও রয়েছে, যারা জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়েছেন বলে শঙ্কা গোয়েন্দাদের।
গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর নতুন করে আলোচনায় আসে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। গুলশানে সেনাবহিনীর নেতৃত্বে সমন্বিত অভিযানে
নিহত নিবরাস ইসলাম ও শোলাকিয়ায় নিহত আবীর রহমান ছিল বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র। সর্বশেষ কল্যাণপুরে পুলিশের অভিযানে নিহত নয় জঙ্গির মধ্যে অন্তত তিনজন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে জানা গেছে। এর আগে ২০১৩ সালে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যায় অংশ নেওয়া সাতজনই ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
এ পরিস্থিতিতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মিত ও দুই বছর ধরে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের তথ্য জানতে চায় সরকার। এ ছাড়া মাধ্যমিক স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে ১০ দিন অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে তারা অনিয়মিত ও অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের একটি তালিকা চেয়েছিলেন। গতকাল তালিকাটি তাদের কাছে দেওয়া হয়। এখন তালিকায় থাকা শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেওয়া হবে।
ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, অনিয়মিত বা অনুপস্থিত থাকার অর্থ এই নয় যে, তারা সবাই জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। নানা কারণেই একজন শিক্ষার্থীর পড়ালেখায় ছেদ পড়তে পারে। তবে তালিকার কয়েকজনের ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। তাদের জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। এ ধরনের তৎপরতা ও নজরদারির ফলে শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে জড়ানোর ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করেন এ কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাহিদা অনুযায়ী তারা বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে তথ্য সরবরাহ করছেন। পাশাপাশি দুই থেকে আট সেমিস্টার পর্যন্ত অনুপস্থিত ও অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। তাদের সন্তানরা কেন অনুপস্থিত তা জানতে চেয়েছেন চিঠিতে। এরই মধ্যে কিছু অভিভাবক চিঠিতে বা ই-মেইলে উত্তর দিয়েছেন।
তাদের তথ্য মতে, অনিয়মিত-অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ আর্থিক অনটন বা পারিবারিক কোনো সমস্যার কারণে পড়ালেখা ছেড়েছেন। কেউ আবার পড়ালেখার চাপ নিতে না পেরে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছেন। বিদেশেও রয়েছেন কেউ কেউ, যারা উচ্চশিক্ষার জন্য গেছেন বলে দাবি পরিবারের। এ ছাড়া সরকারের নির্দেশনা মেনে ১০ দিন অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের তালিকাও করা হচ্ছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের জঙ্গি সম্পৃক্ততার বিষয়টি আলোচনায় আসার পর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একটি তদন্ত দল। তারা রাজধানীর বারিধারায় বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাসে গিয়ে প্রায় চার ঘণ্টা উপাচার্য, শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের তালিকা চান।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জঙ্গি হামলার ঘটনায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) সাবেক ও বর্তমান একাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততার তথ্য বেরিয়ে আসার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির অনেক শিক্ষার্থীকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে। সামাজিক জীবনে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ছেন তাঁরা।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, উগ্র কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান ২৬ ছাত্র-শিক্ষকের নাম সুনির্দিষ্টভাবে এসেছে।
অ্যাকাউন্টিং বিভাগের ছাত্র সজীব সাহা বলেন, কমবেশি সবাই জানতে চায়, আসলেই এনএসইউ এ রকম কি না? অনেকে জানতে চায়, কেন কিছু শিক্ষার্থী এ রকম হয়ে যাচ্ছে? কয়েকজন সাবেক বা বর্তমান শিক্ষার্থী জড়িত কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জড়িত নয়। তাই এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া আসলে বিব্রতকর।
সামাজিক জীবনে যেমন এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়টির অনেক শিক্ষার্থীর পরিবারও সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির সপ্তম সেমিস্টারের ছাত্র বিল্লাল হোসেন যেমন বলছিলেন, পরিবার এখন বেশি ‘টেনশন’-এ থাকে। সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার ঘটনার পর থেকে তাঁর পরিবারের মতো অনেক শিক্ষার্থীর পরিবার সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকে।
আরেক শিক্ষার্থী ইভা মণি বলেন, ‘অনেকে জানতে চায়, সবার এনএসইউ নিয়ে অনেক কিউরিসিটি। পরিবারের বাইরের মানুষদের
বুঝিয়ে বলি, আমরা তো কখনো এ ধরনের কোনো কিছু দেখিনি।’
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতেও বিব্রতবোধ করেন। তাঁরা বিশেষ করে গণমাধ্যমের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলতে রাজি হন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএসই বিভাগের একজন শিক্ষার্থী বলেন, এখন নর্থ সাউথের ছাত্র শুনলে কেউ কেউ কেমন করে যেন তাকায়। এটি খুব অপমানজনক।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংকট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, নর্থ সাউথ একটি ভাবমূর্তি–সংকটে পড়েছে। তাদের শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়তে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তাদের এই ভাবমূর্তি–সংকট থেকে তাদেরই বের হয়ে আসতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, সৎভাবে তদন্ত করতে হবে। তাদের নিজস্ব পর্যালোচনা লাগবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র বা পরিচালনা বোর্ডের কেউ এ ধরনের কাজে জড়িত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারও নর্থ সাউথ নিয়ে অনেক কঠোর কথা বলছে। কিন্তু একটু বেশি বলা হয়ে যাচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। একটি ভালো প্রতিষ্ঠান দু-একজনের কর্মকাণ্ডের জন্য নষ্ট হতে পারে না।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

