Don't Miss
Home / হোম স্লাইডার / ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ধস ২ লাখ কোটি টাকা

২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ধস ২ লাখ কোটি টাকা

এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : ২০১০ সালের শেষদিকে দেশের শেয়ারবাজারের সূচক পৌঁছে স্মরণকালের সর্বোচ্চে। এর অল্প সময়ের মধ্যেই বাজারে বড় ধরনের ধস নামে। শেয়ারাবাজারের ওই ধসে বড় ধরনের ক্ষত তৈরি হয় দেশের অর্থনীতিতে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অর্থনৈতিক এ ক্ষতের পরিমাণ ২০১২ সালের অক্টোবর সময়ের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২২ শতাংশ বা ২৭ বিলিয়ন ডলার। ওই সময়ের মুদ্রা বিনিময় হারের (প্রতি ডলার ৮১ টাকা) হিসাবে বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ কোটি টাকার বেশি।

share-market-14শেয়ারবাজার সংস্কারে সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয় তুলে ধরতে ‘ক্যাপিটাল মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: এ সেক্টর রিফর্ম পারসপেক্টিভ’ শীর্ষক প্রতিবেদন গত মাসে প্রকাশ করে এডিবি। সংস্থাটির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক ক্ষতের এ চিত্র উঠে এসেছে। ২০১০ সালের ধসের পর বাজার মূলধন কমে যাওয়া এবং দেউলিয়াত্ব, মানুষের পুঁজি ও কর্ম হারানোর ফলে সৃষ্ট সামাজিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতের হিসাবটি করেছে এডিবি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ডিএসইর সূচক সর্বকালের শীর্ষে উন্নীত হয়। ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর ডিএসইর ওই সময়ের প্রধান সূচক ডিজিইএন ছিল ৮ হাজার ৯১৮ পয়েন্ট। তিন মাসেরও কম সময়ে ২০১১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তা ৫ হাজার ২০৩ পয়েন্টে নেমে আসে। পরবর্তী এক বছরের মধ্যে এ সূচক সর্বনিম্ন ৩ হাজার ৬১৬ পয়েন্টে নামে।

এর কারণ হিসেবে মার্জিন ঋণে শিথিলতা ও অতিরিক্ত নির্ভরতা, মানসম্মত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং না থাকা এবং আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের দুর্বলতাকে দায়ী করছে এডিবি। ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজারের ধস সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর মীমাংসা না হওয়াকেও এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।

share-market-17বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষতি সূচক ও ইনডেক্স দেখে করলে তা যথাযথ হয় না। কোনো সিকিউরিটিজের দর কমে যাওয়ার পর কেউ শেয়ার ছেড়ে না দিয়ে পরবর্তী সময়ের জন্য অপেক্ষা করলে ক্ষতির আশঙ্কা কম থাকে। কিছু বিনিয়োগকারীর অতি আগ্রাসী মনোভাবের কারণে বাজারে এ ধরনের ঘটনা ঘটে।

তিনি আরো বলেন, ওই সময় শেয়ারবাজারে ধসের পেছনে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারীসহ সব পক্ষই দায়ী ছিল। ব্যাংকের অতিরিক্ত শেয়ারের কারণে মূল্যসূচক বাড়লেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো ভূমিকা রাখেনি। শেয়ারবাজারের উল্লম্ফন চোখের সামনে হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসি বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অন্যদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

অর্থনীতিতে দেশের শেয়ারবাজার তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে মনে করছে এডিবি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ধস-পরবর্তী সময়ে (২০১১-১২) ব্যাংকে সঞ্চয়ের পরিমাণ জিডিপির ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে ইকুইটি ও বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের পরিমাণ জিডিপির মাত্র দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। অর্থনীতিতে ব্যাংকভিত্তিক অর্থায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রয়ে গেছে। ব্যাংকের সম্পদ দেশের মোট আর্থিক সম্পদের ৮০ শতাংশের বেশি।

