
এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : বীমার নামে দেশে একটি দুর্নীতিবাজ চক্র গড়ে উঠেছে। গ্রাহকের সঞ্চয় লোপাটসহ দেদারসে অনিয়ম আর দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত হওয়া জীবন বীমা কোম্পানীগুলোতে চলছে হরিলুট।
যাদের কাছে শত শত বীমা গ্রহীতা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। বীমা বাবদ এরা কোটি কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যত সমস্যা ক্ষতিপূরণের ক্লেইম নিয়ে। কোনো ক্লেইম তারা সহজে নিষ্পত্তি করতে চায় না। হয়রানি ও নাজেহাল করে ভুক্তভোগীদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। দাবি পূরণের ক্ষেত্রে তারা স্বেচ্ছাচারিতা ও একনায়কতন্ত্রের স্টিম রোলার চালায়।
এজন্য বীমা খাতের ৯৫ শতাংশ দাবি নিষ্পত্তি হয় না। ৫ শতাংশ নিষ্পত্তি হলেও সেখানে প্রভাবশালীদের তদবির ছাড়াও এক ধরনের অলিখিত কমিশন বাণিজ্যের মুখোমুখি হতে হয়। অথচ এসব হয়রানির বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো প্রতিকার করা হয় না। বরং অভিযোগ করলে ফল উল্টো হয়। কারণ এদের অনেকে রাজনৈতিকভাবেও প্রভাবশালী। যে কারণে তারা অন্যায় ও দুর্নীতি করে পার পেয়ে যায়। ওদিকে আইনে বীমা করা বাধ্যতামূলক। তাই অনেকে প্রয়োজন মনে না করলেও উদ্যোক্তারা বীমা করতে বাধ্য হয়।
এদিকে এ চক্রের দুর্বৃত্তরা দেদার অনিয়ম, দুর্নীতি করেও যাতে পার পেয়ে যান সেজন্য বীমা সংগঠনে সরকারের প্রভাবশালী লোকজনকে সম্পৃক্ত করে। রাতারাতি বানিয়ে দেয়া হয় পরিচালক, না হয় বসিয়ে দেয়া হয় সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে। অগত্যা সব অপরাধ মাফ।
সূত্র বলছে, গ্রাহকদের দাবি পূরণ না করে প্রভাবশালীদের পেছনে লাখ লাখ টাকা খরচ করছে বীমা কোম্পানিগুলো। রীতিমতো ভেঙে খাচ্ছে গ্রাহকের সঞ্চয়ও। সবকিছু মিলে দেশের বীমা খাতে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফলে বিশ্বব্যাপী মানুষের ঝুঁকি কমাতে বীমা করার নামে যে প্রটেকশন পদ্ধতি তৈরি তা বাংলাদেশে কোনো কাজে আসছে না। উল্টো এ সেবা লুটপাটের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটির (আইডিআরএ) জনবলও সীমিত। বলা হয়, এ কারণে তারা অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ভুক্তভোগীদের এ খোঁড়া যুক্তি মেনে নিতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় কোম্পানি অনুমোদন দেয়ায় এ খাত আরও বিশৃংখল হয়েছে। তাদের মতে, অর্থনীতির আকার অনুসারে দেশে বীমা কোম্পানি বেশি। বাংলাদেশের তুলনায় ভারতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৫০ গুণ বেশি। কিন্তু দেশটিতে বীমা কোম্পানি মাত্র ১৫টি। বিপরীতে বাংলাদেশে ৭৫টি বীমা কোম্পানি কাজ করছে।
জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, নতুন কোম্পানি অনুমোদনের আগে বিবেচনায় নিতে হবে, কোম্পানির প্রয়োজন আছে কিনা। এছাড়া আগের কোম্পানিগুলো ভালোভাবে কাজ করছে কিনা সেটাও বিবেচ্য বিষয়। তিনি বলেন, প্রয়োজনের বাইরে কোনো কাজ করলে সেখানে বিশৃংখলা হবেই। তিনি আরও বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে; না হলে কোম্পানিগুলো স্বেচ্ছাচারিতা চালাবে।
জানা গেছে, ২০১৩ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় ১৬ বীমা কোম্পানির অনুমোদন দেয় সরকার। বতর্মানে এর সবগুলোই সংকটে। এর মধ্যে বেশি সংকটে ৭টি নতুন কোম্পানি। কোম্পানিগুলো পরিচালন ব্যয় মেটাতে গ্রাহকের সঞ্চয়ের টাকার বড় একটি অংশ খরচ করে ফেলেছে। ফলে ঝুঁকিতে রয়েছেন এসব কোম্পানির গ্রাহকরা। ২০১৫ সালে ১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যবসা করেছে জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কিন্তু ব্যয় করেছে ২৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে ৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এতে করে নেতিবাচক হয়ে পড়েছে কোম্পানিটির তহবিল। এছাড়া যমুনা লাইফের ৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় ১২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এনআরবি গ্লোবাল লাইফের ৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বিপরীতে ব্যয় ৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। বেস্ট লাইফের আয় ১০ কোটি ২৩ লাখ, ব্যয় ১২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। চার্টার্ড লাইফের ৫ কোটি ৩১ লাখ টাকার বিপরীতে ব্যয় ৭ কোটি ২ লাখ টাকা। স্বদেশ লাইফের ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকার বিপরীতে ব্যয় ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং প্রটেক্টিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে ২০১৫ সালে ব্যয় করেছে ৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে আইডিআরের চেয়ারম্যান শেফাক আহমেদ বলেন, দেশে বীমার বাজার বিকাশ হচ্ছে না। তবে এ খাতে কিছুটা শৃংখলা ফিরে আসছে। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে ২১১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে দেশের জীবন বীমা কোম্পানিগুলো, যা গ্রাহকের আমানতের টাকা। তার মতে, এ প্রবণতা কমছে। তিনি আরও বলেন, বীমা কোম্পানিগুলোর এ ধরনের খরচের ফলে দীর্ঘ মেয়াদে যারা বীমা করেছেন, মেয়াদ শেষে তাদের প্রতারিত হতে হয়। আইডিআরের চেয়ারম্যানের মতে, বীমা খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল দক্ষ জনবলের অভাব।
সূত্র বলছে, নতুন কোম্পানিগুলোকে আর্থিকভাবে লাভজনক হতে বছরে অন্তত ১০ কোটি টাকার প্রিমিয়াম আয় করতে হয়। কিন্তু এসব কোম্পানি গড়ে ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা আয় করছে। ফলে আয়ের তুলনায় তাদের ব্যয় হয়েছে বেশি। এ কারণে ঝুঁকি বেড়েছে। সর্বশেষ বেসরকারি বীমা কোম্পানির লাইসেন্স দেয়া হয় ২০১৩ সালে। তখন সাধারণ এবং জীবন বীমার ১৩ কোম্পানির অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে বেশিরভাগই জীবন বীমা। এর বেশিরভাগ উদ্যোক্তা ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও তাদের ঘনিষ্ঠজন।
জানা গেছে, এ তালিকায় রয়েছে মেজর জেনারেল (অব.) হাফিজ মল্লিকের বেস্ট লাইফ, সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খানের তাইয়ো সামিট লাইফ, এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর গার্ডিয়ান লাইফ, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ফরিদুন্নাহার লাইলীর জেনিথ ইসলামী লাইফ, সংসদের সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগ নেতা মেজর (অব.) রফিকুল ইসলামের প্রটেকটিভ লাইফ, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের সোনালী লাইফ, কানাডা প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল আহাদের এনআরবি গ্লোবাল লাইফ, চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম নাসির উদ্দিনের মার্কেন্টাইল লাইফ, সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদারের সিকদার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র নেতার সুপারিশে ট্রাস্ট ইসলামী লাইফের লাইসেন্স দেয়া হয়।
জানা গেছে, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফের চেয়ারম্যান অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা জাকের আহমেদ ভূঁইয়া। আলফা ইসলামী লাইফের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে নাজিমউদ্দিন আহমেদ নামের এক গার্মেন্ট মালিককে। এর পেছনে রয়েছেন একজন প্রতিমন্ত্রী। ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লাইসেন্স পেয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান পান্না। এছাড়া স্বদেশ লাইফের লাইসেন্স পেয়েছেন শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের সভাপতি নুরুল আলম চৌধুরী।
অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিগুলোকে তিন বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারে আসার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে ১৬টি বীমা কোম্পানি অনুমোদন পায়। আর ২০১৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে শেয়ারবাজারে আসার সময়সীমা শেষ হয়েছে। কিন্তু কোনো কোম্পানিই এ পর্যন্ত আসতে পারেনি। কারণ শেয়ারবাজারে আসতে হলে প্রতিষ্ঠানকে পরপর তিন বছর লাভজনক হতে হয়। কিন্তু মুনাফা আসা তো দূরের কথা, গ্রাহকের সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে কোম্পানিগুলো।
আইডিআরএ সূত্র জানায়, দেশের ৭৫টি বীমা কোম্পানির মধ্যে জীবন বীমা ৩০টি এবং সাধারণ বীমা ৪৫টি। দু’খাত মিলিয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৪৬টি। আর এসব খাতে প্রায় ১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান। দেশের গার্মেন্ট খাতের পরে যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্মসংস্থানের খাত। অন্যদিকে বর্তমানে বীমা খাতে সম্পদের পরিমাণ ৩৫ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে জীবন বীমায় ২৯ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা এবং সাধারণ বীমায় ৫ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। ২০১৪ সাল শেষে এ খাতে বিনিয়োগের স্থিতি ২৫ হাজার ৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে জীবন বীমায় ২২ হাজার ১০৬ কোটি এবং সাধারণ বীমায় ২ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। তবে এ খাতে গ্রাহকদের বীমা দাবি পূরণ না করাসহ কোম্পানিরগুলোর বিরুদ্ধে বিশাল অভিযোগ রয়েছে।

মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

