এমএনএ ডেস্ক রিপোর্ট : ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় ফিরছে দেশের অন্যতম দল বিএনপি। জ্বালাও-পোড়াও, প্রতিশোধ কিংবা প্রতিহিংসা নয়, রাজনীতিতে সত্যিকারের গুণগত পরিবর্তনের প্রত্যয়ে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে দলটি। অতীতমুখিতা থেকে বেরিয়ে ভবিষ্যৎমুখী সুস্থধারার রাজনীতিতে ফিরে আসাকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
বোঝানো হয়েছে, এবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাদের পুরনো চেহারায় আর দেখা যাবে না। তারা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দিয়েই রাজনীতি ও দেশ পরিচালনা করবেন।
এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জোরালোভাবে বোঝাতে চেয়েছেন, তিনি যা বলছেন তা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করবেন।

গত শনিবার অনুষ্ঠিত দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভাষণ পর্যালোচনা করে কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এমন পর্যবেক্ষণ ও মতামত ব্যক্ত করেন।
অবশ্য কোনো কোনো বিশ্লেষক গণতান্ত্রিক পন্থায় কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাহী কমিটি গঠিত না হওয়ায় কঠোর সমালোচনাও করেন।
তারা বলেন, নেতৃত্ব নির্বাচনে দলের মধ্যে গণতন্ত্র না থাকলে তারা দেশ পরিচালনায় কতটুকু গণতান্ত্রিক হতে পারবেন তা ভেবে দেখার বিষয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে বিএনপির রাজনীতি কেমন হবে তা দলের চেয়ারপারসনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন যে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তা যেন শুধু স্বপ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বাস্তবেও প্রতিফলন ঘটে। শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই যেন তার এই পরিকল্পনা বা স্বপ্ন না হয়।
তারা মনে করেন, কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকলে দলটি নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। তবে দেশের সার্বিক উন্নয়নে শুধু বিএনপি নয়, সব রাজনৈতিক দলকেই ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত।
তাদের মতে, সবার মিলিত প্রচেষ্টায়ই সম্ভব একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা। গণতন্ত্রের মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভবিষ্যতে দেশ পরিচালনা, নির্বাচন প্রক্রিয়াসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য সৃষ্টির বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তারা।

বিএনপির কাউন্সিল এবং ভিশন-২০১৩০ সম্পর্কে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের বক্তব্যে মনে হয়েছে, তারা ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় ফিরতে চান। ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে বিএনপি যে সহিংস রাজনীতির মধ্যে আটকে ছিল সেখান থেকেও তারা বেরোনোর চেষ্টা করছে।
গত শনিবার খালেদা জিয়ার বক্তব্যে তার প্রতিফলন দেখা যায়। এছাড়া যে কোনো দলের সুস্থ রাজনীতির চর্চায় ফিরে আসা দেশের রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সুস্থ রাজনীতির মধ্য দিয়েই স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আর তা সম্ভব সব দলের মিলিত প্রচেষ্টায়।
বিএনপি চেয়ারপারসনের সংলাপের আহ্বানকেও ইতিবাচক মন্তব্য করে তিনি বলেন, অতীতে সরকার বারবার আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরও তিনি আবার সংলাপের কথা বলেছেন। তার মতে সংলাপের মধ্য দিয়ে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব দলকে একই প্লাটফর্মে আনা সম্ভব।
বিএনপি চেয়ারপারসনের পুরো বক্তব্যকে তিনটি ভাগে বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, দেরিতে হলেও বিএনপি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে কীভাবে দেখতে চায় সেজন্য ভিশন’ ৩০ ঘোষণা করেছেন। তবে কিছু কিছু বিষয় বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, জলবায়ু সমস্যা কীভাবে মোকাবেলা করবেন সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ভবিষ্যতে এই বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করবে বলে আশা করি।

