Don't Miss
Home / হোম স্লাইডার / অবিসংবাদিত কমিউনিস্ট নেতা ফিদেল কাস্ত্রো

অবিসংবাদিত কমিউনিস্ট নেতা ফিদেল কাস্ত্রো

এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : একজন অবিসংবাদিত কমিউনিস্ট নেতা ফিদেল আলেসান্দ্রো কাস্ত্রো রুজ (ফিদেল কাস্ত্রো)-এর চলে যাওয়া বিশ্ব সাম্যবাদী বিপ্লবীদের ভারাক্রান্ত, ব্যথিত করে তুলেছে। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এই নেতা স্থানীয় সময় শুক্রবার কিউভার হাভানায় ৯০ বছর বয়সে মারা যান।

মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ)-এর পাঠক-পাঠিকাদের জন্য এই সাম্যবাদী বিপ্লবীদের নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সংক্ষিপ্ত জীবনী নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন মোসাম্মেৎ সেলিনা হোসেন

প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে এক দল বিশিষ্ট কিউবার শাসন ক্ষমতায় ছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো। সারা বিশ্বে যখন কমিউনিস্ট সরকারগুলো ধসে পড়ছে ঠিক তখন কমিউনিস্ট ব্যবস্থার বৃহত্তম শত্রু বলে পরিচিত আমেরিকার দোরগোড়াতেই সমাজতন্ত্রের পতকা তুলে ধরে রেখেছিলেন তিনি।

fidel-castra-9কাস্ত্রোর সমর্থকেরা তাকে সমাজতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখতেন। তাদের মতে, তিনি জনগণের কাছে কিউবাকে ফেরত দিয়েছিলেন।

তবে তার বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রতি চরম দমন-পীড়নের অভিযোগও রয়েছে।

১৯২৬ সালের ১৩ অগাস্ট জন্ম হয় ফিদেল কাস্ত্রোর। স্পেন থেকে কিউবাতে আসা একজন ধনী কৃষক আনহেল মারিয়া বাউতিস্তা কাস্ত্রোর সন্তান ছিলেন তিনি।

সান্টিয়াগোর ক্যাথলিক স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু হয় ফিদেলের। পরে তিনি যোগ দেন হাভানার কলেজ এল কলেজিও ডে বেলেন-এ।

তবে খেলাধুলার দিকে বেশী মনযোগ থাকার কারণে পড়াশোনায় খুব ভাল করতে পারেননি তিনি। ১৯৪০ এর দশকে হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়বার সময়ে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।

১৯৪৮ সালে মির্তা দিয়াজ বালার্তকে বিয়ে করেন কাস্ত্রো। তাঁদের সংসারে ফিদেলিতো নামের এক ছেলে রয়েছে। পরে মির্তার সঙ্গে কাস্ত্রোর বিচ্ছেদ ঘটে।

১৯৫২ সালে নেরি রেভুয়েলতা নামের এক চিকিৎসককে বিয়ে করেন কাস্ত্রো। ১৯৫৬ সালে তাঁদের সংসারে আসে কন্যাসন্তান আলিনা।

১৯৫৭ সালে সেলিয়া সানচেজের সঙ্গে পরিচয় হয় কাস্ত্রোর। তিনি বলতেন, সেলিয়াই তাঁর জীবনের ভালোবাসা। ১৯৮০ সালে মারা যান সেলিয়া। এরপর কাস্ত্রোর জীবনসঙ্গী হন ডালিয়া সোতো ডেল ভাল্লে। তাঁদের সংসারে পাঁচ সন্তান—অ্যাঞ্জেল, অ্যান্তোনিও, আলেজান্দ্রো, আলেক্সিস ও আলেক্স।

fidel-castra-12মার্ক্সবাদ

১৯৪৮ সালে কিউবার ধনী এক রাজনীতিবিদের কন্যা মার্টা ডিয়াজ বালার্টকে বিয়ে করেন ফিদেল কাস্ত্রো। এই বিয়ের মাধ্যমে দেশটির এলিট শ্রেণীতে যুক্ত হয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল তার। কিন্তু তার বদলে তিনি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেলেন মার্ক্সবাদে।

