এমএনএ রিপোর্ট : বানের জলে ভেসে আসা হাতি ‘বঙ্গ বাহাদুর’কে নিয়ে আর কাউকে ভাবতে হবে না। জামালপুরের সরিষাবাড়ী থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যেই অবশেষে আজ মঙ্গলবার মারা গেছে হাতিটি। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে হাতিটি নিথর হয়ে যায়। গতকাল সোমবার থেকেই এটি অসুস্থ ছিল।
ভারতের আসাম থেকে বানের পানিতে ভেসে আসা বুনো হাতিটি থামানো গিয়েছিল বহু চেষ্টার পর, নাম দেওয়া হয়েছিল বঙ্গ বাহাদুর। আজ সকালে সরিষাবাড়ি উপজেলার কয়রা গ্রামের বাদা বিলে ‘বঙ্গ বাহাদুর’-এর মৃত্যুতে এলাকাবাসীর অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
ঢাকার বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক অসীম মল্লিক হাতিটি মারা যাওয়ার তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
এক মাসের বেশি সময় ধরে পিছু পিছু ঘোরার পর গত ১১ অগাস্ট ট্রাঙ্কুলাইজার দিয়ে অচেতন করে ডাঙ্গায় তোলা হয় হাতিটিকে। পায়ে শিকল ও রশি দিয়ে একটি আমগাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে শুরু হয় সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া।
পরিকল্পনা ছিল, সাফারি পার্কে ছেড়ে দেওয়া হবে তাকে। কিন্তু কীভাবে তা করা হবে, তা নিয়ে চিন্তায় ছিলেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
এরই মধ্যে গত রবিবার সকালে হাতিটি পায়ের শেকল ছিঁড়ে ছুট দিলে আবারও ট্রাঙ্কুলাইজার দিয়ে অচেতন করা হয়। কয়েক ঘণ্টা পর হুঁশ ফিরলেও অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকে।
গতকাল সোমবার কড়া রোদের মধ্যে অসুস্থ বঙ্গবাহাদুর বাইদ্যা বিলের কাদাপানিতে পড়ে যায়। সন্ধ্যা পর্যন্ত ১২টি স্যালাইন দেওয়া হয়, হাতিটি সুস্থ করে তুলতে চলে চিকিৎসা, সেবা। শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে হাতির গায়ে পানি ছিটানোরও ব্যবস্থা হয়।
উদ্ধারকারী দলের সহকারী পশু চিকিৎসক মোস্তাফিজুর রহমান গতকাল সোমবারও বলেছিলেন, অসুস্থ হয়ে পড়লেও তারা বঙ্গবাহাদুরে জীবনশঙ্কা করছেন না। দেড়মাসের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় এক হাজার আটশ কিলোমিটার পথ হাতিটি অতিক্রম করেছে। পর্যাপ্ত খাবার, ঘুম ও সঙ্গীহীন হয়ে পড়ায় হাতিটির দুর্বল হয়ে পড়া স্বাভাবিক।
‘বঙ্গবাহাদুর’কে কলাগাছ, কলা, আখ, গুড়, বাঁশপাতাসহ পর্যাপ্ত খাবার, স্যালাইন ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
যত্ন চললেও উদ্ধারকারী দলের বড় দুশ্চিন্তা ছিল বুনো হাতিটিকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া। পাঁচ টন ওজনের এই পুরুষ হাতিকে সরিয়ে নিতে ট্রাক ও ক্রেন ব্যবহারের কথা ভাবা হলেও কয়রা গ্রামের এক কিলোমিটারের মধ্যে রাস্তা না থাকায় তা সম্ভব ছিল না।
বঙ্গবাহাদুরকে হাঁটিয়ে সড়ক পর্যন্ত নিতে তাকে বশ মানানোর জন্যে আনা হায় মাহুত। সেই কৌশল কাজে লাগাতে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক থেকে একটি ও চট্টগ্রাম থেকে ব্যক্তি মালিকানাধীন তিনটি হাতি আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন উদ্ধারকারী দলের প্রধান তপন কুমার দে।
তবে তাদের সব উদ্যোগ ব্যর্থ করে দিয়ে আজ মঙ্গলবার সকালে মারা যায় হাতিটি।
ধরা পড়ার পর এই পাঁচদিন হাতিটিকে সুস্থ করে তুলতে উদ্ধারকারীদের সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে গেছে কয়রা গ্রামের মানুষ। বঙ্গবাহাদুরের এমন মৃত্যুয় মেনে নিতে পারছেন না তারা।
কক্সবাজারের ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গতকাল তাপমাত্রা বেশি থাকায় ‘বঙ্গ বাহাদুর’ অসুস্থ হয়ে কাদাপানিতে পড়ে যায়। সন্ধ্যা পর্যন্ত হাতিটির শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে ১২টি স্যালাইন দেওয়া হয়। হাতিটিকে সুস্থ করে তুলতে সব ধরনের চিকিৎসা ও সেবা দেওয়া হয়েছিল।
কামরাবাদ ইউনিয়নের কয়ড়া গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মুকুল মিয়া বলেন, ‘এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সেবা দিয়েও “বঙ্গ বাহাদুর”কে বাঁচাতে পারলাম না। আমাদের কাঁদিয়ে সে অজানার পথে পাড়ি দিয়েছে।’
কয়রা গ্রামের বাসিন্দা হাজী বরকতুল্লাহ (৬০) বলেন, ‘বানের পানিতে আমার দুই বিঘা জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। তাতে আমার কষ্ট নেই। কিন্তু হাতিটি মরে যাওয়ায় কষ্ট পেয়েছি।’
খোদেজা বেগম (৫০) বলেন, ‘গ্রামবাসীর অনেকেই কেঁদেছে। পাঁচ দিন ধরে লোকজনের জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করেছি। কিন্তু হাতি মরে যাওয়ার কান্না চেপে রাখছে পারছি না।’
শুভা বেগম (৩৫) বলেন, ‘হাতিটি কারও কোনো ক্ষতি করেনি। আজ আমাদের কাঁদিয়ে চলে গেল।’
একই গ্রামের গৃহিণী ছাহেরা বেগমের অভিযোগ, হাতিটিকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয়নি। কয়েকটা করে আখ দেওয়া হত। দুই-একটা কলাগাছ। এই খেয়ে কি অত বড় হাতির জান বাঁচে? বন বিভাগের লোকজনের অবহেলায় হাতিটা মরে গেল।
কামরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মুনসুর আলী খান বলেন, ‘১৯ দিন ধরে হাতিটি আমার ইউনিয়নে অবস্থান করছিল। সব ধরনের সহযোগিতা করেছি। মারা যাওয়ায় কষ্ট পেয়েছি।’
হাতিটিকে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাফারি পার্কে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তাকে উদ্ধারের জন্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই থেকে দুটি বড় হাতি আনার কথা ছিল। আজ সকালেই হাতিগুলোর সরিষাবাড়ী পৌঁছানোর কথা। তার আগেই চলে গেল বঙ্গ বাহাদুর।
গতকাল পায়ে শিকল পরাতে গেলে ‘বঙ্গ বাহাদুর’-এর লাথিতে গাজীপুরের সাফারি পার্কের হাতির রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত এক কর্মী গুরুতর আহত হন। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
গত বৃহস্পতিবার হাতিটিকে প্রথমবার চেতনানাশক ওষুধ দেওয়া হয়। এরপর চার পায়ে শিকল ও রশি দিয়ে কয়ড়া গ্রামের একটি আমগাছে বেঁধে রাখা হয়। গত শনিবার শিকল ছিঁড়ে হাতিটি পালানোর চেষ্টা করে। গত রবিবার দ্বিতীয় দফায় চেতনানাশক দিয়ে চার পায়ে শিকল পরানো হয়। কয়ড়া গ্রামের খোলা মাঠে কাদাপানিতে বেঁধে রাখা হয়। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাতিটি অসুস্থ হয়ে শিকল পরা অবস্থায় কাদাপানিতে হঠাৎ পড়ে যায়।
বানের জলে ভেসে গত ২৬ জুন ভারতের আসাম হয়ে বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম সীমান্তে আসার পর বার বার স্থান বদলে নিয়মিত সংবাদের শিরোনামে এসেছে এই বুনো হাতি।
কুড়িগ্রামের রৌমারীতে হাতিটি ছিল ৯ জুলাই পর্যন্ত। ১০ থেকে ১৩ জুলাই গাইবান্ধায়, ১৪-১৬ জুলাই জামালপুরে, ১৭-১৮ জুলাই বগুড়ায়, ১৯-৩০ জুলাই সিরাজগঞ্জে এবং তারপর ৩১ জুলাই থেকে আবার জামালপুরে চষে বেড়ায় সে। এই পুরো সময় হাতির পেছনে ছিল উৎসুক জনতার ভিড়।
দেড় মাসের বেশি সময় ধরে নদী ও স্থলপথ মিলিয়ে চার জেলার দেড় হাজারের বেশি কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে হাতিটি। ৩ অগাস্ট ভারতীয় একটি দল এসে উদ্ধার কাজে হাত লাগালেও ব্যর্থ হয়ে ভারতে ফিরে যায় তারা।
খাবারের প্রলোভনে সাড়া না দেওয়ায় বুনো হাতিটিকে বশে আনতে পোষা একটি মাদী হাতিও আনা হয়েছিল। কিন্তু উল্টো পোষা হাতিটিকে তাড়িয়ে দেয় বঙ্গবাহাদুর।
১১ অগাস্ট প্রথমে ‘প্লাস্টিক ডার্ট’ ছুড়লে তা হাতির গায়ে লেগে বেঁকে যায়। এরপর সরিষাবাড়ীর কয়রা গ্রামে ‘মেটাল ডার্ট’ ছুড়ে হাতিটি অচেতন করা হয়।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