বিএনপির কাউন্সিল সম্পর্কে বিশিষ্ট আইনজীবী ও বিশ্লেষক ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন তার বক্তব্যে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনাসহ গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি তো নিজের দলের মধ্যেই গণতন্ত্রায়নের সুযোগ রাখেননি। নেতৃত্ব নির্বাচনের সব ক্ষমতাই তার হাতে। নিজের দলের মধ্যে গণতন্ত্র না থাকলে দেশের গণতন্ত্রের কথা কতটা সাজে।’
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য ও দ্বি-কক্ষ সংসদ সম্পর্কে তিনি বলেন, দ্বি-কক্ষ সংসদ প্রতিষ্ঠা একটি বিশাল ব্যাপার। এজন্য নিজ দলের মধ্যে আলাপ-আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু গত এক মাসে বিএনপিতে এমন আলোচনা হয়েছে বলে শুনিনি। আর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায়নের জন্য তো দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজন নেই।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী অনেক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। তারা ক্ষমতায় গেলে এসব মন্ত্রণালয় অন্যদের ছেড়ে দিলেই তো ক্ষমতা কমে যায়। তবে এসব কিছুর পরও সংকটময় রাজনীতিতে তিনি যে সমঝোতা ও ইতিবাচক রাজনীতির কথা বলেছেন তা সাধুবাদ জানানোর যোগ্য। তাছাড়া কোনো ধরনের উগ্রপন্থা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে এত বড় কাউন্সিল শেষ করাও কম কথা নয়।
এদিকে নতুন ধারার ইতিবাচক রাজনীতির ঘোষণা দেয়ায় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ও বিশিষ্টজনরাও খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছেন। এছাড়া চেয়ারপারসনের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা এবং কাউন্সিলে নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি দলের মধ্যে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।

সাধারণ নেতাকর্মীরা বলছেন, এই কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে যে চাঙ্গাভাব সৃষ্টি হয়েছে তা ধরে রাখতে হবে। এজন্য দলের নেতৃত্বেও বাস্তবিক অর্থে গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। যাদের বিষয়ে দলের নেতাকর্মী, এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভালো পারসেপশন রয়েছে, যারা সত্যিকারার্থে দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ, সৎ, দক্ষ ও সাহসী তাদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিতে হবে। হতে পারে তার পক্ষে বড় কোনো নেতার আশীর্বাদ নেই, নেই কোনো বড় লবিং। কিন্তু তিনি যদি এসব মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হন, তবে তাকে প্রাপ্য পদ দিয়ে পুরস্কৃত করতে হবে। এই নীতি যদি বাস্তবে প্রতিফলিত হয়, তবে সামনে বিএনপির বিজয় সুনিশ্চিত।
এ ব্যাপারে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের কথাগুলো বেশ শ্রুতিমধুর। ভালো লেগেছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিফলন দেখাতে হবে। প্রয়োগের ওপর নির্ভর করবে সবকিছু।
তিনি বলেন, সেই সুযোগটি তাদের গত শনিবারের কাউন্সিলেই ছিল। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন ধারা সৃষ্টি করতে পারত দলটি। তারপরও প্রত্যাশা করব, ভবিষ্যতে তারা দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বেশি গুরুত্ব দেবেন।
ইফতেখার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলেছেন খালেদা জিয়া। এটা খুবই ইতিবাচক। তবে এক ব্যক্তির জায়গায় যদি নিজেদের পছন্দের বা তাদের নির্ধারিত ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা দেয়া হয় তা কোনো ফল বয়ে আনবে না।