কাস্ত্রো বিশ্বাস করতেন, কিউবার লাগামহীন পুঁজিবাদের কারণে দেশটির যাবতীয় অর্থনৈতিক সমস্যার উদ্ভব এবং একমাত্র জনগণের বিপ্লবের মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকানোর পর আইন পেশা শুরু করেন। কিন্তু এই পেশায় তিনি সফল হতে ব্যর্থ হন। ফলশ্রুতিতে দেনায় ডুবে যান তিনি।

এই পরিস্থিতিতেও রাজনীতি অব্যাহত রাখেন কাস্ত্রো। প্রায়ই সহিংস বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়তেন তিনি।

আক্রমণ

১৯৫২ সা ফুলগেন্সিও বাতিস্তা একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট কার্লোস প্রিয়র সরকারকে উচ্ছেদ করেন। বাতিস্তার সরকারের নীতি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মতই, যা ছিল কাস্ত্রোর বিশ্বাসের পরিপন্থী।

ফলে বাতিস্তা সরকারকে উৎখাতের জন্য তিনি একটি গোপন সংগঠন গড়ে তোলেন যার নাম ‘দ্য মুভমেন্ট’।

এসময় কিউবা পরিণত হয়েছিল উচ্ছৃঙ্খল ধনীদের স্বর্গরাজ্যে। যৌন ব্যবসা, জুয়া এবং মাদক চোরাচালান চরম আকার ধারণ করেছিল।

সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে সান্টিয়াগোর কাছে মোনাকাডা সেনা ছাউনিতে একটি আক্রমণের পরিকল্পনা করেন কাস্ত্রো।

fidel-castra-3আক্রমণটি ব্যর্থ হয় এবং বহু বিপ্লবী হয় নিহত হয় নয়তো ধরা পড়ে। বন্দীদের মধ্যে কাস্ত্রোও ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তার বিচার শুরু হয়।

বিচারের শুনানিগুলো কাস্ত্রো ব্যবহার করতেন সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের ঘটনাবলী ফাঁস করে দেয়ার মঞ্চ হিসেবে। ওই সময় শুনানিগুলোতে বিদেশী সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ছিল। ফলে কাস্ত্রোর জনপ্রিয়তা এসময় বেড়ে যায়।

কাস্ত্রোকে অবশ্য ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত। আদালতের শুনানিতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে দোষী সাব্যস্ত করুন, এটা কোনো ব্যাপার না। ইতিহাস আমাকে মুক্তি দেবে।’

গেরিলা যুদ্ধ

সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে ১৯৫৫ সালের মে মাসে জেল থেকে ছাড়া পান কাস্ত্রো। জেলে থাকার সময়েই স্ত্রীকে তালাক দেন তিনি এবং মার্ক্সবাদে আরো ভালোভাবে জড়িয়ে পড়েন।

ছাড়া পাওয়ার পর ফের গ্রেফতার এড়াতে মেক্সিকো পালিয়ে যান তিনি। সেখানে তার পরিচয় হয় আরেক তরুণ বিপ্লবী আরনেস্তো চে গুয়েভারার সঙ্গে।

এরপর ১৯৫৬ সালের নভেম্বরে ১২ জন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ইঞ্জিন নৌকায় ৮১ জন সশস্ত্র সঙ্গীকে নিয়ে কিউবায় ফিরে আসেন ফিদেল কাস্ত্রো।

তারা সিয়েরা মায়েস্ত্রা পাহাড়ে আশ্রয় নেন এবং এখান থেকে হাভানার সরকারের বিরুদ্ধে দুই বছর ধরে গেরিলা আক্রমণ চালান। ১৯৫৯ সালের দোসরা জানুয়ারি বিদ্রোহীরা হাভানায় প্রবেশ করে। বাতিস্তা পালিয়ে যান।

এসময় বাতিস্তার বহু সমর্থককে বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এসব বিচার কার্যক্রমকে অনেক বিদেশী পর্যবেক্ষকই ‘অনিরেপক্ষ’ বলে মনে করেন।

fidel-castra-5আদর্শ

কিউবার নতুন সরকার জনগণকে সব জমি বুঝিয়ে দেবার এবং গরীবের অধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে দেশে একটি এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা হয়।

রাজবন্দী হিসেবে বহু মানুষকে কারাগারে এবং শ্রম শিবিরে প্রেরণ করা হয়। হাজার হাজার মধ্যবিত্ত কিউবান বিদেশে পালিয়ে নির্বাসন নেন।

