এমএনএ বিনোদন ডেস্ক : চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী নায়করাজ রাজ্জাক আর নেই। আজ সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ১৩ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।
বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতাল সূত্র জানায়, আজ সোমবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে হার্ট অ্যাটাক হওয়া অবস্থায় নায়ক রাজ্জাককে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সব ধরনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। ৬টা ১৩ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
নায়ক রাজ্জাক পাঁচ সন্তানসহ বন্ধু-বান্ধব ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া শোক প্রকাশ করেছেন।
নায়করাজ রাজ্জাক প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন ‘কি যে করি’ ছবিতে অভিনয় করে। এরপর আরও চারবার তিনি জাতীয় সম্মাননা পান। ২০১১ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনি আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কার পেয়েছেন অসংখ্যবার। পেয়েছেন ইফাদ ফিল্ম ক্লাব পুরস্কারসহ আরও অসংখ্যা সম্মাননা।
দেশভাগের পরে ১৯৬৪ সালে সেইসময়ের পূর্বপাকিস্তানে চলে আসেন সপরিবারে। টেলিভিশনে ‘ঘরোয়া’ নামের একটি নাটকে অভিনয় করে দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেন। সিনেমায় অভিনয়ের আগে সহকারী পরিচালনা করেছিলেন আবদুল জব্বার খানের অধীনে।

দমফাঁটানো হাসির সিনেমা ফেকু ওস্তাগড় লেন সিনেমায় ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করে সবার নজর কাড়েন। এরপর কার বউ, ডাক বাবু, আখেরী স্টেশন-সহ আরও বেশ ক’টি ছবিতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয়ও করে ফেলেন। পরে বেহুলা চলচ্চিত্রে তিনি নায়ক হিসেবে ঢালিউডে উপস্থিত হন সদর্পে। তিনি প্রায় ৩০০টি বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। পরিচালনা করেছেন প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র। জহির রায়হান পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী বিপ্লবী সিনেমা ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় ‘ফারুক’ চরিত্রটি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্রে খুব কমই অভিনয় করছেন নায়করাজ রাজ্জাক। শুধু নায়ক হিসেবেই নয়, পরিচালক হিসেবেও বেশ সফল। ‘আয়না কাহিনী’ ছবিটি নির্মাণ করেন রাজ্জাক। নায়ক হিসেবে নায়করাজ প্রথম অভিনয় করেন জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’ ছবিতে। এতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন সুচন্দা।
‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘রংবাজ’, ‘বাবা কেন চাকর’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘জীবন থেকে নেওয়া’ ‘পিচঢালা পথ’, ‘অশিক্ষিত’, ‘বড় ভালো লোক ছিল’সহ অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করা রাজ্জাক সর্বশেষ অভিনয় করেছেন ছেলে বাপ্পারাজ পরিচালিত ‘কার্তুজ’ ছবিতে।
চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ ডাকলে তাতে সাড়া দিতেন রাজ্জাক। আমৃত্যু এই শিল্পের সঙ্গেই থাকতে চাওয়ার কথা জানিয়ে একসময় বলছিলেন, ‘আমি রাজ্জাক হয়তো অন্য কোনো চাকরি করতাম অথবা ঘুরে বেড়াতাম। কিন্তু ছোটবেলার অভিনয় প্রচেষ্টাকে আমি হারাতে দিইনি। আমি নাটক থেকে চলচ্চিত্রে এসেছি। সবাই আমাকে চিনেছে। পেয়েছি সাফল্যও। বাংলার মানুষজন আমাকে একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবেই দেখেন ও আমাকে ভালোবাসেন। আজকে আমার যা কিছু হয়েছে, সবই এই চলচ্চিত্রশিল্পের কল্যাণে।’
রাজ্জাক এ–ও বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের ছোট একটি দেশ হতে পারে, তারপরও এই দেশের একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে আমি গর্ববোধ করি। যাঁদের জন্য আমি রাজ্জাক হয়েছি, আমি সব সময় তাঁদের কাছাকাছি থাকতে চাই।’
১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন কিংবদন্তি নায়ক রাজ্জাক।

এক নজরে রাজ্জাক
নাম : আবদুর রাজ্জাক।
উপাধি : নায়করাজ (উপাধি দিয়েছিলেন চিত্রালি সম্পাদক আহমেদ জামান চৌধুরী)।
জন্ম : ২৩ জানুয়ারি, ১৯৪২।
জন্মস্থান : নাকতলা, দক্ষিণ কলকাতা, ভারত।
জাতীয়তা : বাংলাদেশি।
বাবা : আকবর হোসেন।
মা : নিসারুননেছা।
স্ত্রী : খাইরুন্নেছা (ভালোবেসে লক্ষ্মী বলে ডাকতেন)।
সন্তান : বাপ্পারাজ (রেজাউল করিম), নাসরিন পাশা শম্পা, রওশন হোসেন বাপ্পি, আফরিন আলম ময়না, খালিদ হোসেইন সম্রাট।
পেশা : অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক।
অভিনয়ের শুরু : কলকাতার খানপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন সরস্বতীপূজায় মঞ্চনাটকে। গেম টিচার রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁকে বেছে নিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে। প্রথম অভিনীত নাটক ‘বিদ্রোহী।’
সিনেমায় প্রবেশ : কলেজজীবনে ‘রতন লাল বাঙালি’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে। এ ছাড়া কলকাতায় ‘পঙ্কতিলক’ ও ‘শিলালিপি’ নামে আরও দুটি সিনেমায় অভিনয় করেন।
বাংলাদেশে আগমন : ১৯৬৪ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কারণে পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন।
ঢালিউডে নায়ক হিসেবে প্রথম চলচ্চিত্র : জহির রায়হানের ‘বেহুলা’।
প্রথম নায়িকা : সুচন্দা।
জুটি হিসেবে জনপ্রিয় নায়িকা : কবরী
নায়ক হিসেবে শেষ ছবি : ১৯৯০ সাল পর্যন্ত নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছেন। শেষ ছবি ‘মালামতি’। নায়িকা ছিলেন নূতন।
চরিত্রাভিনেতা হিসেবে অভিনয় : ১৯৯৫ সাল থেকে।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র : ‘এতটুকু আশা’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘নাচের পুতুল’, ‘পিচঢালা পথ’, ‘আবির্ভাব’, ‘দ্বীপ নেভে নাই’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘রংবাজ’, ‘আলোর মিছিল’, ‘অশিক্ষিত’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘শুভদা’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ ‘বড় ভালো লোক ছিল’, ’বাবা কেন চাকর’।
পুরস্কার ও সম্মাননা : ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বেশ দাপটের সাথেই ঢালিউডে সেরা নায়ক হয়ে অভিনয় করেন রাজ্জাক। এর মধ্য দিয়েই তিনি অর্জন করেন নায়করাজ রাজ্জাক খেতাব। অর্জন করেন একাধিক সম্মাননা। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একাধিক বার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, বাচচাস পুরস্কারের ভূষিত হয়েছেন নায়করাজ। এছাড়াও, রাজ্জাক জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে কাজ করছেন।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