তবে সংবিধানে গণভোট, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণ ও অনিয়মমুক্ত করার ঘোষণা ভালো দিক।
তার মতে, অতীতের কলুষিত রাজনীতি থেকে বিএনপি বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে এটা ইতিবাচক। কথা এবং কাজের মধ্য দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রমাণ দিতে হবে। সবশেষ সংকট নিরসনে আবারও সংলাপের আহ্বানকেও ইতিবাচক মনে করেন তিনি।
কারণ, সংলাপ ছাড়া রাজনৈতিক সংকট সমাধান সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের কয়েকজনের বক্তব্য হলো- রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে দীর্ঘদিন ধরেই দেশী-বিদেশীদের চাপ অব্যাহত ছিল এবং এখনও আছে। আন্দোলনের নামে যাতে জ্বালাও-পোড়াও কিংবা জীবনহানি না ঘটে সে বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ রয়েছে। বিপরীতে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য যেটুকু স্পেস বা সুযোগ থাকা প্রয়োজন সে বিষয়েও দেশের সুশীল সমাজসহ উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর জোরালো আহ্বান অব্যাহত আছে।
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও মনে করেন, শুধু বিএনপি চাইলেই পজিটিভ রাজনীতির পরিবেশ কখনও নিশ্চিত করা যাবে না। এজন্য সরকারি দলের ভূমিকা রাখতে হবে বেশি।
জানা গেছে. নানা প্রতিকূলতার পরও কাউন্সিলে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে খালেদা জিয়াসহ সবাই বেশ উজ্জীবিত। কাউন্সিলের দ্বিতীয় অধিবেশনে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও বেশ প্রাণচাঞ্চল্য দেখাচ্ছিল। কাউন্সিল সুন্দরভাবে সফল করায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের ধন্যবাদও জানান তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতা বলেন, তাদের প্রত্যাশা, চেয়ারপারসন যে আশার বাণী শুনিয়েছেন বাস্তবেও নিশ্চয় তার প্রতিফলন ঘটবে। আগামী কমিটির মধ্য দিয়েই এই প্রক্রিয়া শুরু করবেন তিনি।
তাদের মতে, দলের মধ্যে যারা সুবিধাবাদী, যাদের নেতিবাচক রাজনীতির মনোভাব রয়েছে কিংবা পাবলিক পারসেপশনে যারা দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিত তাদের বাদ দিতে হবে। তরুণ, সাহসী, যোগ্য ও সৎ নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। নির্বাহী কমিটিতে এসবের প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব হলে নেতাকর্মীরা আরও উদ্দীপ্ত হবে। আর যদি সেই বিতর্কিত এবং দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এমন নেতাদের হাতে দলের দায়িত্ব দেয়া হয়, তাহলে জনগণকে যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছে তা স্বপ্নই থেকে যাবে।
এ ব্যাপারে সাবেক আমলা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোফাজ্জল করিম বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই শুনে আসছিলাম কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবে। গত শনিবার কাউন্সিলে চেয়ারপারসনের বক্তব্যে স্পষ্ট কিছু দিকনির্দেশনা ঘুরে দাঁড়ানোর সেই ইঙ্গিতই বহন করে।
তার বক্তব্য শুধু প্রণোদনা দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল তা নয়, শুধু যে কিছু কথার ফুলঝুরি ছিল তাও নয়। বিভিন্ন বিষয় যেমন রাজনীতি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে তার স্পষ্ট ঘোষণা ছিল। আগামী দিনে বিএনপির রাজনীতি কেমন হবে তার এই বক্তব্যে দলের অনুসারীরা সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পেয়েছেন।

তিনি বলেন, একটা বিষয় খুবই লক্ষণীয়। এই ধরনের সম্মেলনে গতানুগতিক বক্তব্য, শুধু উৎসাহ উদ্দীপনা ও প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে কিছু বাক্যবাণ ছুড়ে দেয়া হয়। কিন্তু এবার এগুলো কমই ছিল। সেদিক থেকে খালেদা জিয়ার বক্তব্য গতানুগতিক বলা যাবে না।
দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা যদি তার এই বক্তব্য থেকে নির্যাস গ্রহণ করে দল পরিচালনা করেন এবং সর্বোপরি কিছুদিন আগ পর্যন্ত বিএনপি যেসব বিষয়ে তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন তা থেকে যদি সরে আসতে পারে তাহলে দলটি অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তবে এজন্য চাই নিবেদিত প্রাণ নেতাকর্মী।
এছাড়া নেতাকর্মীরা চেয়ারপারসনের দিকনির্দেশনা মেনে চললে দলটি একটা নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করবে বলে আশা করতে পারি।
সাবেক এই দক্ষ আমলার মতে, খালেদা জিয়ার বক্তব্যে শুধু নেতাকর্মী নয়, সাধারণ মানুষের মাঝেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সংলাপের আহ্বান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা খুবই প্রয়োজন ছিল। সংলাপ না হওয়া দুঃখজনক। এটা দেশের রাজনীতিতে ভবিষ্যতে আরও জটিলতা সৃষ্টি করবে। এতে করে দেশের রাজনীতি এমন একটা পর্যায়ে চলে যাবে যেখান থেকে উত্তরণ করা দুরূহ হবে। আর যদি সময়মতো জাতীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা করা হয়, তবে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করা মোটেই কঠিন কিছু নয়। আলোচনার মাধ্যমে সবই সম্ভব। কিন্তু লক্ষণীয় যে, নানা অজুহাতে শাসক দল সংলাপ এড়িয়ে চলছে। কোথাও যেন তাদের দুর্বলতা রয়েছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