১৯৬০ সালের কিউবাতে থাকা সকল মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে নিয়ে নেয়া হয়। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার উপর একটি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা একবিংশ শতক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের এক নম্বর শত্রু

বিপ্লবের সময় তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া এবং এর নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের সঙ্গে মিত্রতা তৈরি হয় কাস্ত্রোর। ফলে কিউবা পরিণত হয় ঠাণ্ডা যুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্রে।

একদল নির্বাসিত কিউবানকে দিয়ে দ্বীপটি দখল করিয়ে নেয়ার মাধ্যমে ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র কাস্ত্রো সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা চালায়। ওই চেষ্টা ব্যর্থ হয়, বহু মানুষ এসময় নিহত হয়। হাজারখানেক মানুষ ধরা পড়ে।

এই ঘটনা পরবর্তীতে কিউবা নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ফিদেল কাস্ত্রো আমেরিকার এক নম্বর শত্রুতে পরিণত হন। সিআইএ তাকে হত্যার চেষ্টাও করে।

কাস্ত্রোকে ৬৩৮ বার হত্যার চেষ্টা

৯০ বছরের জীবনে ফিদেল কাস্ত্রোকে ৬৩৮ বার হত্যার চেষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর চরেরা এই চেষ্টা চালায়। হত্যার ষড়যন্ত্র বেশির ভাগই করা হয় তাঁর শাসনামলের শুরুতে। বহু বিদ্রোহের পর কিউবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৫৯ fidel-castra-7সালে দায়িত্ব নেন ফিদেল কাস্ত্রো। ২০০৮ সালে তাঁর ভাই রাউল কাস্ত্রোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেন ফিদেল।

কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা বেশির ভাগই হয় ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে। এ সময়ে পাঁচটি ভাগে সিআইএ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র বিভাগ তাঁকে হত্যার বিভিন্ন চেষ্টা চালায়। তাঁকে কিউবার সিংহাসন থেকে নামাতে নেওয়া হয় ‘অপারেশন মঙ্গুজ’ পরিকল্পনা।
ফেবিয়ান এসকালান্তে ফিদেলের নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন। ৪৯ বছরের শাসনামলে পুরো সময় তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তাঁর তথ্যমতে, ৬৩৮ বার কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা করে সিআইএ। প্রতিটি ষড়যন্ত্র ছিল অভিনব।

এসব ষড়যন্ত্রের মধ্যে জটিল ছিল কাস্ত্রোর চুরুটের মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য রাখা। নিউইয়র্কের এক পুলিশ কর্মকর্তা কাছ থেকে এই ফন্দি নেয় সিআইএ। ওই চুরুটের মধ্যে যে পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য রাখা হয়, তা তাঁর মাথা উড়িয়ে দেওয়ার মতো। এ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। কাস্ত্রোকে দুর্বল করতে একবার তাঁর জুতো ও চুরুটের মধ্যে রাসায়নিক দ্রব্য রাখা হয়। এর প্রভাবে তাঁর শরীরের সব চুল পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। বিভিন্ন সময়ে তাঁর খাবারে বিষ রেখে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তাঁর ব্যবহৃত কলমে বিষযুক্ত সুচ রেখে ও পোশাকে জীবাণু ছড়িয়েও তাঁকে হত্যার চেষ্টা চালায় সিআইএ।

সিআইএর আরেকটি ষড়যন্ত্র ছিল সাবেক স্ত্রী মিরতাকে হাত করে কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা। বিষযুক্ত ক্যাপসুল দিয়ে তাঁকে হত্যা করার ফন্দি আঁটা হয়। কোল্ডক্রিমের কৌটায় রাখা হয় এই ক্যাপসুল। কিন্তু এ ষড়যন্ত্রের কথা জেনে ফেলেন কাস্ত্রো। তিনি মিরতার হাতে পিস্তল তুলে দিয়ে তাঁকে বিষ দিয়ে নয়, সরাসরি গুলি করে হত্যা করতে বলেন। মিরতা তা পারেননি।

শুধু হত্যার চেষ্টাই নয়, কাস্ত্রোর ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টাও কম করেনি সিআইএ। একবার এক বেতারকেন্দ্রে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন ফিদেল। এ সময় স্টুডিওতে নেশাজাতীয় দ্রব্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর প্রভাবে অদ্ভুত আচরণ করেন ফিদেল। বিচলিত হয়ে পড়ে পুরো কিউবা। তবে এবারও ব্যর্থতার পাল্লা ভারী হয় সিআইএর।

fidel-castra-11প্রেসিডেন্ট হিসেবে শাসনামলের শেষের দিকে ২০০০ সালে পানামা সফরে যান কাস্ত্রো। সেখানেও তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। একটি মঞ্চে বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। সেই মঞ্চে ভাষণ ডেস্কে ৯০ কেজি বিস্ফোরকদ্রব্য রাখা হয়। কাস্ত্রোর নিরাপত্তাকর্মীরা এই চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন।

কাস্ত্রোকে হত্যার ষড়যন্ত্র নিয়ে পরবর্তী সময়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক চ্যানেল ফোর। ‘৬৩৮ ওয়েজ টু কিল কাস্ত্রো’ নামের ওই প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো হয়—কত কৌশলে তাঁকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৬ সালে যুক্তরাজ্যে সম্প্রচার করা হয় এটি।

জোট নিরপেক্ষ

যদিও ওই ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়কালে মার্কিন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্যই টিকিয়ে রেখেছিল কিউবাকে। কিন্তু কাস্ত্রো তখন নজর দেন নবগঠিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের দিকে।

অবশ্য পক্ষও নিতেন কাস্ত্রো। তিনি অ্যাঙ্গোলা ও মোজাম্বিকে মার্ক্সবাদী গেরিলাদের সাহায্যে সৈন্য পাঠিয়েছিলেন।

১৯৮০ সালের দশকে বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরতে শুরু করে। মিখাইল গর্ভাচেভের নেতৃত্বাধীন মস্কো কিউবা থেকে চিনি কিনতে অস্বীকৃতি জানায়। এদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাও অব্যাহত থাকায় কিউবা বিরাট বিপদে পড়ে যায়। খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয় এসময়।

এসময় ফিদেল কাস্ত্রো ঘোষিত বিশ্বের সবচাইতে অগ্রসরমান কিউবা কার্যত মান্ধাতা যুগে ফিরে যায়।

এরপর ১৯৯০ এর দশকে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে হাজার হাজার কিউবান ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশায় যুক্তরাষ্ট্র যেতে সমুদ্রে পাড়ি জমায়। এসময় বহু মানুষ সমুদ্রে ডুবে মারা যায়।

অনেকেই এসব মৃত্যু এবং হাজার হাজার কিউবানের আমেরিকায় পাড়ি জমানোকে দেখেছেন ফিদেল কাস্ত্রোর প্রতি অনাস্থার নিদর্শন হিসেবে।

fidel-castra-8ক্যারিবিয়ান কম্যুনিজম

কাস্ত্রোর শাসনামলে কিউবায় অবশ্য বহু অভ্যন্তরীণ উন্নয়নও হয়েছে। দেশটির প্রতিটি নাগরিকই বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা সেবা পায়। বিশ্বের বহু উন্নত দেশের তুলনায় কিউবায় শিশুমৃত্যুর হার কম।

শাসনামলের শেষ দশ বছরে নিজের বিপ্লবকে বাঁচাতে মুক্ত বাণিজ্যের কিছু কিছু দিক গ্রহণ করতে বাধ্য হন কাস্ত্রো।

২০০৬ সালের ৩১ জুলাই ৮০তম জন্মদিনের কয়েকদিন আগে ভাই রাউলের হাতে সাময়িক শাসনভার দিয়ে একটি জরুরি অস্ত্রোপচারে যান তিনি।

এসময় তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। পরে ২০০৮ সালের গোড়ার দিকে তিনি অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

কাস্ত্রোর বিখ্যাত ১০ বাণী

বিশ্বের আলোচিত ব্যক্তিত্ব বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। তাঁর ক্ষুরধার এসব মন্তব্যও বারবার আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন সময়ে করা তাঁর ১০টি উক্তি এখানে তুলে ধরা হলো:

১. ‘আমার নিন্দা করুন। এটা কোনো গুরুত্ব পাবে না। ইতিহাস আমাকে অব্যাহতি দেবে।’

১৯৫৩ সালে সান্তিয়াগোতে মোংকাদা সামরিক ব্যারাকে আত্মঘাতীতুল্য হামলার অভিযোগে চলা বিচারে আত্মপক্ষ সমর্থন করে এ কথা বলেন কাস্ত্রো।

২. ‘আমি ৮২ জনকে নিয়ে বিপ্লব শুরু করি। তা যদি আমাকে আবার করতে হয়, তবে আমি ১০ বা ১৫ জনকে নিয়ে করব এবং সম্পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে করব। সংখ্যায় আপনি কত কম, সেটা কোনো বিষয় নয়, যদি আপনার বিশ্বাস ও কর্মপরিকল্পনা থাকে।’ ১৯৫৯ সালে কাস্ত্রো বলেছিলেন এ কথা।

fidel-castra-6৩. ‘আমি আমার দাড়ি কেটে ফেলার কথা ভাবছি না। কারণ, আমি আমার দাড়িতেই অভ্যস্ত এবং আমার দাড়ি আমার দেশের জন্য অনেক অর্থ বহন করে। সুশাসনের জন্য আমরা যেদিন আমাদের অঙ্গীকার পূরণ করতে পারব, সেদিন আমি দাড়ি কাটব।’ ১৯৫৯ সালে বিপ্লবের ৩০ দিন পর সিবিএসের অ্যাডওয়ার্ড মুরোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন কাস্ত্রো।

৪. ‘আমি অনেক আগেই এ ব্যাপারে উপসংহারে পৌঁছেছি যে ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে কিউবার জনগণের জন্য আমাকে এই শেষ ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। আমি আসলেই ধূমপানের তেমন অভাব বোধ করি না।’
১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিতে গিয়ে এ কথা বলেছিলেন কাস্ত্রো।

৫. ‘আমাকে জিইয়ে রাখা মতাদর্শ আর ব্যতিক্রমী মূর্তির (যিশুখ্রিষ্ট) প্রতীকী মতাদর্শের মধ্যে কখনো কোনো তফাত দেখিনি।’ ১৯৮৫ সালে কাস্ত্রো এই উক্তি করেন।

৬. ‘ভাবুন তো, সাম্যবাদের সম্প্রদায় যদি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, পৃথিবীতে তখন কী হবে…যদি তা সম্ভব হতো এবং আমি মনে করি না যে এটা সম্ভব।’ ১৯৮৯ সালে কাস্ত্রোর মন্তব্য।

৭. ‘বিপ্লবের সবচেয়ে বড় উপকার হচ্ছে, আমাদের যৌনকর্মীরাও গ্র্যাজুয়েট।’ ২০০৩ সালে পরিচালক অলিভার স্টোনকে এ কথা বলেন কাস্ত্রো।

৮. ‘কিউবার মডেল আমাদের জন্য আর কোনো কাজে আসবে না।’ ২০১০ সালে মার্কিন সাংবাদিক জেফ্রে গোল্ডবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন কাস্ত্রো। তবে পরে এ বিষয়ে কাস্ত্রো বলেছিলেন, তাঁর এ মন্তব্য অপ্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনা হয়েছিল।

৯. ‘আমি উপলব্ধি করেছি যে আমার সত্যিকারের নিয়তি হচ্ছে যুদ্ধ, যা আমি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করতে যাচ্ছি।’ কিউবার এই নেতার ওপর ২০০৪ সালে পরিচালক অলিভার স্টোন নির্মিত দ্বিতীয় তথ্যচিত্র ‘লুকিং ফর ফিদেল’-এ এই মন্তব্য করেন কাস্ত্রো।

১০. ‘৮০ বছরে পৌঁছাতে পেরে আমি সত্যিই খুশি। আমি তা কখনো আশা করিনি, অন্তত এমন প্রতিবেশী পাওয়ার কথা ভাবিনি, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর যে প্রতিবেশী প্রতিদিন আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছে।’
২০০৬ সালের ২১ জুলাই আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত লাতিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সম্মেলনে অংশ নিয়ে এ কথা বলেছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো।

ট্যাগ : অবিসংবাদিত, কমিউনিস্ট, নেতা, ফিদেল কাস্ত্রো
x

Check Also

কিছু দল সংসদে, বাইরে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে জনগণকে ভুল পথে পরিচালিত করছে: প্রধানমন্ত্রী

বগুড়া প্রতিনিধি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেছেন, কিছু রাজনৈতিক দল সংসদে ও সংসদের বাইরে বিভ্রান্তিকর ...