
এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : নারীদের দীঘল কালো চুল যুগ যুগ ধরে প্রশংসনীয়। কিন্তু চীনের গুয়াংসি প্রদেশের হুয়াংলু গ্রামের স্থানীয় রেড ইয়াও গোষ্ঠীর কাছে নারীদের লম্বা কালো চুল তাদের ঐতিহ্যের অংশ ও অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ।
মেয়েদের চুল একটা আকর্ষণের বিষয়। শুধু তাদের চুলের ভেলকিতেই যে কতো পুরুষ পাগল হয়েছে তার কোনো শেষ নেই। আর তাই চুলের যত্নে কতকিছুই করে মেয়েরা। বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ আছে- ‘জলে চুন তাজা, তেলে চুল তাজা’। এই চুল তাজা রাখতে আরো নানারকম পদ্ধতি ব্যবহার করে বঙ্গললনারা।

তবে চুল নিয়ে চুলোচুলি কিন্তু মোটেই পছন্দ করেন না চীনের একটি সম্প্রদায়ের নারীরা। কেটেকুটে কোন বিশেষ ছাঁট দেয়া তো অনেক দূরের কথা। এদের কাছে চুলের ধর্ম শুধুই বেড়ে যাওয়া। আসলে সারা জীবনে মাত্র একবারই চুল কাটেন এই চীনা এই নারীরা। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্য।
দুই হাজার বছর ধরে চীনের গুয়াংসি প্রদেশের হুয়াংলুর গ্রামে চলে আসছে এই চুল না কাটার প্রথা। গ্রামের ইয়াও জনগোষ্ঠীর সব নারীরাই কোনোদিন নাকি চুল কাটেনি না। তাদের নিয়মে বলা আছে, ১৮ বছর বয়সে বয়সে একবার চুল কাটতে পারবে।

দেশটির গুয়াংসি প্রদেশের সিনেটিক এরিয়ায় অবস্থিত হুয়াংলু গ্রাম। রেড ইয়াও গোষ্ঠীর ৮২টি পরিবারের বসতবাড়ি এখানে। রেড ইয়াও নামকরণের কারণ- তাদের রোজকার পরিহিত লাল কাপড়। এ গোষ্ঠীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস, নারীদের লম্বা চুলের আবেশ। বস্তুত ইয়াও উপনিবেশ ‘বিশ্বের দীর্ঘতম চুলের গ্রাম’ হিসেবে একটি গিনেস সার্টিফিকেট পেয়েছে। এখানকার একশো ২০ নারীর চুলের গড় দৈর্ঘ্য সাড়ে পাঁচ ফুট। ৬০ জনের চুল ছয় থেকে সাড়ে ছয় ফুট পর্যন্ত লম্বা। আর সবচেয়ে দীর্ঘতম কেশ দৈর্ঘ্য ঠেকেছে প্রায় সোয়া সাত ফুটে। এই এতো বিশাল চুলবাহার নিয়েই দৈনন্দিন কাজকর্মও করেন প্রত্যেকে।

আগে রেড ইয়াওদের জীবনে চুল ছিলো সম্পদের মতো। এতটাই দামি যে স্বামী-সন্তান ছাড়া কেউ নারীদের খোলা চুলে চোখ রাখার অনুমতি পেতো না। তখনকার দিনে গ্রীষ্ম বা শরতে নারীরা মাথায় নীল ওড়না বেঁধে নদীতে চুল ধুতে যেতো। প্রাণেশ্বর ছাড়া এ চুলের সৌন্দর্য কাউকে দেখানো যাবে না! এটাই নিয়ম। আর ওই প্রাণেশ্বরও ওই চুল দেখতে পাবে বিয়ের মঞ্চে, এর আগে না।

যদি কোনো স্থানীয় বা বিদেশি কোনো তরুণীর চুল দেখার জন্য বাড়াবাড়ি করতো, তাহলে শাস্তি হিসেবে তিনবছর তাকে ওই তরুণীর বাড়িতে জামাই হয়ে থাকতে হতো। কিন্তু পুরনো এ ঐতিহ্যগত কড়া নিয়ম ভেঙে যায় ১৯৮৭ সালে।
এখন ইয়াও নারীরা স্বগর্বে উন্মুক্ততায় নিজের চুল আঁচড়াতে পারে। তাদের ঝলমলে কেশে চোখ রাখতেও অন্যদের মানা নেই।

