মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা যথেষ্ট চিন্তার উদ্রেক ঘটিয়েছে। এ প্রতিবেদনটিকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে বিবেচনা যেমন জরুরি, তেমনি মানবাধিকার লংঘিত হয় এমন কিছুর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সংস্থাটি বলেছে, গত বছর দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। বস্তুত প্রতিবেদনটির সংখ্যাতত্ত্বের দিকে তাকালে ভিন্ন কিছু ভাবার অবকাশ থাকে না। ভাবা যায়, এক বছরেই হত্যা করা হয়েছে ১৩৩ শিশুকে, যেখানে ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯০।
আসকের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে, ২০১৫ সালে দেশে ৮৬৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে আর এসব সহিংস ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫৩ জন, আহত হয়েছেন ছয় সহস্রাধিক। একই বছর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছেন ৩২ জন, নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে ১৪ জনের। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে অনেক। নির্যাতন, হুমকি, হয়রানি ও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন ২৪৪ জন সাংবাদিক, সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন দু’জন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানবাধিকারও লংঘিত হয়েছে নানাভাবে। তাদের ১০৪টি বাসস্থান, ৬টি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে; ২১৩টি প্রতিমা, পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে ১৪ জনের, আহত হয়েছেন ৭৩ জন। এছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানব পাচার, মুক্তমনা হত্যাকাণ্ড, আদিবাসীদের অধিকার লংঘনের মতো ঘটনা তো রয়েছেই। তবে মানবাধিকারের প্রশ্নে কিছু ক্ষেত্রে অবস্থার উন্নতি হয়েছে। সালিশ ও ফতোয়ার মাধ্যমে নারী নির্যাতন ও এসিড নিক্ষেপের ঘটনা কমেছে ২০১৫ সালে।
আসকের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির মূল কারণ। পরিস্থিতির এ মূল্যায়নের সঙ্গে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। বস্তুত সারা দেশে যে হারে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটে, সেগুলোর বিচার হয় তার চেয়ে অনেক শ্লথগতিতে। অনেক ক্ষেত্রে তো বিচারিক প্রক্রিয়াই শুরু হয় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক, ব্লগার নিহত হয়েছেন। অথচ বিচার হয়েছে মাত্র একজনের, বাকিগুলোর ক্ষেত্রে তদন্ত প্রক্রিয়াই শেষ করা হয়নি। আমরা মনে করি, মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাগুলোর যদি দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এসব ঘটনার সংখ্যা ও মাত্রা কমে আসবে।
গত বছরের শুরুর দিকে তিন মাস মানবাধিকার লংঘনের যেসব ঘটনা ঘটেছিল, সেগুলোর প্রায় সবই ছিল রাজনৈতিক সহিংসতাজনিত মানবাধিকার লংঘন। রাজনৈতিক সহিংসতা রোধ করা সহজ কাজ নয়। এই সহিংসতা থেকে আমাদের মুক্ত রাখতে পারে কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের শুভবুদ্ধি। অথচ দুঃখজনক হল, রাজনৈতিক নেতৃত্ব অরাজনৈতিক সহিংসতা রোধ করবে কী, তারাই কখনও কখনও বেছে নেন সহিংসতার পথ। অবশ্য বেশ কয়েক মাস ধরে বিরোধী দলের রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে মুক্ত রয়েছে দেশ। তবে সরকারি দল ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের সহিংসতা বন্ধ হয়নি। আমরা আশা করব, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সরকারি ও বিরোধী নির্বিশেষে দেশে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকবেন। জঙ্গি তৎপরতার কারণে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাও ঘটছে দেশে। এ ধরনের তৎপরতার বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।
সরকার ও রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সবাই আসক উত্থাপিত প্রতিবেদনটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। তাদের কঠোর অবস্থান ছাড়া মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথা, বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। দ্রুত বিচারের ক্ষেত্রে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলোও অপসারণ করতে হবে।
-সম্পাদক
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক


