এমএনএ প্রতিবেদক
ঈদুল ফিতরকে ঘিরে দেশের সড়কপথে আবারও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশন–এর প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঈদের আগে ও পরে ১৫ দিনে (১৪–২৮ মার্চ) সারা দেশে ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৯৮ জন। নিহতদের মধ্যে ৪৬ জন নারী ও ৬৭ জন শিশু। প্রতিদিন গড়ে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ২০ জন।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো প্রতিবেদনে জানানো হয়, ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সংস্থার নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এ বিশ্লেষণ প্রস্তুত করা হয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে ১১ দিনের ঈদযাত্রায় ২৫৭টি দুর্ঘটনায় ২৪৯ জন নিহত হন, যেখানে প্রতিদিন গড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২২ জন। তুলনামূলকভাবে এবারের সময়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেশি, যা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদন বলছে, এবারের ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছেন মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী—১১৬ জন। এছাড়া- বাসযাত্রী ৪১ জন; ট্রাক ও পিকআপ আরোহী ১৩ জন; প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস আরোহী ২০ জন; থ্রি-হুইলার যাত্রী ৫০ জন; স্থানীয় যানবাহনের যাত্রী ৯ জন ও সাইকেল আরোহী ২ জন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।
মোট আহত হয়েছেন দুই হাজারেরও বেশি মানুষ।
সড়কের ধরন অনুযায়ী দুর্ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়- আঞ্চলিক সড়কে সর্বোচ্চ ৪৩.১৬%; জাতীয় মহাসড়কে ৩০.৮৩%; গ্রামীণ সড়কে ১২.৮৬%; ও শহরের সড়কে ১১.২৬% দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে সকালে (২৪.৩৯%) ও দুপুরে (২৩.০৫%) দুর্ঘটনা বেশি ঘটেছে। তবে রাতে ২০.৩৭% দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা দীর্ঘপথ যাত্রায় ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে।
দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ—মোট দুর্ঘটনার প্রায় ২৫% এবং মৃত্যুর ২৪.৮৩% এখানেই ঘটেছে। এরপর রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে দুর্ঘটনার হার কম হলেও প্রাণহানির হার উল্লেখযোগ্য (২৪.১৬%)।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ১০টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে। এরমধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; বেপরোয়া গতি; চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অক্ষমতা; অনিয়মিত বেতন ও অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা; মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল; তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালানো; ট্রাফিক আইন অমান্য; দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা।
সংস্থাটি মনে করে, নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে কমপক্ষে তিন বছর মেয়াদি সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে- রেলপথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ; নৌপরিবহনকে আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব করা; বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন–এর বাস ও রুট বৃদ্ধি; পোশাকশ্রমিকদের ধাপে ধাপে ছুটি নিশ্চিত করা; ও অঞ্চলভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা চালু।
প্রতিবেদনটিতে ১২টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন করে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার; বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন ও ডিটিসিএ–এর কাঠামোগত সংস্কার; যানবাহনে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা; মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন অপসারণ; রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানিভিত্তিক বাস সার্ভিস; সরকারি পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি; দক্ষ চালক তৈরি ও তাদের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন; মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ; সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ; সড়ক নিরাপত্তায় বাজেট বৃদ্ধি; প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ; এবং সড়ক, রেল ও নৌপথ সমন্বয়ে একক যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কেবল আইন প্রয়োগ নয়, বরং সমন্বিত পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং জনসচেতনতা—সবকিছুর সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন। ঈদের মতো বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে যে চাপ তৈরি হয়, তা মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতেও একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