নিয়ম অনুসারে হুয়াংলুর নারীরা তাদের জীবদ্দশায় শুধুমাত্র একবার চুল কাটতে পারেন। তাও আবার যখন তাদের বয়স ১৮ হয় ও অথবা তারা জীবনসঙ্গী খুঁজতে শুরু করেন তখনই চুল কাটা যাবে। কিন্তু ওই কাটা চুল ফেলে দেওয়া যাবে না। এটা ওই কিশোরীর দাদিমার হাতে দিতে হবে। এ চুল তৈরি অলঙ্কৃত শিরস্ত্রাণ ষোড়শীর বিয়ের দিন তার বরকে উপহার দেওয়ার নিয়ম প্রচলিত। পরে অবশ্য শিরস্ত্রাণটি ষোড়শীর দৈনন্দিন সাজের অংশ হয়।

বলা হয়ে থাকে, রেড ইয়াও নারীর চুলের তিনটি স্তবক। প্রথম হলো চুল যা প্রতিদিন গাজায়। দ্বিতীয়ত, কেটে ফেলা অংশ ও তৃতীয় হচ্ছে, ঝরে পড়া চুল যা রোজই সংগ্রহ করা হয়। তিন স্তবকের চুলবিন্যাস তাদের সামাজিক মর্যাদার প্রতিনিধিত্ব করে।
তবে তাদের হেয়ারস্টাইলেরও কয়েকটি মাত্রা রয়েছে। যদি কোনো নারী চুল সাধারণভাবে মাথার চারপাশে জড়িয়ে রাখে তাহলে বুঝতে হবে সে বিবাহিত। কিন্তু তার কোনো সন্তান নেই। যদি সে তার মাথায় রুমাল জড়িয়ে রাখে, তার মানে সে জীবনসঙ্গী খুঁজছে।

শত ঝামেলাতেও সত্ত্বেও বিয়ে অথবা প্রাপ্তবয়স্কা হয়ে হুয়াংলুর রেড ইয়াও নারীরা চুলকাটার একবারই অনুমতি পেয়ে থাকেন। ব্যাস! একবার তো একবারই। এরপর স্বাভাবিকভাবে চুল তাই নিজের আপন খেয়ালে বেড়েই চলে। পাশাপাশি এটাও জেনে নিন ইয়াও নারীদের চুল সতেজ রাখার জন্যও কোনো তেল লাগে না। লাগে না কোন শ্যাম্পু বা কন্ডিশনার।
চুল আকর্ষণীয় রাখতে তাদের পদ্ধতিটিও বেশ অভিনব। চুলের যত্নে রেড ইয়াও ব্যবহার করে একটি বিশেষ শ্যাম্পু। চাল ধোয়া পানি দিয়ে হয় চুলের চর্চা। আর গ্রামের পাশে দিয়ে বয়ে চলা নদীর পানিতে চুল ভালো করে ধুয়ে নেন তারা। তাতেই নাকি সব ধুলা-ময়লা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। পানি দিয়েই চলে নিয়মিত চুলের পরিচর্যা।

কিন্তু কেন তারা লম্বা চুলকে এত প্রাধান্য দেয়? কারণ তাদের বিশ্বাস- লম্বা চুল আয়ু, ধন-সম্পদ ও সৌভাগ্য বয়ে আনে। এ বিশ্বাস আর ঐতিহ্যকে প্রায় দুই হাজার বছর ধরে লালন করে আসছে হুয়াংলুর রেড ইয়াও নারীরা।
২০০৪ সালে সবচে লম্বা চুলের জন্য গিনেজ বুকে নাম লিখিয়েছিলেন এখানকার এক নারী। তার চুল ছিল ১৮ ফুটেরও বেশি লম্বা।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