share-market-16ফলে প্রয়োজন থাকলেও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের জন্য অর্থায়ন করতে পারেনি খাতটি। কারণ এতে ব্যাংকগুলোর ঋণ ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা ছিল। বন্ড মার্কেট জিডিপির মাত্র ৫ শতাংশ। এর মধ্যে সরকারের বন্ড জিডিপির ৪ শতাংশ ও করপোরেট বন্ড মার্কেট জিডিপির ১ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় এটি অত্যন্ত কম।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আহমেদ রশীদ লালী বলেন, বাজারে বিনিয়োগকারীদের কিছু ভুলভ্রান্তি থাকবে। তবে ওই সময় বাজারধসের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকই মূলত দায়ী। ২০০৬ সাল থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ শুরু করার পর ২০১০ সালের মধ্যে অনেকেই তাদের বিনিয়োগসীমা ১০ শতাংশ অতিক্রম করে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে গেছে। পরবর্তীতে বাজারধসের সময় তা এক মাসের মধ্যে সমন্বয় করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশ দেয়ায় শেয়ারবাজার বিরাট অংকের বিক্রয় চাপ সহ্য করতে পারেনি।

২০১০ সালের ধসের ঘটনার পর বেশকিছু আইনি পদক্ষেপ নেয় সরকার। এর অংশ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, বাজার পুনর্গঠনে তহবিল গঠন, স্টক এক্সচেঞ্জের ডিমিউচুয়ালাইজেশন, ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন পাস ও বিএসইসির আইন সংশোধন করা হয়। পাশাপাশি শেয়ারবাজার উন্নয়নে সরকারের সঙ্গে ক্যাপিটাল মার্কেট মাস্টারপ্ল্যান (২০১২-২২) বাস্তবায়ন করছে এডিবি।

dse-share-fallক্যাপিটাল মার্কেট মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় যেসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে— এ খাতের মধ্যস্থতাকারীদের অবস্থান সুসংহত করা, প্রাইমারি ডিলার ব্যবস্থার সংস্কার, কেন্দ্রীয় ক্লিয়ারেন্স ও সেটেলমেন্ট সিস্টেম স্থাপন এবং বীমা কোম্পানিগুলোর পুনঃঅর্থায়ন।

২০১৭ সালে মধ্যস্থতাকারীদের জন্য ঝুঁকিভিত্তিক বিনিয়োগ বিধিমালা প্রবর্তন ও পুনঃঅর্থায়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সংহত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি টিকে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোয় পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী করার বিষয়টিও নিশ্চিত হবে।

কেন্দ্রীয় ক্লিয়ারেন্স ও সেটেলমেন্ট সিস্টেম স্থাপনের জন্য লাইসেন্স দিতে ২০১৭-১৮ সালের মধ্যেই বিএসইসির প্রয়োজনীয় আইনি পরিকাঠামো অনুমোদন দেয়ার কথা রয়েছে। এতে ডেরিভেটিভ কন্ট্রাক্টের সেটেলমেন্ট গ্যারান্টার হিসেবে একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে। এছাড়া ওই সময়ের মধ্যে ডেরিভেটিভের জন্য বিধিমালা প্রবর্তন করা হলে সুদহার ও মুদ্রা বিনিময়ের মতো বিভিন্ন ইনস্ট্রুমেন্টের উন্নয়ন ঘটবে।

শেয়ারবাজার শক্তিশালীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সিএমডিপি-২ (সেকেন্ড ক্যাপিটাল মার্কেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম) ও সিএমডিপি-৩। এরই মধ্যে বাজারকে স্থিতিশীল করতে সিএমডিপি-২-এর আওতায় বেশকিছু সংস্কার আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদান ও ইকুইটি এক্সপোজার-বিষয়ক নীতিমালা। এছাড়া সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিধিমালা প্রবর্তনের মাধ্যমে টেকসই বাজার উন্নয়নের ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে সিএমডিপি-২। বন্ড ও ইকুইটি বাজার উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখায় উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরিতে অর্থের জোগান বাড়াবে সিএমডিপি-২ ও ৩।

ট্যাগ : ২০১০ সালে, পুঁজিবাজারে, ধস, ২ লাখ কোটি টাকা
x

Check Also

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত চালুতে সরকারের জোর তৎপরতা: উপদেষ্টা মাহদী

এমএনএ প্রতিবেদক মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় চালু করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে ...